
ত্বকের র্যাশ বা ফুসকুড়ি (Skin Rash & Eruption) হলে আক্রান্ত ত্বকের স্থানের রং পাল্টে যায়, স্বাভাবিক ত্বকের সঙ্গে যার পার্থক্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। বিভিন্ন কারণে শিশুদের মধ্যে এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে খাবার বা ওষুধের অ্যালার্জির কারণেও এটা হয়ে থাকে। তাছাড়া গ্রীষ্মকালে সূর্যের তাপে ত্বকের ওপর র্যাশ (Rash) দেখা যায়। ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া, ফাঙ্গাস, বা পরজীবী সংমণের কারণেও ত্বকের র্যাশ হতে পারে। কখনও কখনও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ত্বকের র্যাশ দেখা দিতে পারে। কখনও কখনও কোনো অ্যালার্জি সংক্রমণের আগাম উপসর্গ হিসেবে ত্বকের র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা যায়, যা থেকে প্রবল চুলকানি হয়, ফুল যেতে পারে এবং সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং পরে সেগুলো ফুসকুড়ি বা ফোঁড়ায় পরিণত হয়। তবে শিশুদের জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি বা র্যাশসহ বিশেষ কয়েকটি ভাইরাসজনিত রোগ হয় যেগুলোকে Exzanthemous Disease (এক্স্যান্থেম) বলা হয়। যেমন, জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chicken pox), হাম এবং রুবেলাসহ বেশ কয়েকটি ভাইরাস সংক্রমণের শিশুদের জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ি বা র্যাশ (এক্স্যান্থেম) হয়। এ ভাইরাসজনিত অসুস্থতাগুলো সাধারণত এমনিতেই সেরে যায়। তবে কখনও কখনও জ্বরে আক্রান্ত ফুসকুড়ি আরও মারাত্মক হতে পারে।
কয়েকটি জীবাণু সংক্রমণ যেমন মেনিনগোকক্কাল সংক্রমণ, সেলুলাইটিস ইত্যাদি মারাত্মক হতে পারে। আবার কিছু ভাইরাস সংক্রমণ যেমন রোসিওলা, ফিফ্থ রোগ খুবই হালকা রোগ। বাচ্চা যখন ফুসকুড়ি নিয়ে জ্বর হয়, তখন পিতামাতারা স্বভাবতই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এসব ক্ষেত্রে অতি শিগগির একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত, বিশেষত যদি শিশু খুব অসুস্থ থাকে বা তাদের লক্ষণগুলো দ্রুত খারাপের দিকে যায়। অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে ড্রাগের পার্শপ্রতিক্রিয়ার কারণেও ফুসকুড়ি বা জ্বর হতে পারে। যেহেতু, বিভিন্ন কারণে বা পরিস্থিতিতে শিশুদের জ্বরের সঙ্গে ফুসকুড়ির লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা ভয়ংকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই প্রথম দিকেই রোগ নির্ণয় করা জরুরি। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রোগের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো।
হাম (Measles)
হাম একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। ঠিকমতো এ রোগের চিকিৎসা না করা হলে রোগী নানা জটিলতায় পড়তে পারে। তবে হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। শিশুরাই হামে বেশি আক্রান্ত হয় বলে এক বছর থেকে ১৮ মাস বয়সি শিশুদের হামের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।
রুবেলা বা জার্মান হাম (Rubella or German Measles)
রুবেলা বা জার্মান হাম তিন দিনের হাম নামেও পরিচিত, রুবেলা একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগ প্রায়ই মৃদু এবং আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকই অসুস্থতা বুঝতে পারে না। লালচে ফুসকুড়ি সংক্রমণের প্রায় দুই সপ্তাহ পর শুরু হয়ে তিন দিনের জন্য স্থায়ী হতে পারে। এটি সাধারণত মুখের ওপর শুরু হয় এবং শরীরের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে। হামের মতো একই জায়গায়; কিন্তু কম লাল হামের ফুসকুড়ির মতো উজ্জ্বল নয় এবং কখনও কখনও চুলকানি হয়। বড়দের অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়। রুবেলা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ যা একটি মাত্র টিকার মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য। প্রায়ইই এটা হাম এবং কোনো ক্ষেত্রে হাম ও মাম্পস ভ্যাকসিনের সঙ্গে একযোগে দেওয়া হয় যা এমআর ও এমএমআর টিকা হিসাবে পরিচিত।
গর্ভাবস্থার প্রাথমিক পর্যায় মায়ের সংক্রমণ থেকে জন্মগত রুবেলা সিনড্রোম (সিআরএস) হতে পারে। সিআরএস আক্রান্ত শিশুরা এক বছরের বেশি সময় পর্যন্ত ভাইরাস রোগ ছড়াতে পারে।
জল বসন্ত (Chicken pox)
ভেরিসেলা-জস্টার (Varicella zoster) নামক ভাইরাসের কারণে চিকেন পক্স হয়। চিকেন পক্সে জ্বর, ক্লান্তিবোধ, বিরক্তিভাব ও মাথাব্যথার মতো উপসর্গের সঙ্গে শুরু হতে পারে। ফুসকুড়ির এক বা দুই দিনের মধ্যে দেখা দেয়, পুরো শরীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুটি, গুটিগুলো ভেতরে পানি ভরা ফোস্কার মতো হয়। আর একারণেই একে জলবসন্ত বলা হয়। ফোস্কাগুলো চুলকায় এবং শুকনো চামড়া ফেটে গিয়ে রক্তপাত হতে পারে।
স্কারলেট জ্বর (Scarlet Fever)
স্কারলেট জ্বর ‘গ্রুপ এ স্ট্রেপ্টোকোকাস’ সংক্রমণের ফলে গলায় প্রদাহ থেকে হয়। স্ট্রেপ একটি ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণ এবং সংক্রমণের কিছু দিনের মধ্যে আক্রান্তরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফুসকুড়ি বুকে, ঘাড় বা কুচকিতে দেখা দেয়।
ঘরোয়া সমাধান
অধিকাংশ সময়ে ত্বকের র্যাশের কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না এবং নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু ঘরোয়া প্রতিকারের সাহায্যে উপসর্গের উপসম হয়। যেমন- ক্যালামাইন লোসন লাগালে অথবা গায়ে পাউডার দিলে নিরাময় হয়। প্রয়োজন বোধে অ্যান্টি অ্যালার্জিক বা অ্যান্টি হিস্টামাইন অথবা স্টেরয়েড ক্রিম বা মলম ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া ঠান্ডা পানি, নিমপাতা দিয়ে গা ধোঁয়া, বরফের সেক, পাউডার দিলে জ্বালা ও চুলকানির উপশম করা যায়।
অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন
সভাপতি, বাংলাদেশ শিশু চিকিৎসক সমিতি
চেম্বার : সাত মসজিদ রোড ধানমন্ডি, ঢাকা
সেল- ০১৭১১-৫৩৫১৪৮