প্রকৃত মানুষের বৈশিষ্ট্য

শাহাদাত হোসাইন

প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা জানি মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শুধু অবয়ব ও আকৃতির নাম মানুষ নয়। মানুষের অবয়বে জন্ম নিলেই প্রকৃত মানুষ হয় না। শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয় না। প্রকৃত মানুষ হতে, কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন। যা ছাড়া মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। মানুষ শ্রেষ্ঠ জ্ঞান বুদ্ধির বিচারে। ভালোমন্দ বিবেচনা জ্ঞানের কারণে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, অতপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন (সুরা শামস : ৮)। জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করেই মানুষ হতে হবে। আসুন, ইসলামের আলোকে জেনে নিই মানুষ কীভাবে হব? প্রকৃত মানুষের বৈশিষ্ট্য কী?

সবার আগে আল্লাহকে চেনা : প্রকৃত মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সে সবকিছু থেকে তার রবকে প্রাধান্য দেয়। নিজ দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও প্রকৃতিতে খুঁজে ফিরে রবের পরিচয়। আল্লাহ মানুষকে চোখ দিয়েছেন আল্লাহর সৃষ্টি দেখে তাঁকে চিনতে। কান দিয়েছেন তাঁর বাণী শুনে উপলব্ধি করতে।

আর বিবেক দিয়েছেন সত্য-মিথ্যা অনুধাবন করে আল্লাহকে চিনতে এবং তাঁর ইবাদত করতে। শয়তানের পদাঙ্কানুসরণ হতে বিরত থাকতে। কোরআনে এসেছে, আর আমি সৃষ্টি করেছি দোজখের জন্য বহু জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো, বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর (সুরা আরাফ : ১৭৯)। যে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার করে তার স্রষ্টাকে চিনতে পারল না। সে অবয়বে মানুষ হলেও, প্রকৃত মানুষ নয়।

রাগ দমন করা : রাগ-গোস্বা মানবের স্বভাবজাত বিষয়। তা মানুষের মধ্যে থাকাটা স্বাভাবিক। তবে মানুষের কাজ হলো, তা নিয়ন্ত্রণ করা। নিজের ইচ্ছামতো তার ব্যবহারে শক্তি অর্জন করা। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন সেখানে ততটুকুই ব্যবহার করা। সাহাবি আবু হোরায়রা (রা.) নবীজি থেকে বর্ণনা করেন। কুস্তি (মল্লযুদ্ধ) বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।

রং রাগের সময় আত্মসংবরণ করা প্রকৃত শক্তিমত্তার পরিচায়ক (আদাবুল মুফরাদ : ১৩৩৪)। রাগ দমনের শক্তি ব্যক্তিকে পূর্ণাঙ্গ করে। নবীজি রাগ দমনে মৌনতার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, শিক্ষা দেও এবং সহজতা করো। আর রাগ হলে মৌনতা অবলম্বন কর (আদাবুল মুফরাদ : ১৩৩৭)।

বিনয়ী হওয়া : সুরা ফুরকানে আল্লাহ বলেন, দয়াময়ের বান্দা তারা, যারা দুনিয়াতে নম্রভাবে বিনয়ী হয়ে চলাফেরা করে (৬৩)। বিনয়, নম্রতা মানুষকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়। বিনয়হীনতা মানুষকে অপূর্ণাঙ্গ বানায়। প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য বিনয়ী হওয়া আবশ্যক। নবীজি বলেছেন, সাদকায় সম্পদ কমে না। ক্ষমায় ক্ষমাকারীর শুধু সম্মানই বৃদ্ধি পায় আর বিনয়ীর মাধ্যমে আল্লাহ সেই ব্যক্তির শুধু মর্যাদাই বৃদ্ধি করেন (মুয়াত্তা মালেক : ২১১২)। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে বিনয়ী হবে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং দুনিয়ার প্রশস্ততা দান করবেন (আয-যুহুদ : ১৮)।

পরিশ্রমী হওয়া : পরিশ্রম সৌভাগ্যের জিয়নকাঠি। ভাগ্য নির্মাতা আল্লাহ। তিনি যা নির্ধারণ করেন, তার ব্যত্যয় হয় না। তবে আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে, তিনি পরিশ্রমীদের হতাশ করেন না। রিক্তহস্তে ফেরান না। আল্লাহ বলেন, মানুষ তাই পায়, যা সে করে (সুরা আরাফ : ৩৯)। মানুষকে সুস্থ সবল অঙ্গ-প্রতঙ্গ দেয়া হয়েছে পরিশ্রম করার জন্য। অলসতা এক প্রকারের ত্রুটি, যা ব্যক্তিকে অপূর্ণাঙ্গ বানায়। অলসরা অপূর্ণাঙ্গই থেকে যায়। তারা কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে না। তাই, প্রকৃত মানুষ হতে পরিশ্রমেরও প্রয়োজন আছে।

অন্যের প্রতি সহানুভূতি : মানুষ সে, যে অবয়বের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের দিক থেকেও মানুষ। মানুষের অন্তরে অন্যের প্রতি সাহায্য, সহানুভূতি ভরপুর থাকবে। অবয়বে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও নামের অমানুষ। আলি (রা.) স্বীয় ছেলে হোসাইন (রা.) কে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, তোমার বন্ধুদের পূর্ণাঙ্গ নম্রতা দেখাও। তবে তার প্রতি পূর্ণ ভরসা করিও না এবং তার প্রতি পূর্ণাঙ্গ সহনশীল হও (আল-মাহাসিন : ৭৩)। অন্যের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন আনসার সাহাবিরা। তারা মুহাজিরদের প্রতি এতটা সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন যে, মুহাজিররা নবীজিকে বলেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা আমাদের জীবনে এমন সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ কখনো দেখিনি। (মুসনাদে আহমাদ : ১৩০৭৫)।

কপটতা পরিহার করা : অন্তরের বিশ্বাসের সঙ্গে কথার অমিলই কপটতা। পরিপূর্ণ মানুষ হতে কপটতা পরিহার করা আবশ্যক। মনে যা লালন করে মুখে তার প্রকাশ করাই শ্রেয়। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য কপটতা পরিহার করা জরুরি। ইসলাম কপট ব্যক্তিদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে। কপট ব্যক্তিরা নিজের অজান্তেই নিজের ক্ষতি করে থাকে। যা সে অনুধাবন করতে পারে না। আল্লাহ বলেন, তারা (কপট ব্যক্তিরা) আল্লাহ এবং ঈমানদারদের ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। আর তারা এটা অনুভব করতে পারে না (সুরা বাকারা : ৯)। আর যে মানুষ নিজের ভালোমন্দ বুঝতে পারে না, সে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে না।

পাপাচার পরিহার করা : কোনো সভ্যসমাজ পাপাচারকে অনুমোদন করে না। যে সমাজ পাপাচারকে অনুমোদন করে সে সমাজ সভ্য নয়। অপরাধ ইহকালীন ও পরকালীন উভয় জগতেই খারাপ বলে বিবেচিত। সব শ্রেণির লোকের কাছে ঘৃণিত। পাপাচার ব্যক্তির বড় ত্রুটি। যা পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে বড় অন্তরায়। তাই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পাপাচার পরিত্যাগ করা উচিত। পাপাচার ব্যক্তিকে দুনিয়ায় ঘৃণিত করার পাশাপাশি আখেরাতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং পাপাচারীরা থাকবে জাহান্নামে। তারা বিচার দিবসে তথায় প্রবেশ করবে (সুরা ইনফিতার : ১৪-১৫)।

নিজের ভুল স্বীকার করা : একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ নিজের ভুলের ব্যাপারে স্পষ্টভাষী হবেন। নিজের ভুল ও কমতি স্বীকারে চাতুরতার আশ্রয় গ্রহণ করবেন না। নিজের ভুল স্বীকার করার মধ্যেই পূর্ণাঙ্গতা নিহিত। ব্যক্তির কমতি স্বীকার করা তার মধ্যে কমতি আনে না বরং কমতি অস্বীকারের মধ্যেই ব্যক্তির কমতি লুকায়িত থাকে। তাই, নিজের ভুল স্বীকার করাই প্রকৃত মানুষের পরিচয়। নিজের ভুল স্বীকার না করে, নিজে পরিশুদ্ধ না হয়ে নিজের কোনো ভুল বা ত্রুটি অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া অমানবিকতা ও পশুত্বসুলভ আচরণ। যা অবশ্য বর্জনীয়।

লেখক : শিক্ষা পরিচালক-ভরসা মাদ্রাসা রংপুর।