মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩৫)
ভাগ্যান্বেষণে কপর্দকহীনের মিশর সফর
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একলোক প্রচুর সম্পদ পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। কিন্তু বসে বসে সব খেয়ে এখন কপর্দকহীন ঘুরে। এমনিতে উত্তরাধিকারী সম্পত্তি বেশি দিন টিকে না। কারণ, মৃত ব্যক্তি খুশিমনে রেখে যায় না তার ধন। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সম্পদের লোভ ছাড়তে পারে না। যদিও আল্লাহওয়ালারা এর ব্যতিক্রম। মৃত ব্যক্তির অমত অসন্তুষ্টিতেই তার সম্পদ স্থানান্তরিত হয় ওয়ারিশদের কাছে। তাই বেশিদিন টিকে না এমন সম্পদ ওয়ারিশের কাছে। তা ছাড়া-
উ নদানদ কদর হাম কাআসান বেয়াফত
কূ বে কদ্দো রঞ্জো কসবশ কম শেতাফত
সে জানে না সম্পদের মূল্য, কারণ পেয়েছে সহজে
চেষ্টা, শ্রম, উপার্জনের পূজি তাতে দেয়নি নিজে।
মিরাছি সম্পত্তি ভোগকারীরা সম্পদের মূল্য বুঝে না। কারণ, সেই সম্পদ সে পেয়েছে বিনা পরিশ্রমে। বিনা শ্রমে সম্পদের প্রতি তার দরদ থাকে না।
কদরে জান যান মি নদানি আই ফোলান
কে বেদাদত হক বে বখশিশ রয়েগান
তুমিও জান না প্রাণের মূল্য ওহে অমুক!
কেননা, আল্লাহ দিয়েছেন তোমায় মোফত।
তোমার যে প্রাণ, যার ওপর তোমার জীবন নির্ভরশীল, তার জন্য তোমাকে কষ্ট করতে হয়নি। বিনাপরিশ্রমে পেয়েছ। এ কারণেই প্রাণের মতো এত মূল্যবান রত্নকে তুমি বাজে কাজে নিয়োজিত রেখেছ। তোমার প্রাণ ও জীবনকে সত্যিকার উন্নতির পথে পরিচালিত করছ না।
সে যা হোক, মিরাছি সম্পত্তিভোগী লোকটি বাপ-দাদার উত্তরাধিকার সূত্রে স্থাবর অস্থাবর যত সম্পত্তি পেয়েছিল সব উজাড় করে এখন বিরান ভূমির প্যাঁচা সেজেছে। ঘরবাড়ি হারা ভবঘুরে জীবনে তার দিনকাল কাটে। হাহুতাশ করে আল্লাহর কাছে বলে, প্রভু হে! আমাকে ধনদৌলত দিয়েছিলে রাখতে পারিনি। কপাল মন্দ। চলে গেছে। এখন হয় তুমি আমাকে ধন দাও, নতুবা মরণ দাও। সবকিছু হারিয়ে এখন আল্লাহর জিকিরে দিন কাটে। তাঁর কাছে আশ্রয় মাগে।
চোন পয়াম্বর গোফত মুমেন মিজমার আস্ত
দর জমানে খালিয়ি নালেগার আস্ত
নবীজি বলেছেন, মোমিন ঢোলবাদ্যের মত
ভেতরটা ফাঁকা হলেই সুর তোলে কান্নারত।
হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মওলানা বলেন, মোমিনের ভেতরটা যদি রংবেরঙের খাদ্য, পানীয় ও ভোগের সামগ্রী হতে ফাঁকা না হয় তাহলে তার রুহের পাখি সেখানে সুর তুলে গান ধরে না। এমতাবস্থায় তুমি,
তাই শো ও খোশ বাশ বাইনা আসবাআইন
কায মায়ে লা আইনা সরমস্ত আস্ত আইন
শূন্য হও তার দুই আঙুলের মাঝখানে থাক প্রফুল্লচিত্ত
লা-মকান এর শরাব হতেই মাকানের মত্ততা উৎসারিত।
তোমার ভেতরটাকে আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে খালি করে নাও। তারপরে আল্লাহর কুদরতি দুই আঙ্গুল অর্থাৎ তার জামালি সৌন্দর্যমণ্ডিত ও জালালী প্রতাপান্বিত গুণের মাঝেখানে প্রফুল্লচিত্তে অবস্থান কর। আর এ কথায় বিশ্বাস রাখ যে, এই মাকান, স্থান কাল পাত্রের জগত লা-মাকান অর্থাৎ জগতের স্থান-কাল-পাত্র পরিচয় নেই, সেখানকার শরাব হতে উন্মত্ত হয়েছে। বাদ্যযন্ত্র যেমন বাদকের হাতের ক্রীড়নক, নিজস্ব কোনো এখতেয়ার নাই, তুমিও আল্লাহর ইচ্ছার কাছে ক্রীড়নক হয়ে যাও। তার কাছে নিজেকে সঁপে দাও।
সে এতদিন পয়সার দেমাগে বেসামাল ছিল। টাকা-পয়সা হারানোর পর তার মত্ততা এখন নেই। ফলে বিনয় কাতরতায় তার দু’নয়নে অশ্রু ঝরে।
আই বসা মুখলেস কে নালদ দর দোয়া
তা রওয়াদ দুদে খুলুসাশ কর সমা
বহু মুখলেস বান্দা দোয়ায় কাঁদে অঝোরে
তার এখলাসের ধোঁয়া যেন উত্থিত হয় আকাশে।
বহু পবিত্র অন্তরের মুখলেস বান্দা আছে, দোয়ার সময় কেঁদে সারা হয়। সেই কান্নায় আগুনের ধোঁয়া উত্থিত হয় আল্লাহর আরশে।
তা রওয়াদ বালায়ে ইন সকফে বরিন
বুয়ে মেজমার আজ আনিনুল মুজনেবিন
ঊর্ধ্বলোকে যেন যায় ওপরের আকাশ ফাঁড়ি
পাপীর কান্নার আগুনের গন্ধ যায় আসমান ছাড়ি।
পস মালায়েক বা খোদা নালন্দ যার
কায় মুজিবে হার দোয়া ওয়েই মুস্তাজার
ফেরেশতারা তখন কাঁদে আল্লাহর সনে কাতর হয়ে
ওহে যে কোনো দোয়া কবুলকারী, আশ্রয়দাতা ওহে।
কাতর ক্রন্দনে বান্দার কলিজার উত্তাপ যখন ধোঁয়া হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উত্থিত হয়, ফেরেশতারাও তখন কাতর ক্রন্দনে একাকার হয়। তারা বলে, হে আল্লাহ, হে পাপী বান্দার ফরিয়াদ কবুলকারী! একমাত্র তুমিই তো সবার আশ্রয়দানকারী।
বান্দায়ে মুমেন তাজররু মি কুনাদ
উ নমি দানদ বজুয তো মুস্তানাদ
মোমিন বান্দা তোমার কাছে দেখ যারযার কাঁদছে
জানে না সে তুমি ছাড়া নির্ভরতার আর কেউ আছে।
তো আতা বীগানগান রা মী দহী
আজ তো দারদ আরেজু হার মুশতাহি
প্রভু হে তুমি বেগানাদেরও দাও অনেক দান
তোমার কাছেই সবার আশা, পাবে অনুদান।
প্রয়োজনই তাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে। ঠেকায় পড়েই সে আমার গলিতে আশ্রয় নিয়েছে। আমি যদি তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেই, সে প্রাণের উচ্ছ্বলতা হারিয়ে ফেলবে, দ্বিতীয়বার অবহেলা উদাসীনতায় পতিত হবে। সে যদিও ভগ্ন হৃদয়ে একান্ত নিষ্ঠা নিয়ে আমাকে ডাকে, কাঁদে আমাকেই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল বলে ফরিয়াদ জানায়; তবুও তাকে সে অবস্থার উপর ছেড়ে দাও কাঁদতে থাকুক। কেননা, এমন অবস্থা বিরল। হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) বলেন, ‘বান্দা আল্লাহর কাছে দোয়া করে। তখন আল্লাহ দুজন ফেরেশতাকে বলেন, আমি তার দোয়া কবুল করেছি। তবে এখনই তার প্রয়োজন পুরণ করে দিও না তোমরা। কেননা, আমি তার আওয়াজ শুনতে ভালোবাসি। আরেক বান্দা দোয়া করে। তখন আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেন, তোমরা তার প্রয়োজনটি তাড়াতাড়ি পূরণ করে দাও। কারণ, তার আওয়াজ শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।’
খোশ হামি আয়দ মোরা আওয়াজে উ
ওয়ান খোদায় গোফতন ও অন রাজে উ
তার আওয়াজ শুনতে আমার মধুর লাগে
হে খোদা বলায় তার মনের ভেদ জানতে।
মোনাজাতের সময় নানা কথায় সে আমার মন ভুলায়, আমার দয়াদান পাওয়ার আশায় কথার মালা রচনা করে, তা বড় পছন্দ আমার। পোষা পাখিদের খাঁচায় কেন বন্দি করা হয়, জানো? তাদের কান্নার আওয়াজ গৃহস্থের ভালো লাগে, তাই। কাক পেঁচা কি কেউ বাসায় খাঁচায় পালে। কারণ, ওদের কর্কশ আওয়াজ কান ঝাঝরা করে। মওলানা রুমি বলেন, মোমিনদের দোয়া কবুল করতে, তাদের ক্ষতি দূর করতে ও মুনাফা এনে দিতে যদি আল্লাহ বিলম্ব করেন তবে তোমরা নিশ্চিত জানবে যে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।
মোটকথা, পূর্বপুরুষের মিরাছি সম্পত্তি উজাড় করা লোকটি যখন আল্লাহর কাছে কেঁদেকেটে দোয়া করল, তার জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে গেল।
খোদ কে গুয়াদ ইন দরে রহমত নেসার
কে নয়াবদ দর এজাবত সদ বাহার
কে বলে তার রহমতের দরজা হবে না উন্মুক্ত
দোয়া করে পায় নাকো কবুলিয়তের শত বসন্ত।
তোমাকে কে বলেছে যে, আল্লাহর রহমতের দুয়ার খোলা থাকে না দোয়াকারীর জন্য। দোয়ার সাথে সাথে শুরু হয় কবুলিয়তের শত বসন্ত।
নিঃস্ব লোকটি একদিন স্পপ্ন দেখে, অদৃশ্য থেকে কেউ বলছে। তোমার সম্পদভাণ্ডার গচ্ছিত মিশরে। মিশরেই যেতে হবে, সেখানেই তোমার কপাল খুলবে। মিশরের অমুক মহল্লায় গুপ্তধন লুকানো আছে। সেখানে গিয়েই তোমাকে সেই রত্ন উদ্ধার করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সোনার হরিণ লাভের জন্য যেভাবে বর্তমানে ভাগ্যান্বেষী মানুষ সহায়-সম্পদ বিক্র করে পাড়ি জমায়, স্বপ্নদেখা লোকটিও দ্রুত বাগদাদ ছেড়ে মিশর চলে যায়। কিন্তু মিশরে পৌঁছার পর দেখে, তার কাছে যে পথখরচ ছিল পথে শেষ হয়ে গেছে। এখন একেবারে শূন্যহাত। ধৈর্যের পাথর চেপে কয়টা দিন কাটিয়ে দিল অনাহারে-অর্ধাহারে। এখন দেখে মানুষের কাছে হাত পাতা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু দিনের বেলা মানুষের কাছে কীভাবে মুখ দেখাই। সাতপাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিল রাতের বেলা ভিক্ষার জন্য দাঁড়াবে কোনো গলির মুখে। রাতের ভিখারিদের মতো করুণ স্বরে ভিখ মাগব, চেহারা ঢাকা থাকবে রাতের আঁধারে। নানা চিন্তার দোলাচালে রাতে বের হলো ভিক্ষার উদ্দেশ্যে।
ঘটনাক্রমে সেই মহল্লায় চোর ডাকাতের উপদ্রব ছিল কয়দিন হতে। মানুষ ভয়াবহ আতঙ্কে, চারদিকে উৎপাত উপদ্রব। চোর ডাকাত ধরতে পুলিশ নেমেছে সাঁড়াষি অভিযানে। খলিফার কড়া নির্দেশ, যারা মানুষের সুখশান্তি হারাম করে, আমার আপনজন হলেও তাদের শাস্তি দাও হাত কেটে। খলিফা পুলিশ অফিসারের উদ্দেশ্যে ধমকের সুরে বলেন-
রহম বর দোজদান ও হার মনহুস দাস্ত
বর জয়িফান জরবত ও বি রাহমি আস্ত
দয়া দেখানো চোরচাট্টা, দুর্নীতিবাজের প্রতি
তা তো আঘাত করা নিষ্ঠুরতা দুর্বলদের প্রতি।
তুমি কোনো ব্যবস্থা নিলে হয়ত এক বা একাধিক লোক কষ্ট পাবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কিন্তু তাদের প্রতি দয়া দেখালে সাধারণ মানুষ কষ্ট পাবে। আঙুলে পচন ধরলে কেটে ফেলতে হবে; নচেত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে ক্যান্সার হয়ে।
সময়টি ছিল চারদিকে চোর-ডাকাতের উপদ্রব, উৎপাতের। দারোগা রাতে টহলে নেমে দেখে একটি গলির ঘুপটিতে একটি লোক দাঁড়িয়ে। ঝাপটে ধরে সঙ্গে সঙ্গে শুরু করল চড়-তাপ্পড়, কোথায় লুকাও চিৎকার দিয়ে। নিঃস্ব লোকটি তখন হাউমাউ করে কাঁদে আর বলে, আমায় মারবেন না দয়া করে। সত্য কথাটি আমি বলছি আপনাকে। মারপিট থামিয়ে দারোগা বলল, তোমার বাড়ি কই, বল সত্য কথা, কী ফন্দি এঁটেছ মাথায়। তুমি এ মহল্লার নয়- এ কথা বুঝা যায় তোমার চেহারায়। সরকারি লোকেরা দারোগার দোষ দেয়, চোরচাট্টার এত উপদ্রব কেন? তোমার মতো লোকেরাই তো আমার বদনাম রটায়। তোমার দলের আর কে কোথায় আছে, জলদি বল। এ কথা বলেই পুনরায় শুরু করল বেদম প্রহার। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৪২৬০-৪২৭০)
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবীর গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)
