পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগ

মো. জিয়াউল হক হাওলাদার

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন এখন একটি অনন্য শিল্প। পর্যটন হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র ক্রমবর্ধমান এবং সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল শিল্প। এই শিল্প একটু অনুকূল পরিবেশ পেলে যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করে দ্রুত উন্নতি লাভ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব সভ্যতা যতদিন থাকবে পর্যটন কর্মকাণ্ড ততদিন বেঁচে থাকবে। মানুষ শুধু বাণিজ্যিক কারণেই ভ্রমণ করে না। তাদের আত্মিক প্রয়োজনেও ভ্রমণ করতে হয়। বিভিন্ন সময়ের শিল্প বিপ্লবের ফলে পর্যটন শিল্পের গতি লাভ করেছে; এবং একই সঙ্গে এর বিভিন্ন পরিষেবার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। সামনে আমাদের আসছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এই শিল্প বিপ্লবের কারণে বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্পের পরিষেবাগুলোতেও পরিবর্তন আসবে। কিন্তু পর্যটন শিল্প টিকে থাকবে। মানুষ তার প্রয়োজনেই স্থান পরিবর্তন করে ভিন্ন পরিবেশের আমেজ পেতে চাইবে। ভ্রমণ মানুষের আত্মার শক্তি জোগায়। মানুষের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধশালী করে তোলে। যিনি বেশি বেশি ভ্রমণ করেন তিনিই ধনী।

গত ২ বছরে অতিমারি কোভিড পর্যটন শিল্পের সব স্থিতিমাপে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্প যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগছে। কিন্তু পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিভিন্ন দেশ পর্যটন শিল্পের ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা এবং পলিসি সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সরকারের প্রণোদনা এবং পলিসি সহায়তায় এক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীর সঙ্গে সঙ্গে এদেশের পর্যটন শিল্পেরও সুবর্ণ জয়ন্তী হয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এ পর্যন্ত ১৪০০টির বেশি পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করেছে। এসব পর্যটন আকর্ষণের সবগুলোরই ডকুমেন্টেশন করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব আকর্ষণগুলোকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নানাবিধ সুবিধাদি তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে নানা উদ্যোগ। পাবলিক-প্রাইভেট সেক্টরের যৌথ উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ঘটছে। দেশে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসংস্থান।

বাংলাদেশ পর্যটন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে অমিত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এত বেশি রূপবৈচিত্র্য, যা পর্যটকদের সহজেই মোহিত করে। এ দেশে অবস্থিত পৃথিবীর দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, বাংলাদেশের সবুজ ছাদ বান্দরবান, বর্ণাঢ্য নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি ও লেকসিটি রাঙ্গামাটি, পাহাড়ি অঞ্চলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য, হাওর-বাঁওড়, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, বিভিন্ন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রভৃতি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

বাংলাদেশ এ সম্ভাবনাময় শিল্পের সুষ্ঠু উন্নয়ন ও বিকাশের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে আসন করে নিতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠমোর মাধ্যমে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এ দেশে পর্যটন শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ ও উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা যায়। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন দেশের একক বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পে পরিণত হবে।

আমাদের দেশে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন যেমন- বগুড়ার মহাস্থনগড়, নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যার আরেক নাম সোমপুর বিহার এবং বাসু বিহার, কুমিল্লার ময়নামতি, জয়পুরহাটের জগদ্দল বিহার এবং ভীমের পান্টি। এছাড়া আরও রয়েছে দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির এবং নয়াবাদ মসজিদ, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মন্দির, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট্ট সোনামসজিদ, টাঙ্গাইলের আতিয়া জামে মসজিদ, বাগরেহাটের খান জাহান আলীর ষাটগম্বুজ মসজিদ। এছাড়া, ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে রয়েছে মোঘল এবং সুলতানি আমলের অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। আরও আছে ব্রিটিশ শামসনামলের উপনিবেশিক হেরিটেইজ। আবার ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনেক নিদর্শনও রয়েছে। কারণ বাঙালিরাই সর্বপ্রথম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়। বাঙালিরা যে বীরের জাতি, তা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়ে আসছে। অথচ, স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত আমাদের এই গৌরবমাখা ইতিহাস বিশ্বের কাছে পাকিস্তানির শাসকরা তুলে ধরতে দেইনি। স্বল্পমাত্রায় হলেও আমরা আজ তা করতে পারছি।

ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন ছাড়াও বাংলাদেশে অসংখ্য প্রাকৃতিক আকর্ষণ আছে- কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, ইনানী, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ড, কুয়াকাটা এবং বিশ্বের বিশ্বয় সুন্দরবন। এদিকে আছে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে চা বাগান, লাউয়াছড়া, মাধবকুণ্ড, জাফলং, তামাবিল, নীরব প্রকৃতি এবং খাসিয়াদের এলাকা জৈন্তিয়া। আরও আছে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়ি। নেত্রকোনার বিরিসিরি, ললনা সোমেশ্বেরী নদী এবং সুসংদুর্গাপুর। আছে বিভিন্ন ধরনের নৃতাত্ত্বি জাতিগোষ্ঠী- গারো, হাজং, সাঁওতাল, চাকমা, মুরং ইত্যাদি। কী নেই এই বাংলাদেশে?

পৃথিবীতে এই পর্যন্ত যতগুলো দেশ পর্যটন শিল্পে এগিয়ে গেছে, তার প্রধান কারণ হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ভর করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পর্যটন শিল্পে এগিয়ে গেছে। আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ এখনও সন্তোষজনক নয়। তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ সরকারি পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সব উপখাত যেমন- ট্যুর অপারেশন, ট্র্যাভেল এজন্সি, হোটেল, মোটেল, বার, রিসোর্ট সবগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে আমাদের। বর্তমানে প্রাইভেট সেক্টরের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মিডিয়ার ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার ফলে সরকার পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে চায়। এজন্য গ্রহণ করা হচ্ছে নানাবিধ কর্মসূচি। এই শিল্পের উন্নয়নে প্রণীত হচ্ছে কিছু সহায়ক আইন। ইতোমধ্যে ‘বিশেষ পর্যটন অঞ্চল আইন এবং পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা আইন-২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইন প্রণয়নের ফলে ‘বিশেষ পর্যটন অঞ্চল’ উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হচ্ছে। সরকার দেশে টেকসই পর্যটন উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া বিদেশে প্রচার-প্রচারণা এবং পর্যটন বিপণনের জন্য গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড। বর্তমান সময়ের বিশ্ব পর্যটন শিল্পের গতি-প্রকৃতি এবং পর্যটকদের রুচি এবং ধরন অনুযায়ী একটি হালনাগাদ পর্যটন নীতিমালাও তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য প্রয়োজন জরুরি বিদেশি বিনিয়োগ। যেভাবেই হোক আমাদেরকে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। আমরা এই জন্য মালয়েশিয়া কিংবা মালদ্বীপের আদলে একটি পর্যটন বিনিয়োগ অবকাঠামো তৈরি করতে পারি।

জাতীয় বাজেটে আরও বরাদ্দ পেলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প হবে গার্মেন্টস শিল্পের মতো আরেকটি বৈদিশক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ৪ ভাগের মতো। প্রায় ৪৩ লাখ লোক এ সেক্টরে কর্মরত আছে। আমাদের লক্ষ্য জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ন্যূনতম ১০ ভাগে উন্নীত করা; পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে এদেশের কোটি যুবক-যুবতীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচন করা। আমরা যদি তা করতে পারি, তাহলে অমাদের স্বাধীনতার অর্জন সার্থক হবে।

 

লেখক : ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন