সিলেট টেস্ট
হাসান মাহমুদের হাসির পর ব্যাটারদের আত্মসমর্পণ
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

একদিকে বল হাতে হাসান মাহমুদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, অন্যদিকে ব্যাট হাতে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণ। সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনটি তাই বাংলাদেশের জন্য হয়ে থাকল মিশ্র অনুভূতির।
ব্যক্তিগত অর্জনে নতুন ইতিহাস লিখেছেন হাসান, কিন্তু দলীয় স্বস্তি এনে দিতে পারেননি ব্যাটাররা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে গতকাল দ্বিতীয় দিন শেষ হওয়ার আগেই তিন উইকেট হারিয়ে বসেছে স্বাগতিকরা। গতকাল শুক্রবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪০ ওভারে ৩ উইকেটে ৮৮ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনও ২৬৮ রানে পিছিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ৩৭ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আপাতত বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাওহীদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিম। হৃদয় ২৯ এবং মুশফিক ১৯ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছেন।
সাদমান ইসলামের চোট বাংলাদেশের ওপেনিং পরিকল্পনায় আগেই ছেদ টেনেছিল। তার অনুপস্থিতিতে তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গে ইনিংস শুরু করতে নামানো হয় নাঈম হাসানকে। অথচ টেস্ট ক্যারিয়ারে আগে কখনও আট নম্বরের ওপরে ব্যাট করতে নামেননি এই অফ স্পিনার। নতুন ভূমিকায় অবশ্য নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি তিনি। জেইডেন সিলসের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান চা বিরতির আগেই। অন্য প্রান্তে তানজিদ তামিমও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ১৬ রান করে কেভিন উইকহ্যামের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই বাঁহাতি ওপেনার। এরপর দায়িত্ব ছিল অধিনায়ক শান্তর ওপর। কিন্তু তার সতর্ক ব্যাটিংও বাংলাদেশকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি। শামার জোসেফের অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করে ভেতরে ঢোকা দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড হন তিনি। ৫১ বলে ১৪ রান করে শান্তর বিদায়ে ৫১ রানেই তিন উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
এমন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন হৃদয় ও মুশফিক। দুজনই দেখেশুনে খেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেননি। দিনের বাকি সময় আর কোনো উইকেট হারাতে দেননি তারা। তবে এই প্রতিরোধে আপাতত বিপর্যয় ঠেকানো গেলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফেরানো যায়নি। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের এমন হতাশার দিনে ব্যক্তিগতভাবে আলো ছড়িয়েছেন হাসান মাহমুদ। দিনের শুরুতেই নতুন বল হাতে নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে চাপে ফেলার কাজ শুরু করেন এই পেসার। আগের দিনের ২৩৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামা ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে টানা দুই বলে ফেরান সেঞ্চুরিয়ান আমির জাঙ্গো ও রস্টন চেইসকে।
১৩৩ রান করা জাঙ্গোকে বোল্ড করে তার ও জাস্টিন গ্রিভসের ১০৬ রানের জুটি ভাঙেন হাসান। পরের বলেই উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন চেইস। হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তবে হাসানের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় অর্জন। জশুয়া বিশপকে নিজের বলে ক্যাচ তুলতে বাধ্য করেও প্রথমে সুযোগ হাতছাড়া করেন তিনি। কিন্তু সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেন দ্রুতই। উইকেটের পেছনে লিটন দাসের অসাধারণ স্টাম্পিংয়ে বিদায় নেন বিশপ। তাতেই পূর্ণ হয় হাসানের পাঁচ উইকেট। টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে উইকেট পাওয়ার বিরল নজিরও গড়েন তিনি।
এরপর শামার জোসেফকে বোল্ড করে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইনিংসে ছয় উইকেটের স্বাদ পান হাসান। তার বোলিংয়ে একের পর এক রেকর্ড যুক্ত হতে থাকে। বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ পাঁচবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি এখন এককভাবে তার। পাশাপাশি নাথান লিয়নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচটি ফাইফার পাঁচটি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে নেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। হাসানের তাণ্ডবের মধ্যেও শেষ দিকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৭৯ ওভার পর জাস্টিন গ্রিভসকে ৫০ রানে ফিরিয়ে সেই জুটি ভাঙেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর শেষ উইকেটে জোমেল ওয়ারিক্যান ও জেইডেন সিলসের ৩৩ রানের জুটি বাংলাদেশের অপেক্ষা বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত মিরাজই এই জুটি ভেঙে ক্যারিবীয়দের প্রথম ইনিংসের ইতি টানেন ৩৫৬ রানে।
হাসানের ছয় উইকেট, মিরাজের সহায়তায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সাড়ে তিনশর ঘরে আটকে রাখার পর বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ভালো শুরুর। কিন্তু তিন উইকেট হারিয়ে সেই সুযোগ অনেকটাই হাতছাড়া করেছে স্বাগতিকরা। এখন ম্যাচে ফিরতে হলে হৃদয়-মুশফিকের জুটিকে শুধু টিকিয়ে রাখলেই হবে না, পরের দিন বড় ইনিংসও গড়তে হবে বাংলাদেশকে। অন্যথায় হাসানের রেকর্ডগড়া বোলিংয়ের দিনটি শেষ পর্যন্ত দলীয় ব্যর্থতার আড়ালেই ঢাকা পড়ে যেতে পারে।
