নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আফগানদের মোকাবিলায় প্রস্তুত বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ ড্রয়ের পর আবারও টেস্ট খেলতে নামছে টাইগাররা। এবার প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান। সাদা পোশাকের ম্যাচে আগেও আফগানদের বিপক্ষে খেলেছে লাল সবুজ দল। তবে এবারের ম্যাচটা আলাদা। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলবে বাংলাদেশ দল। আজ সংযুক্ত আরব আমিরাতে আবুধাবি মাঠে গড়াচ্ছে এই টেস্ট। মরুশহরের রোদে লাল-সবুজের টেস্ট কাঠামোর নতুন ছবি আঁকতে প্রস্তুত নাজমুল হোসেন শান্তরা। ম্যাচটিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের কোনো পয়েন্ট পাওয়ার সমীকরণ নেই ঠিকই, তবে কয়েকমাস ধরে ব্যাটে-বলে আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করা শান্ত বাহিনীর জন্য এই একমাত্র টেস্টটি নিজেদের ঝালাই করে নেওয়ার বড় মঞ্চ।

এই ম্যাচের আয়োজক আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (এসিবি)। তবে এখনও নিজ দেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি তারা। তাই প্রায়শই সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিভিন্ন ম্যাচ আয়োজন করে দেশটি। ১৬১টি টেস্ট খেলে ফেলার পর এবারই প্রথম কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে টেস্ট খেলার স্বাদ পেতে চলেছে বাংলাদেশ। ম্যাচটি শুরুর আগে বাংলাদেশ দল খানিক বেকায়দায়ই পড়েছে আমিরাতের তীব্র গরম। প্রায় প্রতিদিনই অনুশীলনের ফাঁকে বিসিবির ভিডিওতে উত্তাপের কথা বলেছেন ক্রিকেটাররা। এমনকি ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনেও বাদ যায়নি গরমের প্রসঙ্গ। তবে এটিকে বড় করে তুলে ধরতে চাননি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। "প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। কন্ডিশন তো একটু গরম, এটা থাকবে। তবে আমরা পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে এটাকে একদমই অজুহাত হিসেবে দেখতে চাই না। আমার মনে হয় যে, ক্রিকেটাররাও এগুলো নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছে না।"

আবু ধাবির গরমের বাইরে বাংলাদেশের লড়াই আফগান চ্যালেঞ্জের সঙ্গে। আমিরাতের মাঠ সম্পর্কে বাংলাদেশের চেয়ে আফগানিস্তানের জানাশোনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এখন পর্যন্ত নিজেদের ১৩ টেস্টের তিনটি আমিরাতে খেলেছে তারা। এছাড়া রঙিন পোশাকেও নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে আফগানদের। তবে সার্বিকভাবে বেশি টেস্ট খেলে না আফগানিস্তান। তাই অভিজ্ঞতার দিক থেকে সব মিলিয়ে কিছুটা এগিয়েই থাকার কথা বাংলাদেশের। ২০২৩ সালের পর থেকে সাত টেস্ট খেলে স্রেফ একটি জিতেছে আফগানিস্তান। আর ড্র হয়েছে একটি। বিপরীতে নিজেদের সবশেষ সাত টেস্টের পাঁচটিই জিতেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে— পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার সুখস্মৃতি আর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ডারউইন টেস্টে ঐতিহাসিক সাফল্যের আনন্দ।

গত অগাস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ ড্র করার পর, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়েই এই সংস্করণে আবার মাঠে নামছে বাংলাদেশ। ম্যাচটি আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ নয়। তবে এই টেস্টের পরই রয়েছে চ্যাম্পিয়নশিপের মহাগুরুত্বপূর্ণ তিনটি সিরিজ।

এখন পর্যন্ত তিন সিরিজে ছয় ম্যাচে ৪০ পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে ৫৫.৫৬ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের চার নম্বরে অবস্থান করছে তারা। সামনে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড এবং দেশের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকার খেলবে শান্তর দল।

বাকি ছয় টেস্টের চারটি জিততে পারলে ও অন্তত একটি ড্র করতে পারলে অবিস্মরণীয়ভাবে ফাইনালের টিকেট পেয়ে যাবে বাংলাদেশ। খুব কঠিন তবে সম্ভব— অভিযান শুরুর আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ। সামনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কথা ভেবে বিশ্রামে রাখা হয়েছে অভিজ্ঞ পেসার তাসকিন আহমেদকে। আর চোটের পুনর্বাসনে থাকায় দলের সঙ্গে নেই নাহিদ রানা। তবু ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেট মাতিয়ে আসা হাসান মাহমুদ ও সৈয়দ খালেদ আহমেদের সঙ্গে ইবাদত হোসেন চৌধুরিকে নিয়ে গড়া পেস আক্রমণ নিশ্চিতভাবেই জোগাবে বাড়তি সাহস।

আবু ধাবির উইকেট ও কন্ডিশন অবশ্য ইতিহাসগতভাবেই স্পিনবান্ধব। স্কোয়াডের দুই স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের পাশাপাশি সফরসঙ্গী রিজার্ভ হিসেবে যাওয়া নাঈম হাসানকেও তাই ভাবনায় রাখছে টিম ম্যানেজমেন্ট। এমনকি একাদশেও সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন ২৬ বছর বয়সী এই অফ স্পিনার।

উইকেট সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে শান্তও বলেছেন, কিছুটা মন্থর হতে পারে ম্যাচের পিচ। "উইকেট গতকালকে একটু দেখার সুযোগ হয়েছে, আজকে আরেকবার একটু দেখব। দেখে ভালো মনে হয়েছে, হয়তো একটু মন্থর গতির থাকতে পারে। তবে আমার মনে হয় যে ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো হবে। আশা করছি, খুব ভালো একটা টেস্ট ম্যাচই হবে।" ব্যাটিংয়ে অবশ্য কিছুটা দুর্ভাবনার জায়গা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সফরে প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরির পর আর রান নেই তানজিদ হাসান তামিমের ব্যাটে। ওই সিরিজের তিন ইনিংসেই শূন্য রানে আউট হন লিটন কুমার দাস। অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হকের ব্যাটেও সাম্প্রতিক সময়ে নেই বড় রান। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে পরীক্ষায় ফেলতে রিস্ট স্পিনে বাড়তি জোর দিয়েছে আফগানিস্তান। কাইস আহমেদের পাশাপাশি স্কোয়াডে আছেন আরেক লেগ স্পিনার খালিল গুরবাজ। তবে রাশিদ খানের অনুপস্থিতি কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে বাংলাদেশকে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত দুইবার সাদা পোশাকে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে টেস্ট ক্রিকেটে তখনকার নবাগত দল আফগানদের কাছে ২২৪ রানে হেরে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল বাংলাদেশ।

তবে ২০২৩ সালের একমাত্র টেস্টে আবার পূর্ণ দাপট দেখিয়েই নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় তারা তুলে নেয়, ৫৪৬ রানের ব্যবধানে। আগের দুটি ম্যাচই অবশ্য হয় বাংলাদেশের মাঠে। এবার তারা লড়বে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। যা মূলত আফগানদের অধিক চেনা। সেসব নিয়ে অবশ্য ভাবছেন না শান্ত। বরং সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে অগ্রযাত্রা ধরে রেখে ইতিবাচক ফলের আশা বাংলাদেশ অধিনায়কের।

ব্যাটিং অর্ডারে শুরুতেই মিলতে পারে সাহসী এক পরিবর্তনের আভাস। দীর্ঘদিনের চেনা বাঁহাতি-অডানহাতি জুটির প্রথাগত ভাবনায় কিছুটা বিরতি দিয়ে তানজিদ হাসানের সঙ্গে সৌম্য সরকারকে ওপেনিংয়ে আনার জোর আলোচনা চলছে। আবুধাবির দ্রুততম আউটফিল্ডে বল ব্যাটে এলেই বাউন্ডারি পাওয়ার সুযোগ বেশি, আর সে সুবিধা নিতে সৌম্যর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে রানের দেখা পাওয়া মানেই দলের ভিত শক্ত হওয়া। মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞতার স্তম্ভ মুমিনুল হক ও মুশফিকুর রহিমের ওপর নজর থাকবে সবচেয়ে বেশি, কারণ দুজনকেই ব্যাটের ধার ফেরাতে হবে। চোট ও রানখরা কাটিয়ে ছয়ে নামা উইকেটরক্ষক-ব্যাটার লিটন দাসের জন্য এ ইনিংসটি একপ্রকার নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই।