কৃত্রিম সংকট তৈরি অপরাধ
হাসিব রহমান
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমানে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লোভে পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। যখন পণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকে, তখন তারা সবাই একজোট হয়ে সেগুলো বাজার থেকে সরিয়ে ফেলে এবং সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম কাজ।
ইসলামি শরিয়তের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- স্বাভাবিক অবস্থায় সরকারিভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণের প্রয়োজন পড়ে না; বরং পণ্যকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.)-এর আমলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে সাহাবিরা বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাদের জন্য দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিন।’ তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা হলেন মূল্য নির্ধারক। তিনিই সংকীর্ণতা ও প্রশস্ততা আনয়নকারী এবং তিনিই রিজিক দানকারী। আমি আশা করি যে, আমি আমার রবের সঙ্গে এমতাবস্থায় মিলিত হব যে, তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যেন জীবন বা সম্পদের ব্যাপারে আমার ওপর জুলুমের দাবি করতে না পারে।’ (তিরমিজি)।
এসব হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া সমীচীন নয়। তবে এর অন্য একটি দিক হলো, অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে রাষ্ট্রকে কড়া নজর রাখতে হবে। এ ধরনের মজুদদারের জন্য পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত, আর মজুদদার বা গুদামজাতকারী অভিশপ্ত’ (ইবনে মাজাহ)। অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি পণ্য গুদামজাত করবে, সে বড় অপরাধী ও গুনাহগার।’ (মুসলিম)।
একইভাবে বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে গ্যাসের তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে দিশাহারা করে তুলেছে। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিম অভাব দেখিয়ে সিলিন্ডার গ্যাস বা কলকারখানার গ্যাসের দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা জনগণের জীবনযাত্রা ও শিল্প উৎপাদনে নাভিশ্বাস তুলছে। প্রয়োজনীয় সেবাকে পণ্য বানিয়ে এমন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করবে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ বা দারিদ্র্যে আক্রান্ত করবেন’ (ইবনে মাজাহ)। এমনকি মজুদদারি করা মাল যদি পরে সদকা বা দান করে দেওয়া হয়, তবু সেই গুনাহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। হজরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি চল্লিশ দিন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখার পর তা সদকা করে দেয়, তবে এই সদকা তার গুনাহের কাফফারা হবে না।’ (মেশকাত)।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হযরত ইউসুফ (আ.) কেন খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করেছিলেন? এর উত্তর হলো- হজরত ইউসুফ (আ.) আল্লাহর নির্দেশেই তা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রথম সাত বছরের উদ্বৃত্ত শস্য জমা রাখা, যাতে পরের সাত বছরের চরম দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ না খেয়ে মারা না যায়। অর্থাৎ সেটি ছিল জনকল্যাণে ‘সঞ্চয়’, অধিক লাভের জন্য ‘মজুদদারি’ নয়। হজরত আবু লাইস (রহ.) তার ‘আল জামিউস সগীর’ গ্রন্থে গুদামজাতকরণের তিনটি অবস্থা উল্লেখ করেছেন- ১. মাকরূহ, ২. জায়েজ বা বৈধ এবং ৩. নিষিদ্ধ। ইমাম নববি (রহ.)-সহ অন্যান্য আলেমদের মতে এসব কারণে গুদামজাত করা নিষিদ্ধ- ১. বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করা। ২. পণ্যের দাম বাড়লে আনন্দিত হওয়া এবং কমলে চিন্তিত হওয়া। ৩. জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা লাভের আশা করা। বিশেষ করে কোনো অঞ্চলের প্রধান খাদ্যশস্য গুদামজাত করা মারাত্মক গুনাহের কাজ। মেয়াদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মূল্যবৃদ্ধির আশায় কোনো খাদ্যদ্রব্য চল্লিশ দিন মজুদ করে রাখবে, সে আল্লাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহও তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবেন।’ (মেশকাত)। তবে এর অর্থ এই নয় যে, চল্লিশ দিনের কম মজুদ করা যাবে। বরং যে উদ্দেশ্যে মজুদ করা হারাম, তা এক দিনের জন্য করলেও তা গুনাহের কাজ। ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, আসুন আমরা হালাল উপায়ে ব্যবসা করি। দুনিয়ার সামান্য লাভের মোহে পড়ে যেন আমাদের পরকাল বরবাদ না করি।
