রেকর্ড গড়ে সাফল্যের রহস্য জানালেন হাসান

পাঁচটি ভিন্ন দেশে ৫ উইকেট নিয়ে হাসানের বিশ্বরেকর্ড

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

উইকেট ছিল ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ, পেসারদের জন্য নয়। শুরুর দিকের সামান্য মুভমেন্টও সময়ের সঙ্গে উধাও হয়ে গিয়েছিল! এমন পরিস্থিতিতে বোলারদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধৈর্য ধরে সঠিক জায়গায় বল ফেলা। সেই পরীক্ষায় শুধু উত্তীর্ণই হননি হাসান মাহমুদ, বরং ছয় উইকেট নিয়ে গড়েছেন একাধিক রেকর্ড। বিদেশের মাটিতে ফাইফারের অভিজ্ঞতা থাকলেও দেশের মাটিতে প্রথমবার পাঁচ উইকেট পাওয়াটা তার কাছে অন্য রকম আনন্দের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিন আজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অনুভূতি ও বোলিং পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের এই পেসার। ঘরের মাঠে প্রথম ফাইফার পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে হাসান বলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, ঘরের মাঠে পাঁচ উইকেট পাওয়াটা সবসময়ই আমার জন্য খুবই স্পেশাল। নিজেদের মাঠে ভালো একটা সুযোগ ছিল, তাই অনুভূতিটা অনেক আনন্দের।'

সিলেটের উইকেট সাধারণত পেসারদের জন্য সহায়ক হিসেবে পরিচিত। মেঘলা আকাশ ও বাতাসে সুইংয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এখানে ভালো করার সুযোগ থাকে পেসারদের। কিন্তু এবারের উইকেটের চরিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। প্রথম এক-দুই ঘণ্টার পরই ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ সহজ হয়ে ওঠে উইকেট। ফলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে বোলারদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজেদের পরিকল্পনায় অটল ছিলেন, সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন হাসান। তিনি বলেন, 'সিলেটের উইকেটে আমরা যখন খেলেছি, মুভমেন্ট থাকে, আকাশ মেঘলা থাকে। বেশিরভাগ সময় ফাস্ট বোলারদের পক্ষেই থাকে কন্ডিশন। কিন্তু এই উইকেটটা সম্ভবত প্রথম এক-দুই ঘণ্টা পর খুবই ফ্ল্যাট হয়ে গিয়েছিল, পুরোপুরি ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি। তবে আমি আর তাসকিন ভাই চেষ্টা করেছি লাইন মেইনটেইন করে বল করার এবং কনসিস্টেন্সি বজায় রাখার।'

উইকেট থেকে সুইং ও সিম মুভমেন্ট কমে গেলে বোলারদের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হয়। নতুন বল হাতে আক্রমণাত্মক লেংথে বল করে ব্যাটারদের ড্রাইভ খেলতে বাধ্য করাই থাকে মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে বল পুরোনো হলে কিছুটা পিছিয়ে লেংথে বল করে রান আটকে রাখার দিকে মনোযোগ দিতে হয়।

হাসান বলছিলেন, 'নতুন বলে আমাদের প্ল্যান থাকে যত ওপরে বোলিং করা যায়, ব্যাটারকে ড্রাইভ খেলতে বাধ্য করা। সিম ও সুইং থাকায় স্লিপে ক্যাচ বা বোল্ড হওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু বল পুরোনো হয়ে গেলে আমরা লেংথ একটু পিছিয়ে আনি এবং ইকোনমিক্যাল বোলিং করার চেষ্টা করি। তখন দুই প্রান্ত থেকে মেডেন দিয়ে পার্টনারশিপ বোলিং করাই মূল লক্ষ্য থাকে।'

শুধু কন্ডিশন কিংবা বোলিংয়ের কৌশল নয়, টেস্ট ক্রিকেটে নিজের মানসিকতাকেও সহজ রাখতে চান হাসান। ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথাই জানিয়েছেন তিনি, 'টেস্ট ক্রিকেটে পাঁচ উইকেট সবসময়ই স্পেশাল। আমি জিনিসগুলো খুব সহজ রাখার চেষ্টা করি। কন্ডিশন যেমনই হোক, দলের চাওয়া অনুযায়ী বোলিং করা এবং ডিসিপ্লিন ধরে রাখাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।' ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে হাসানের পারফরম্যান্স অবশ্য শুধু ছয় উইকেটেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৩৩ রান করা আমির জাঙ্গোকে বোল্ড করে দিনের শুরুতে সাফল্য এনে দেন তিনি। পরের বলেই রস্টন চেইসকে ফেরান। মাঝে জশুয়া বিশপের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের সুযোগ তৈরি হলেও রিভিউয়ে বেঁচে যান ক্যারিবীয় ব্যাটার। পরে লিটন দাসের স্টাম্পিংয়ে বিশপকে ফিরিয়ে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। শামার জোসেফকে বোল্ড করে ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইনিংসে ছয় উইকেটের স্বাদও পান তিনি। এই পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে টেস্টে সর্বোচ্চ পাঁচবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এখন এককভাবে তার দখলে। পাশাপাশি অজি তারকা নাথান লায়নের পর দ্বিতীয় বোলার এবং প্রথম পেসার হিসেবে পাঁচটি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচটি ফাইফার নেওয়ার বিরল কীর্তি গড়েছেন তিনি।

এদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৫৬ রানের জবাবে দ্বিতীয় দিন শেষে ১ম ইনিংসে ৩ উইকেটে ৮৮ রান তুলে চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে উইকেটের বর্তমান চরিত্র নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন হাসান। তার আশা, উইকেটে থিতু হওয়া মুশফিকুর রহিম ও তাওহীদ হৃদয় বড় ইনিংস খেলতে পারবেন। একই সঙ্গে ফিল্ডিংয়ের সময় মাথায় আঘাত পাওয়া ওপেনার সাদমান ইসলামকে নিয়েও আশ্বস্ত করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, সাদমান আপাতত শঙ্কামুক্ত এবং পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। ব্যক্তিগত অর্জনের আনন্দের পাশাপাশি এখন হাসানের অপেক্ষা দলের ঘুরে দাঁড়ানোর। কারণ, তার রেকর্ডগড়া বোলিংকে অর্থবহ করে তুলতে হলে ব্যাট হাতেও জ্বলে উঠতে হবে বাংলাদেশকে!

পাঁচটি ভিন্ন দেশে ৫ উইকেট নিয়ে হাসানের বিশ্বরেকর্ড

টেস্ট অভিষেকের মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে পঞ্চমবারের মতো ইনিংসে ৫ উইকেট নেওয়ার স্বাদ পেলেন হাসান মাহমুদ। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তার ক্যারিয়ারের এই প্রথম পাঁচটি ফাইফার এলো পাঁচটি ভিন্ন দেশের মাটিতে। এই সংস্করণের ১৪৯ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন রেকর্ড নেই আর কোনো পেসারের। হাসানকে বর্তমানে কোনো দ্বিধা ছাড়াই টেস্টে বাংলাদেশের সেরা পেসারের তকমা দেওয়া যায়। বল হাতে নিয়মিত আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। আগুন ঝরিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং করে দিচ্ছেন চূর্ণবিচূর্ণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিলেট টেস্টেও এই অসামান্য ধারা বজায় থাকল।

প্রথম ইনিংসে ২৪ ওভারে একটি মেডেনসহ ৯০ রান খরচায় ৬ উইকেট নেন ডানহাতি হাসান। চলতি বছর এটি তার তৃতীয়বারের মতো ৫ উইকেট নেওয়ার নজির। আর টেস্টে এই প্রথম দেশের মাটিতে ফাইফার নিলেন তিনি। ম্যাচের প্রথম দিন সকালে দুটি শিকার ধরা হাসান দ্বিতীয় দিনেও তেতে ওঠেন। শুক্রবার ফের নতুন বল কাজে লাগিয়ে তিনি যোগ করেন আরও ৪ উইকেট। ফলে লাল বলের ক্রিকেটে অনন্য এক কীর্তির মালিক হয়ে গেলেন। ইতিহাসের প্রথম পেসার এবং অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি স্পিনার ন্যাথান লায়নের পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচটি ফাইফার নিলেন পাঁচটি আলাদা দেশে।

২৭ বছর বয়সী এই পেসারের প্রথম ৫ উইকেট ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে, পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে। দ্বিতীয়টি ছিল সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পরের টেস্টেই, ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে। তৃতীয়টির দেখা মেলে গত আগস্টে ডারউইনে, অস্ট্রেলিয়ার মাঠে ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে। আর চতুর্থটি ছিল গত মাসেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের ইতিহাস গড়াসহ ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। আরেকটি অর্জনে বাংলাদেশের সব পেসারকে ছাড়িয়ে চূড়ায় উঠে গেলেন হাসান। মাত্র ১৯ ম্যাচ খেলেই তিনি এখন দেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশিবার ৫ উইকেট নেওয়া ফাস্ট বোলার। পেছনে পড়ে গেলেন ৩৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে চারবার ইনিংসে ফাইফার পাওয়া শাহাদাত হোসেন। এছাড়া, দুবার করে ৫ উইকেট আছে নাহিদ রানা ও রবিউল ইসলামের।