মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৩৮৫)
সুলায়মান (আ.) এর কাছে রানি বিলকিসের উপহার
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হজরত সুলায়মান (আ.) ছিলেন বনি ইসরাঈল বংশে আল্লাহর নবী এবং তখনকার দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি বাদশাহ। মানুষ ছাড়াও জিন- দানবদের ওপর তার রাজত্ব ছিল। পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গের ভাষা তিনি বুঝতেন। হজরত সুলায়মান (আ.) ও ‘সাবা’র রানি বিলকিসের কাহিনী কোরআন মাজিদে সুরা নামল, আয়াত ২০-৪৫ এ বিবৃত হয়েছে। মসনবি দ্বিতীয় খণ্ডে ৩৭৫১নং বয়েত সূত্রে এর বিস্তারিত বিবরণ বিধৃত হয়েছে। সুরা নামল ৩৫নং আয়াতে এক কথায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘বিলকিস’ ‘সুলায়মান’ এর কাছে উপঢৌকন পাঠিয়েছিল। কোরআন মাজিদে এই উপঢৌকন কী জিনিসের ছিল এবং তার পরিমাণ কত ছিল সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। কারণ, কোরআন মাজিদের শিক্ষাপদ্ধতি হলো ঘটনার খুটিনাটি বর্ণনায় প্রবেশ না করা। তাতে মানুষের মন হেদায়াত গ্রহণের পরিবর্তে খুটিনাটি বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
তবে মুফাসসিরদের অনেকে এই হাদিয়া কী পরিমাণ ছিল এবং কোন কোন আইটেম ছিল তা নির্ণয় করার প্রয়াস পেয়েছেন। এ বিষয়ে জড়িয়ে তারা ঘটনার আসল উদ্দেশ্য ও সেখান থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণের দিকটি একেবারে ভুলে গেছেন। ফলে কোরআন মাজিদের উদ্দেশ্য বর্ণনা বা তাফসিরের চেয়ে রূপকথার চর্চা হয়েছে বেশি। কোনো কোনো মুফাসসির বলেছেন, রানি ‘বিলকিস’ এর সেই হাদিয়া ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্যের দুটি ইট, সঙ্গে অভিন্ন ইউনিফর্র্ম পরিহিত একশ’ গোলাম ও বাঁদী। কোনো কোনো মুফাসসির আরো এগিয়ে বলেছেন যে, এই ইটের পরিমাণ ছিল ৫০০, যা পাঁচশ’ দাসদাসী সমেত পাঠিয়েছিলেন। সুলায়মান (আ.) বিলকিসের প্রেরিত কাফেলার সংবাদ শুনেই তার অধীন জিনদের হুকুম করলেন, অতিসত্বর তোমরা বিপুল পমিাণ স্বর্ণ ও রূপার ইট
জোগাড় কর, তা দিয়ে কয়েক মাইল রাস্তা সোনা ও রুপায় মুড়িয়ে দাও। শহরের প্রাচীর মোড় সর্বত্র স্বর্ণ ও রৌপ্যের আলোকসজ্জায় অপরূপ সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটাও। রানি বিলকিসের প্রতিনিধিরা সোনা রুপার কয়েকটি ইট হাদিয়া নিয়ে বড় মনে সুলায়মান (আ.) এর দেশে প্রবেশ করে। তারা তো হতবাক। তারা যে এখন সোনা ও রুপায় মোড়ানো এক রূপকথার শহরে। তাই তাদের উপঢৌকন লুকিয়ে ফেলল লজ্জার কারণে। কাহিনীর এই অংশ অবলম্বনে মওলানা রুমি বলেন, মানুষ দুনিয়ার সহায়-সম্পদ, জ্ঞান-বুদ্ধি, ইবাদত-বন্দেগি ও নিজের অস্তিত্বের সঞ্চয় যা কিছু আল্লাহর দরবারে নিয়ে যায় তা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। এ গল্পে ‘বিলকিস’ এমন সাধকের চরিত্র, যিনি আল্লাহকে পাওয়ার সাধনায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান। কিন্তু দুনিয়াবি সম্পর্ক ও আকর্ষণ তার এই যাত্রায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর অনুগ্রহে দুনিয়াবি আকর্ষণ থেকে মনকে মুক্ত করতে সক্ষম হয় আর আল্লাহর
সন্ধানী সাধকদের কাতারে শামিল হয়ে যায়।
মওলানা রুমি (রহ.) বলেন,
হাদিয়েয়ে বিলকিস চেহেল্; উস্তুর বুদাস্ত
বা’রে আ’নহা’ জুমলা খেশতে যর বুদাস্ত
রানি বিলকিসের উপহার ছিল চল্লিশ খচ্চর বোঝাই
সব মালামাল ছিল উপহার স্বর্ণের ইট নিখাদ।
হজরত সুলায়মান (আ.) এর কাছে ‘সাবা’র রানি বিলকিসের উপহার
সামগ্রীর পরিমাণ ছিল চল্লিশটি বলবান খচ্চরের বোঝাই আর সব মালামাল ছিল নিখাদ স্বর্ণের ইট। বিলকিসের দূতরা উপহারসামগ্রী নিয়ে সুলায়মানের দেশে প্রবেশ করে দেখল রাস্তাঘাট, বাড়িঘর সব সোনায় মোড়ানো, সর্বত্র সোনালি ফারাশ বিছানো। স্বর্ণের ওপর দিয়ে চল্লিশ মনযিল পর্যন্ত তারা পথ চলল। মনে হল, স্বর্ণ বুঝি মূল্যবান কিছুই না। তারা পরস্পরকে একাধিকবার বলল, ভালো হয়, আমাদের মান ইজ্জত যাবার আগে স্বর্ণের ইটগুলো রানির কোষাগারে ফিরিয়ে দিই। যেখানে স্বর্ণ ও রুপার জৌলুস জ্বলজ্বল করছে, সেখানে স্বর্ণের কয়েকটি ইট হাদিয়া নিয়ে যাওয়া চরম বোকামি হবে। এই চিন্তা, উপলব্ধি ও লজ্জার চেতনায় এক পর্যায়ে তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। জড়ো হয়ে বলল, আমাদের সঙ্গে যে উপঢৌকন নিয়ে এসেছি মূল্যবান হোক বা মূল্যহীন, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা কেন, আমরা তো হুকুমের গোলাম। এই উপহার স্বর্ণ হোক বা মাটি হোক আমাদের নিয়ে যেতেই হবে। তিনি রানি, আমাদের নেত্রী, তার আদেশ পালন করতেই হবে। যদি নির্দেশ আসে যে তোমাদের উপঢৌকন ফিরিয়ে নাও, যে পাঠিয়েছে তাকে দিয়ে এসো, তাহলে সেই হুকুম তামিল করতে আমরা প্রস্তুত আছি।
রানি বিলকিসের দূতরা সুলায়মান (আ.) এর দরবারে উপঢৌকন নিয়ে উপস্থিত হলো। উপহারসামগ্রী দেখেই সুলায়মানের হাসি পেল। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের কাছে এইটুকুন হাদিয়া চেয়েছি। অর্থাৎ চাইনি।
মন নমী গূয়াম মোরা হাদিয়া দহীদ
বলকে গুফতাম লায়েকে হাদিয়া শওয়ীদ
আমি তোমাদের বলিনি আমাকে হাদিয়া দাও
বরং বলেছি, হাদিয়ার যোগ্য তোমরা নিজেরা হও।
কারণ আমার কাছে আছে বিরল দুর্লভ হাদিয়া। কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এমন হাদিয়া অর্জন। সেই হাদিয়া ইলমে লাদুন্নী। খোদায়ি হাকিকতের জ্ঞান। তোমরা যে সূর্যের পূজা কর, যা কিনা পৃথিবীতে কিরণ বিলায়, খনিতে স্বর্ণ রত্নে পাথরের রূপান্তর ঘটায়। এসব বাদ দিয়ে যাও এমন খোদার কাছে যিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র অগণন গ্রহ নক্ষত্র। তোমরা তো পূজা কর আকাশের চাঁদনিকে। তাতে নিজের অমূল্য রূহ ও সত্তাকে অপমান কর। সুরা নমলে বর্ণিত-
‘আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের কার্যাবলি তাদের নিকট শোভন করে দেখিয়েছে এবং তাদের সৎপথ হতে নিবৃত্ত করেছে, ফলে তারা সৎপথ পায় না।’ (সুরা নামল:-২৪)।
প্রাচীন জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সূর্য পূজার প্রচলন ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবীতে আগুন, উত্তাপ ও আলোর উৎস সূর্য। জীবন জগৎ সূর্যের প্রভাবে পরিচালিত। আরবের দক্ষিণাঞ্চলে রানি বিলকিস শাসিত ‘সাবা’বাসীও সেই আকিদায় সূর্যের পূজারী ছিল। মওলানা বলেন,
‘আফতাব আয আমরে হক তব্বাখে মাস্ত
আবলাহী বাশদ কে গূয়াম উ খোদাস্ত
সূর্য আল্লাহর আদেশে হয়েছে আমাদের রাধুনি
আহম্মকি হবে যদি বলি আমাদের খোদা ইনি।
মওলানা ব্যাখ্যা করেন, সূর্যগ্রহণ হলে কী কর? সূর্যের গায়ের কালো রেখা দূর করার জন্য কাঁসা পিটিয়ে কতভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা কর যে, প্রভু হে! সূর্যকে বাহুগ্রাস থেকে মুক্ত কর। সূর্য তো দিনে থাকে, রাতে কেউ তোমাকে হত্যা করলে তার কাছে কি নিরাপত্তা চাইতে পার। বিপদ অঘটন তো অধিকাংশ রাতেই ঘটে। তোমাদের উপাস্য তো তখন অদৃশ্য।
সূয়ে হক গর রাস্তা’নে খুম শওয়ী
ওয়ারহী আয আখতরা’ন মাহরাম শওয়ী
যদি নিষ্ঠায় নত হও আল্লাহর সম্মুখে
মুক্তি পাবে গ্রহ নক্ষত্র হতে সম্মানীয় হবে।
তুমি যদি আল্লাহর হয়ে যাও, তিনি কথা বলবে তোমার সনে মনের আলাপনে। তখন নিশিরাতে দেখবে সূর্য ঊর্ধ্ব গগনে। স্বচ্ছ পবিত্র রূহ ছাড়া অন্য কোনো দিগন্তে উদিত হয় না হাকিকতের সেই সূর্য। তার উদয়ে ফারাক নেই সকাল সন্ধ্যার, দিবস রজনীর। তোমার হৃদয়ের চোখ যখন উন্মিলিত হবে আর আল্লাহর অবিনাশী নূরে আলোকিত হবে তখন দেদিপ্যমান আকাশের সূর্য অতি তুচ্ছ মনে হবে। কথায় বলে, দৃষ্টিভঙ্গী বদলাও জীবন বদলে যাবে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গী মানুষের চেতনা ও দৃষ্টিকে নিয়ে যায় উন্নতির শিখরে। ফলে দুনিয়ার চাকচিক্য ধন-সম্পদ যা মানুষকে উন্মাতাল করে, অন্তরদৃষ্টি-ওয়ালাদের কাছে মাছির পালকের মতোও মূল্য নেই তার।
দীদায়ে হিসসি যবূনে আফতাব
দীদায়ে রব্বানী জু ও বিয়া’ব
ইন্দ্রিয় দৃষ্টি সূর্যের সম্মুখে অক্ষম বিনীত খোদায়ি দৃষ্টি চাও, হও আলোকিত। যাহেরি চোখ দিয়ে দেদিপ্যমান সূর্যের দিকে তাকানো যায় না। তুমি দিব্য দৃষ্টি সন্ধান কর ও অর্জন কর। তখন দুনিয়ার জৌলুস, ভোগ বিলাস সূর্য চন্দ্রের মতো বড় মনে হবে না। সবই তোমার চোখে তুচ্ছ নগণ্য রূপে ধরা দেবে।
কা’ন নযর নূরী ওয়া ইন নারী বুয়াদ
না’র পীশে নূর বস তারী বুযাদ
কারণ সেই দৃষ্টি নুর জ্যোতির, এটি নার আগ্নেয়
জ্যোতির সম্মুখে আগুন আঁধার, তুচ্ছ নগণ্য।
(সূত্র: মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৪খ. বয়েত-৫৭৮-৫৯৭)।
