কৃষি-পর্যটন

এগ্রো ট্যুরিজম : গ্রামই গন্তব্য

জোবায়ের ইসলাম

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত শীতে আমাদের খামারে এক ইউরোপীয় অতিথি এসেছিলেন। ভোরবেলা তাকে নিয়ে গেলাম ধানখেতের আইলপথে। কুয়াশা তখনও কাটেনি, দূরে গোয়াল থেকে ভেসে আসছে গরুর ডাক। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর যে কথাটা বললেন, সেটা আমি আজও ভুলিনি। 'সমুদ্র তো আমার দেশেও আছে। কিন্তু এই ভোরটা নেই।'— এই একবাক্যে তিনি বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন। প্রশ্নটা হলো, কক্সবাজারের পরে বাংলাদেশ কী বেচবে?

হিসাবটা খুলে বলি। আমাদের পর্যটন এখনও দাঁড়িয়ে আছে মূলত দুটি পণ্যের ওপর : সমুদ্র আর পাহাড়। দুটোই ভৌগোলিকভাবে সীমিত, মৌসুমে ভিড়ে ক্লান্ত, আর অবকাঠামোর চাপে পিঠ কুঁজো হয়ে যাওয়ার অবস্থা। ছুটির দিনে কক্সবাজারে হোটেল মেলে না, সাজেকের পথে গাড়ির সারি। অর্থাৎ আমাদের সমস্যা চাহিদার নয়, পণ্যের। ক্রেতা প্রস্তুত, তাকের পণ্য ফুরিয়ে আসছে। অথচ বিশ্বপর্যটন এ মুহূর্তে যেদিকে ছুটছে, সেই তাকটা আমাদের ভরা। আধুনিক পর্যটক আর জায়গা দেখতে বের হন না, তিনি জীবন ছুঁতে বের হন। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি। আর এ অভিজ্ঞতার অর্থনীতির সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা শাখাটির নাম এগ্রো ট্যুরিজম : খামারে থাকা, ফসল তোলা, গ্রামীণ জীবনযাপনের পর্যটন। বৈশ্বিক বাজারটি এখন প্রায় ৮১ বিলিয়ন ডলারের, বাড়ছে বছরে ১১ শতাংশ হারে। তুলনার জন্য বলি, পুরো বিশ্ব-অর্থনীতিও এত দ্রুত বাড়ে না।

ভাবনাটা নতুন নয়। সত্তরের দশকে ইটালির গ্রামগুলো যখন শহরমুখী অভিবাসনে খালি হয়ে যাচ্ছিল, তখন সেখানকার কৃষকরা খামারের দরজা খুলে দিলেন শহরের ক্লান্ত মানুষের জন্য। ১৯৮৫ সালে ইটালি আইন করে খাতটিকে স্বীকৃতি দিল, নাম এগ্রো ট্যুরিজম। আজ সে দেশে প্রায় ২৫ হাজার নিবন্ধিত এগ্রো ট্যুরিজম খামার, আর সেই 'খালি হয়ে যাওয়া' গ্রামগুলোই ইউরোপের পর্যটকের প্রিয় গন্তব্য। ইটালির পথ ধরে জাপানের গ্রিন ট্যুরিজম, দক্ষিণ কোরিয়ার থিম ভিলেজ, ভিয়েতনাম, চীন, এমনকি পাশের দেশ ভারত। সবার শিক্ষা একটাই : গ্রাম শুধু খাদ্য ফলায় না, গ্রাম নিজেই একটা পর্যটন-অর্থনীতি। এবার প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশে এটা চলবে তো? অনুমানে উত্তর দেব না। আমি নিজের খামারের খাতা খুলে দিচ্ছি। বগুড়ার কাহালুর প্রত্যন্ত গ্রাম বাগইলে আমরা গড়ছি সুখের খামার এগ্রো ভিলেজ, বাংলাদেশের প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক এগ্রো ট্যুরিজম প্রজেক্ট। প্রকল্পটি এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালুই হয়নি। অথচ গত দেড় বছরে এ গ্রামে বেড়াতে এসেছেন দুই হাজারের বেশি অতিথি, রাত কাটিয়েছেন নয় শতাধিক, এসেছেন সাতজন বিদেশি। তাদের হাত ধরে গ্রামের মানুষের পকেটে ঢুকেছে এক কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ। কোনো ভর্তুকি নয়, অনুদান নয়; বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন। রহিমা বেগম নামে যে নারী একদিন মেয়ের চিকিৎসার জন্য দুটি মুরগি বেচতে এসেছিলেন, তিনি আজ প্রতি মাসে ১০-১২টা হাঁস-মুরগি বিক্রি করেন অতিথিদের কাছেই, মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া, ন্যায্য দামে। পূর্ণাঙ্গ চালুর পর আমরা বছরে ১২ থেকে ১৫ হাজার অতিথি প্রত্যাশা করছি। একটি মাত্র গ্রামে। এখন জাতীয় অঙ্কটা করুন। বাংলাদেশে গ্রাম প্রায় ৯০ হাজার। মাত্র এক-শতাংশ গ্রাম যদি বছরে গড়ে ১ কোটি টাকার পর্যটন-আয় তুলতে পারে, সেটা বছরে ৯০০ কোটি টাকার সম্পূর্ণ নতুন গ্রামীণ অর্থনীতি, সঙ্গে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান, নিজের গ্রামে, নিজের মাটিতে। আর বিদেশি পর্যটকের জন্য? সমুদ্র-পাহাড় পৃথিবীর সব দেশে আছে। কিন্তু ভোরের আজান, ধান কাটার উৎসব, বাউলের আসর, মাটির চুলার পিঠা : এ 'অথেনটিক বাংলাদেশ' আছে শুধু আমাদের গ্রামে। আমার সেই ইউরোপীয় অতিথিই তো সাক্ষী।

দরকার শুধু তিনটি জিনিস। পর্যটন নীতিমালায় এগ্রো ট্যুরিজমের আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞায়ন ও স্বীকৃতি, যেমনটা ইটালি দিয়েছিল ৪০ বছর আগে। গ্রামীণ পর্যটন-উদ্যোক্তার জন্য সহজ শর্তের ঋণ। আর গ্রামমুখী সড়ক-সংযোগ। বাকিটা বাজার নিজেই করে নেবে; রহিমা বেগমরা করে নেবেন।

তাহলে ফিরে আসি সেই প্রশ্নে। কক্সবাজারের পরে বাংলাদেশ কী বেচবে? উত্তরটা আমাদের চোখের সামনেই। ৯০ হাজার গ্রাম, ৯০ হাজার গন্তব্য। গ্রামই গন্তব্য।

 

লেখক : এগ্রো ট্যুরিজম উদ্যোক্তা; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সুখের খামার এগ্রো লিমিটেড