মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩২)
তিন শাহজাদার আধ্যাত্মিক সফর
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক বাদশাহর ছিল তিনজন অসাধারণ প্রতিভাধর পুত্র। দানশীলতা, যুদ্ধবিদ্যা, বীরত্ব, বিচক্ষণতা এবং আরও আরও গুণের সমাহার ছিল তাদের চরিত্রে। কোরআন মাজিদে বর্ণিত ‘চক্ষুশীতলকারী’ গুণের ছবি ভাসত তিন সন্তানের অবয়বে। বাদশাহর জীবন আলোকিত করার জন্য তারা ছিল তিনটি উজ্জ্বল প্রদীপ তুল্য। ছেলেদের জীবনে ও মননে বাদশাহর আধ্যাত্মিকতার যে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত ছিল তার প্রতিচ্ছবি ভাসত তাদের চেহারায়। বাগানে নিচ দিয়ে পানির নহর প্রবাহিত হয়, যা সাধারণত দেখা যায় না। সেই নহরের পরিচয় পাওয়া যায় গাছেগাছে ফলে ফুলে সবুজের সমারোহে। বসন্তের নীরব আগমনও চোখে দেখা যায় না। প্রকৃতির নবরূপ সৌন্দর্যের জলসায় আমরা উপভোগ করি বসন্তের আগমনি ঝংকার। মানুষের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়।
আই বসা কারিজে পিনহান হামচুনিন
মুত্তাসিল বা জানেতান ইয়া গাফেলিন
বহু ঝর্ণা আছে প্রবাহিত গোপনে অনুরূপভাবে
ওহে উদাসীন! তোমাদের প্রাণের সাথে যুক্তরূপে।
তোমার যে অস্তিত্ব, তার সঙ্গে উর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের অনেক ঝর্ণারা সংযুক্ত আছে। তুমি গাফেল উদাসীন তাই বুঝতে পার না সেই হাকিকত। আসমান ও জমিন তোমাকে তাপ দেয়, পানি সরবরাহ করে, খাবার জোগায়, তুমি মোটাসোটা হও। এগুলো দৃশ্যমান। চিন্তা করে দেখ, এসব কিছুই ধারকর্জকৃত, তোমার নিজস্ব নয়। আসমান জমিন বিশ্বপ্রকৃতি থেকে ধার পাওয়া। এ কারণে এই জগত থেকে যা কিছু গ্রহণ করেছে, তোমাকে ফেরত দিতে হবে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে। এগুলো ছাড়া আরও কতক উপাদান আছে, যা অদৃশ্যপথে তোমার রুহের খোরাক জোগায়। তার মধ্যে সবচে বড় উপাদান তোমার রুহ। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি তার মধ্যে আমার রুহ ফুঁকে দিয়েছি।’ এটিই তোমার জীবনের আসল সম্পদ। বাকীগুলো ধারকৃত। তবে প্রাকৃতিক উপাদানকে যে ধারকৃত বলে তুচ্ছজ্ঞান করছি তা রুহের তুলনায় বলছি। নচেত রুহকে বহনের জন্য প্রাকৃতিক উপদানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
যে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তা হলো, তোমার দেহের বাড়িতে যে ঝর্ণাধারা বাইরে থেকে প্রবাহিত, তা নিরাপদ নয় এবং তোমার আসল সমস্যার জট খুলতে পারবে না। এর পরিবর্তে যদি অন্তর থেকে ঝর্ণা উৎস জারি করতে পার সেটিই তোমার স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার মহৌষধ হবে। কারণ, যেদিন মৃত্যুর সৈন্যরা তোমার প্রাণের ওপর হামলা করবে, সেদিন শত বসন্ত তোমার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে না। এ অবস্থায় যার রুহ প্রাণবন্ত সেই চিরন্তন জীবন নিয়ে আখেরাতের সাগর পাড়ি দিতে পারবে।
এনে রেখো, এই জগত আর যারা জাগতিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত তারা নানা মুখরোচক কথা বলে তোমার দিলখোশ করে; অথচ যখন তোমার জীবনে দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে, এরা এমনভাবে এড়িয়ে চলে যেন তোমার সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল না কোনোকালে। আল্লাহতায়ালা এই উপমাটি পেশ করেছেন শয়তান সম্পর্কে কোরআন মাজিদে। কাফেরদেরকে শয়তান আশ্বাস দিয়েছিল তোমাদের জন্য আমি যা যা দরকার সবই করব; কিন্তু কাফেররা যখন কুফরির গর্তে পতিত হলো শয়তান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সটকে পড়লো। আল্লাহ বলেন, ‘এরা শয়তানের মতো, যে মানুষকে বলে, কুফরি কর; অতপর যখন সে কুফরি করে তখন সে বলে, তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, আমি তো জগতগুলোর প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সুরা হাশর : ১৬)।
এ অবস্থায় একমাত্র তারাই মুক্তি পাবে যারা শয়তানের পথ পরিহার করবে, নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর পথে চলবে, হেমন্তের মতো গাছের মরাজরা পাতাগুলো ঝেড়ে ফেলবে, বসন্তকে বরণ করার প্রস্তুতি নেবে। তারাই মুক্তির পথ খুঁজে পাবে, তাদের জীবনেই বসন্তের সমারোহ জাগবে।
তওবা আরন্দ ও খোদা তওবা পজির
আম্রে উ গিরন্দ ও উ নেমাল আমির
তওবা করে, তিনিই তো কবুল করেন তওবা
তার আদেশ মানো তিনি উত্তম আদেশদাতা।
চোন বর আরন্দ আজ পমিমানি হানিন
আরশ লরজদ আজ আনিনুল মুজনেনিন
যদি পাপী ক্রন্দন করে অনুতাপ লজ্জায়
আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে পাপীর কান্নায়।
পাপী গোনাহগারের ক্রন্দনস্বরে আল্লাহর আরশ এমনভাবে কাঁপে যেভাবে শিশুর কান্নায় মায়ের বুক ধরফড় করে। তখন মা যেমন শিশুকে কোলে তুলে নেয়, আরশ মাকামও কান্নারত বান্দাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে কাছে টেনে নেয়। তাদের তখন বলা হয়, আল্লাহ আপন দয়ায় তোমাদেরকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এখন ক্ষমাশীল আল্লাহর মুক্ত বাগানে বিচরণ কর মনের আনন্দে। আধ্যাত্মিক জগতের কতক রহস্য ব্যক্ত করার পর মওলানা কাহিনির ধারাভাষ্যে ফিরে এসে বলেন, বাদশাহর কাছে এসে তিন ছেলে অনুমতি চাইল, সফরে যাবে। অভিজ্ঞতা অর্জন ও জীবনকে শক্ত মজবুত করার জন্য তারা বাদশাহর রাজত্ব্রে আনাচে কানাচে ঘুরবে। মওলানা রুমি ছেলেদের নাম বলেননি; তবে মসনবি গবেষকরা বলেছেন তিন ছেলের একজন নফস, যার অর্থ প্রবৃত্তি, যে মানুষের অন্তরকে বিপথে চালায়। আরেক জনের নাম আকল, যার অর্থ জ্ঞানবুদ্ধি ও বিবেক। অপরজন রুহ বা আত্মা। তিন ছেলে বাদশাহর হাতে চুমো খেয়ে দোয়া চায় তাদের সফর যেন নির্বিঘ্ন হয়।
বাদশাহ ছেলেদের বিদায় দিয়ে বলেন, দেশের সর্বত্র তোমরা ঘুরতে পার। তবে একটি কিল্লার ব্যাপারে আমি তোমাদের সাবধান করছি। কখনো প্রবেশ করবে না এই দুর্গে। কারণ তা মানুষের হুঁশজ্ঞান হরণ করে, একেবারে নির্বোধ বোকা বানায়। এ কারণে এর নাম দেজে হুশরুবা। হুঁশজ্ঞান হরণকারী দুর্গ।
গাইরে অন য়্যক কিল্লা নামশ হুশরুবা
তঙ্গ আরদ বর কুলাহদারান কোবা
তবে একটি দুর্গ ছাড়া যার নাম হুশরুবা
মুকুটধারীদের জ্ঞানবুদ্ধিও হরণ করে তা।
তোমরা শাহজাদাদের কথা তো বাদ। যারা মুকুটধারী রাজাবাদশাহ তাদেরও বোকা বানায় এই দুর্গ। আল্লাহর দোহাই বিচিত্র বর্ণের এই দুর্গে প্রবেশ করবে না। বহু দূরে থাকবে বিপদাশঙ্কার ভয়ে। বিবিত্র বর্ণ রূপ ও চাকচিক্যে জমকালো এই দুর্গ। যুলায়খার অন্দরমহলের মতো। সৎভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার ইউসুফ (আ.)-কে মিশরের আজিজ দাস বাজার থেকে খরিদ করে বাড়িতে আনেন। তাকে ছেলের আদরে লালন করার জন্য স্ত্রী জুলায়খাকে সুপারিশ করেন। কিন্তু জুলায়খা কামাসক্ত হয়ে ইউসুফকে ফুসলাতে থাকে। কিন্তু ইউসুফ চোখ তুলে তাকায় না জুলায়খার চেহারার দিকে। তাই জুলায়খা একটি কক্ষ সাজায়, যার দেয়ালে নিজের অজস্র ছবি সাঁটানো। যাতে ইউসুফ যেদিকে তাকায় জুলায়খার ছবি নজর কাড়ে। হুশরুবা দুর্গও রংরূপের বৈচিত্রে সাজানো হয়েছে মানুষের হুঁশজ্ঞান হরণ করবার জন্যে। কাজেই সাবধান! তার ধারে কাছেও যাবে না তোমরা কোনোভাবে।
জুলায়খার হাপ্তখানার বর্ণনা দিতে গিয়ে মওলানার মনে পড়ে গেল মহান মালিকের কথা। তিনি বলেন, এই যে সৃষ্টিজগতের বৈচিত্র, রংরূপ অসংখ্য, চারিদিকে চাকচিক্য জৌলুস, যদি মানুষ আল্লাহর প্রেমে ডুবে যায় এই বৈচিত্রের মধ্যে সে আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পায়। এ জন্যেই আল্লাহ বলেছেন,
বাহরে ইন ফরমুদ বা আন ইসপাহ উ
হায়সু ওয়াল্লাইতুম ফাসাম্মা ওয়াজহুহু
এ কারণে বলেছেন তিনি মুমিনদের উদ্দেশ্যে
যেদিকে তাকাবে তার চেহারাই দেখতে পাবে।
বাদশাহ ছেলেদের সতর্ক করে বললেন, সাবধান! মনের কামনা বাসনা যেন তোমাদেরকে বিপথে চালিত না করে। হুশরুবা দুর্গের মধ্যে ঢোকাতে পারলে শয়তান তোমাদেরকে চিরন্তন দুর্ভাগ্যের কারাগারে বন্দি করবে। কিন্তু বাবার এই নিষেধের ফল হল উল্টা। নিষেধ না করলে হয়তো হুশরুবা দুর্গের প্রতি তাদের মন এত লালায়িত হত না। ‘কোনো ব্যাপারে নিষেধ করা হলে তার প্রতি মানুষের লোভ বেশি হয়’- এটিই জাগতিক নিয়ম। তবে যাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় বিরাজিত আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা পালনের বেলায় তাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। যাইহোক ছেলেরা বাবার কাছে কথা দিল, আপনার উপদেশ আমরা মেনে চলব। কিন্তু তারা ইনশাআল্লাহ মেনে চলব- এ কথা বলল না। তারা অতি আত্মবিশ্বাসী ছিল। বুঝতে পারল না যে, মনের গতিপ্রকৃতি ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। মসনবির শুরুতে বাদশাহ বাদীর প্রেমের গল্পে আমরা দেখেছি, দাসীর চিকিৎসায় হেকিমরা ইনশাআল্লাহ বলেনি। তার ফল হয়েছিল উল্টা। যারা ভবিষতের কোনো সিদ্ধান্তের বেলায় ইনশাআল্লাহ বা ‘আল্লাহ যদি চান’ বলে না তারা প্রকারান্তরে একটি সত্য অস্বীকার করে। আর তা হলো, এই জগতের সব ব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছেন এক মহাশক্তিমান সত্তা। জগতের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ যার মুঠোয়। মওলানা বলেন, জগতের যত ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ আছে সবার একটি অভিন্ন আলোচ্য বিষয় হলো, এই নিত্য বিবর্তনশীল সৃষ্টিলোকের পশ্চাতে এমন এক হাকিকত বিরাজমান, যিনি অব্যয় অক্ষয় অবিনশ্বর। সব কিছুর চূড়ান্ত ক্ষমতা তারই হাতে। মোটকথা বাদীর চিকিৎসক হেকিমরা ইনশাআল্লাহ না বলাতে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল এখানেও একই পরিস্থিতি দেখা দিল।
ছেলেরা সফরে যতই এগিয়ে যায় হুশরুবা দুর্গের প্রতি কৌতুহল আরও বৃদ্ধি পায়। শেষপর্যন্ত হুশরুবা আকর্ষণে তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারায়। তাতে একদিন রাতের বেলা ঢুকে পড়ে বিচিত্র অপরূপ সাজে সজ্জিত বাবার নিষিদ্ধ হুশরুবায়। এই দুর্গের পাঁচটি দরজা খোলা আছে সাগরের পানে আর পাঁচটি দরজা উন্মুক্ত মাঠের দিকে। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩৫৮০-৩৭০৪)
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়াপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্প ভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন CHAYAPATH PROKASHONI)
