ডারউইনের সাফল্য মিরপুরে ম্লান

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

একটি জয় কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে একটি দলকে, তার উদাহরণ ছিল ডারউইনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সাফল্য। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৯ উইকেটের সেই জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই সম্ভাবনার জায়গায় এখন জমেছে হতাশা। ডারউইনের পর তিন টেস্ট, একটিতেও জয় নেই। গতকাল শনিবার মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটের হার যেন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পুরোনো দুর্বলতাগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

হারের ব্যবধান আট উইকেট হলেও বাংলাদেশের ব্যর্থতার পরিধি আরও বড়। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং-তিন বিভাগেই ছিল সমন্বয়হীনতা। অথচ প্রতিপক্ষকে প্রথম ইনিংসে খুব বেশি এগিয়ে যেতে দেয়নি বাংলাদেশ। ২৭ রানের লিডও পেয়েছিল স্বাগতিকেরা। সেখান থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার সুযোগ ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ে সেই সুযোগ কার্যত প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। মাত্র ১৪২ রানে শেষ হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। ১৭০ রানের লক্ষ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য খুব বড় কিছু ছিল না। ব্রেন্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেলের উদ্বোধনী জুটিতে ১১২ রানই ম্যাচের ভাগ্য অনেকটা নির্ধারণ করে দেয়। ক্যাম্পবেল ৪৯ রানে ফিরলেও কিং অপরাজিত থাকেন ৮১ রানে। কেবন হজের অপরাজিত ৩১ রানে ৩৫.১ ওভারেই জয় নিশ্চিত করে ক্যারিবীয়রা। টেস্ট ক্রিকেটে এমন অনায়াস জয় শুধু প্রতিপক্ষের দক্ষতার পরিচয় নয়, বাংলাদেশের প্রতিরোধের অভাবেরও প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ের চিত্র ছিল আরও বিব্রতকর। তাওহীদ হৃদয় ও তানজিদ হাসান তামিম ফিরেছেন শূন্য রানে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দুই ইনিংস মিলিয়ে করেছেন মাত্র ২৯ রান। অথচ দলের সবচেয়ে বেশি রান এসেছে বোলার নাঈম হাসানের ব্যাট থেকে। তার ৫২ রানের ইনিংস না থাকলে বাংলাদেশের লিড আরও ছোট হতো। মূল ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার দিনে একজন টেলএন্ডারের লড়াই দলকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও সেটি কোনোভাবেই ব্যাটিং বিভাগের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

ব্যাটিংয়ের এই দুর্দশার পেছনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের কৃতিত্বও রয়েছে। রোস্টন চেজ ৩৬ রানে নিয়েছেন ৫ উইকেট, জোমেল ওয়ারিক্যান পেয়েছেন ৪ উইকেট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের স্পিনাররা কেন একই ধরনের চাপ তৈরি করতে পারলেন না? প্রতিপক্ষের দুই স্পিনার যখন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের একের পর এক ফিরিয়ে দিচ্ছেন, তখন বাংলাদেশের স্পিন আক্রমণ কার্যত ম্যাচের গতিপথ বদলাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হারানো দুটি উইকেটই এসেছে পেসারদের কাছ থেকে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফিল্ডিংয়ের চরম দুর্বলতা। প্রথম ইনিংসে চারটি ক্যাচ মিস করেছে বাংলাদেশ। মুমিনুল হক একাই হাতছাড়া করেছেন দুটি সুযোগ। শরীফুল ইসলাম ও নাঈম হাসানও ক্যাচ নিতে পারেননি।

বিশেষ করে জন ক্যাম্পবেল একাধিকবার জীবন পেয়ে ফিফটি তুলে নেওয়ায় বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের মূল্য দিতে হয়েছে দলকে। টেস্টে একটি ক্যাচের গুরুত্ব কতটা, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। অথচ বাংলাদেশের ফিল্ডারদের মধ্যে সেই সচেতনতার অভাব স্পষ্ট ছিল।

ম্যাচ শেষে অধিনায়ক শান্তর বক্তব্যে উঠে এসেছে দলের প্রস্তুতি ও ড্রেসিংরুমের পরিবেশের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, আমি মনে করি, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং আমাদের প্রস্তুতি-দুটোই ভালো ছিল। খেলোয়াড়রা দলের জন্য ভালো করতে সত্যিই চেয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি আমাদের জন্য একটি খারাপ দিন ছিল। কারণ, আগেই বলেছি যে তিনটি বিভাগেই আমরা ভালো করতে পারিনি। বিশেষ করে ফিল্ডিংয়েও।

শান্তর ব্যাখ্যায় একটি বিষয় স্পষ্ট-দল চেয়েছিল ভালো খেলতে, প্রস্তুতিও ছিল।

কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালো করার ইচ্ছা আর বাস্তব পারফরম্যান্স এক বিষয় নয়। একটি দল কতটা প্রস্তুত, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। প্রথম ইনিংসে ক্যাচ মিস, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয় এবং লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে প্রতিপক্ষের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ- এসবকে শুধু একটি খারাপ দিন বলে পাশ কাটানো কঠিন। পরাজয়ের পর শান্ত আরও বলেন, আমার মতে এটা হতাশাজনক পারফরম্যান্স। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং-তিনটি বিভাগেই নিজেদের সেরাটা দিতে পারিনি। বিষয়গুলো অবশ্যই দুশ্চিন্তার কারণ। দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং ব্যর্থতা নিয়ে তার বক্তব্য, আসলেই দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং যথেষ্ট বাজে হয়েছে। আমার মতে ক্রিকেটে মাঝেমধ্যে এমনটা হতেই পারে। ক্রিকেটে খারাপ দিন আসতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক টেস্ট পারফরম্যান্সে সমস্যাটি এক দিনের নয়। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর ম্যাকাইতে ইনিংস ও ৫১ রানে পরাজয়, আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জয়ের সুযোগ হাতছাড়া এবং এবার ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হার- এই ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে প্রতিটি ম্যাচে দলের ভিন্ন ভিন্ন দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও সেগুলো কাটিয়ে ওঠার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই!

মিরপুর টেস্টে বৃষ্টি, বজ্রপাত ও আলোকস্বল্পতার কারণে নয়বার খেলা বন্ধ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের অনেকটা নষ্ট হয়েছে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের পথে এসব বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সময়ের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ক্রিকেট খেলেছে। প্রথম দিন বাদ দিলে পুরো ম্যাচেই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ ছিল সীমিত। ফলে আবহাওয়ার প্রতিকূলতা কিংবা উইকেটের চরিত্র দিয়ে এই পরাজয়ের ব্যাখ্যা খোঁজার সুযোগ নেই।

এই হারে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। আগামী ৫ নভেম্বর সিলেটে দ্বিতীয় টেস্টে নামবে দুই দল। সিরিজ বাঁচাতে হলে বাংলাদেশকে শুধু ফলাফল বদলালেই চলবে না, বদলাতে হবে পারফরম্যান্সের ধরনও। ব্যাটিং অর্ডারের দায়িত্বশীলতা, স্পিন আক্রমণের কার্যকারিতা এবং ফিল্ডিংয়ের মৌলিক দক্ষতায় উন্নতি ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। মিরপুরের পরাজয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সমীকরণও আরও কঠিন করেছে। ফাইনালের দৌড়ে টিকে থাকতে বাকি পাঁচ টেস্টের অন্তত চারটিতে জয় পেতে হবে বাংলাদেশকে এবং অন্য ম্যাচটি ড্র করতে হবে। ফলে পরের ম্যাচ থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হবে শান্তদের।

পয়েন্টের হিসাবের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দলের সামগ্রিক মান নিয়ে প্রশ্ন! ডারউইনে যে দল অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল, সেই দলই কেন পরের তিন টেস্টে জয়হীন? সাফল্য কি শুধু একটি বিশেষ দিনের অর্জন ছিল, নাকি সেই মান ধরে রাখার মতো পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের অভাব রয়েছে?