ওয়ানডেতে আত্মবিশ্বাসের সংকটে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টে হতাশাজনক ড্রয়ের পর ত্রিদেশীয় সিরিজে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু উল্টো প্রথম ম্যাচেই বড় ধাক্কা খেয়েছে টাইগাররা। জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে সিরিজে কঠিন অবস্থায় পড়েছে তারা। তবে ফাইনালে খেলার আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এ জন্য সমীকরণ মেলাতে হবে লাল সবুজ দলকে। অথচ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে একসময় বিবেচনা করা হতো ওয়ানডে সংস্করণকে! এই ফরম্যাটেই এসেছে বড় বড় জয়, তৈরি হয়েছে আত্মবিশ্বাস, জন্ম নিয়েছে বিশ্বমঞ্চে ভালো কিছু করার স্বপ্ন। অথচ সেই ওয়ানডেতেই এখন ক্রমশ দিশাহারা বাংলাদেশ।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও মাঠে নামলে নিশ্চিত জয়ের আত্মবিশ্বাস থাকে না। বরং ব্যাটিং ধসের আশঙ্কাই যেন বড় হয়ে দেখা দেয়। আবুধাবিতে জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো কিছু প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। দলের খেলা দেখতে বিদেশে গিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে সেই চেনা হতাশারই পুনরাবৃত্তি। সভাপতি বদলেছে, বোর্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈঠকও হচ্ছে; কিন্তু ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সমস্যার জায়গাগুলো যেন একই রয়ে গেছে। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই সংকটের গভীরতা বোঝা যায়। গত দুই বছরে বিদেশের মাটিতে ১৯টি ওয়ানডে খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৫টিতেই হার, জয় মাত্র তিনটি। বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়েছে একটি ম্যাচ। বিদেশের মাঠে জয়ের চেয়ে হারের সংখ্যা পাঁচ গুণ। শুধু তাই নয়, এই সময়ে দেশের বাইরে কোনো ওয়ানডে সিরিজও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ধবলধোলাই হওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এমনকি গত জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও সিরিজ জয়ের মুখ দেখেনি দলটি।

একসময় যে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল, সেই দলই এখন বিদেশের মাঠে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। ঘরের মাঠে সাফল্য দিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান ধরে রাখা গেলেও দেশের বাইরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন! ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার পথটাও বাংলাদেশের জন্য খুব সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জিতে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করে দল। নিজেদের চেনা উইকেট, পরিচিত পরিবেশ ও সমর্থকদের সামনে পাওয়া এই সাফল্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছিল। তবে সেই সাফল্যের নেপথ্যে থাকা অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজকেই বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হওয়ার পর নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির শুরুতেই নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এখন আরব আমিরাতে চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজকে ২০২৭ বিশ্বকাপের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু শুরুতেই জিম্বাবুয়ের কাছে হার বাংলাদেশের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিয়েছে। সামনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ। ফাইনালে ওঠা না-ওঠার হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দলের পারফরম্যান্সের মান এবং সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন! বাংলাদেশের ওয়ানডে সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ ব্যাটিং। বিশেষ করে রান তাড়া করার ক্ষেত্রে দলটির দুর্বলতা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে। ভালো শুরুর পর ইনিংস ধরে রাখতে না পারা, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট বিলিয়ে দেওয়া এবং চাপের মুখে দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলা-সব মিলিয়ে ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব স্পষ্ট। বড় স্কোর গড়ার সামর্থ্য থাকলেও লক্ষ্য তাড়া করতে গেলেই যেন খেই হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ।

সর্বশেষ ১০ ওয়ানডের আটটিতেই ২৪০ রানের বেশি লক্ষ্য তাড়া করতে পারেনি দল। আরও উদ্বেগের বিষয়, চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজের অপর দুই প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ ছয় ম্যাচের একটিতেও পুরো ৫০ ওভার ব্যাটিং করতে পারেনি বাংলাদেশ। যে সংস্করণে ৫০ ওভারের ইনিংস খেলার কথা, সেখানেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হারের পর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়ের স্বীকারোক্তিও সমস্যার জায়গাটি স্পষ্ট করেছে। তার মতে, ব্যাটিংয়ে দল কিছু 'বোকামির ভুল' করেছে। দ্রুত সেসব ভুল কাটিয়ে ওঠার আশাবাদও জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একই ভুল কতবার করবে বাংলাদেশ? ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, দায়িত্বহীন শট নির্বাচন কিংবা চাপ সামলাতে না পারার সমস্যা যদি বারবার ফিরে আসে, তাহলে শুধু আশাবাদ দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। ২০২৭ বিশ্বকাপের আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড কিংবা স্বাগতিকদের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলতে হলে ব্যাটিংয়ের এই ভঙ্গুরতা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। সেখানে উইকেট, আবহাওয়া ও প্রতিপক্ষের বোলিং-সবকিছুই বাংলাদেশের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করাই যে শেষ কথা নয়, সেটি এখন বাংলাদেশকে বুঝতে হবে। ঘরের মাঠে সিরিজ জিতে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া গেছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে বিদেশের মাঠেও জয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন কিংবা খেলোয়াড়দের সঙ্গে বৈঠক করে এই সংকট কাটবে না। প্রয়োজন ব্যাটিংয়ের মৌলিক দুর্বলতা দূর করা, চাপের মুখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিশ্চিত করা।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হার তাই নিছক একটি ম্যাচের পরাজয় নয়; বরং বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। এখনই যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশনে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করতে পারে আরও বড় হতাশা!