মওলানা রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ৬/৩৬)
গুপ্তধন ঘরে অথচ ফকির বেশে ঘোরে
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিরাসি সম্পত্তি উজাড় করে কপর্দকহীন এক ব্যক্তির দুর্দশার কথা। ছন্নছাড়া লোকটির কাতর ক্রন্দন আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। স্বপ্ন দেখে, মিশরে অমুক স্থানে গুপ্তধন আছে, তুমি গেলে পেয়ে যাবে, তোমার কপাল খুলবে, বর্তমান দুর্দশার অবসান হবে। স্বপ্ন দেখার পর লোকটি মিশরে যায়। দূরের সফরে খরচাপাতির টাকাকড়ি ফুরিয়ে সেখানে কপর্দকহীন। ক’দিন ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, জীবন তরাতে মানুষের কাছে হাত পাতবে। কিন্তু দিনের বেলা কীভাবে মানুষকে মুখ দেখাব। একদিন রাতে এক গলির মুখে দাঁড়ায় কিছু ভিক্ষার আশায়। সময়টি ছিল খারাপ, চোরের উপদ্রবে মহল্লার মানুষ উৎকণ্ঠায়। রাতে মহল্লায় টহল দিচ্ছিল পুলিশ। দারোগা দেখলেন, এক লোক দাঁড়িয়ে আছে গলির কোণায় অন্ধকারে। এক ঝাঁপটায় তাকে ধরে এলোপাতাড়ি চড়-তাপ্পড় শুরু করে চোর সন্দেহে।
গলির ঘুপটিতে দাঁড়িয়ে আছ, কী মতলবে। তোমার বাড়ি নিশ্চয় এ মহল্লায় নয়। ডাকাতির পরিকল্পনায় তোমার অন্য সাথীরা এখন কে কোথায়? লোকটি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমাকে আর মাইরেন না, সব খুলে বলছি আপনাকে। বেচারা খুলে বলে স্বপ্নের কথা, গুপ্তধনের আশায় বাগদাদ হতে মিশরে আসার দুঃখভরা কাহিনি। হলফ করে নানা দোহাই দিয়ে ব্যক্ত করে নিজের অসহায়ত্ব। দারোগার মনে দাগ কাটে তার করুণ উচ্চারণ। তার মুখের সততার গন্ধ দারোগার মনে প্রশান্তি এনে দেয়। যেন তৃঞ্চার্তের প্রাণে শীতল পানি শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল।
আসলে মানুষের মুখের কথা তার দিলের সাক্ষ্য। মনের সততা বা মিথ্যা কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। মানুষের অন্তর সাগরের মতো। সেই সাগরের পানি বেরোয় মুখ দিয়ে। কখনো সত্য ও সততার উচ্চারণ মিঠা পানির প্রশান্তি বিলায়। কখনো মুখের মিথ্যা শঠতা লোনা পানির ক্ষার ছড়ায়। মুখের পরিচয় হাট বাজারের সাথে তুলনা করা যায়। সব ধরনের পণ্য সাজানো থাকে দোকানে দোকানে। খাঁটি নির্ভেজাল পণ্যের পসরা যেমন থাকে, ভেজাল ধোঁকার নানা পণ্যও মনোযোগ কাড়ে। তবে অভিজ্ঞ লোকেরাই খাঁটি বা ভেজাল চিনতে পারে। মুখের কথা শুনে অভিজ্ঞ লোকেরা পরখ করতে পারে কার ভেতর কি আছে। বস্তুত ব্যথিত লোকটির মুখের উচ্চারণে তার অন্তরের সততা প্রকাশ পেল।
সে এখন ব্যথায় কাতর। দুঃখে ভরা তার জীবন। ক্ষুধার্ত লোকের কাছে দুনিয়া গদ্যময়। তবে দুঃখ, বেদনা, ক্ষুধা কী মন্দ সবসময়? চিন্তা করে দেখ, ক্ষুধা আছে বলেই খাবারের স্বাদ পাও। পেটে ক্ষুধা না থাকলে কোরমা বিরিয়ানীও বিস্বাদ মনে হবে তোমার কাছে। কাজেই ক্ষুধা, বেদনা ও দুঃখ কষ্ট তোমার শত্রু নয়। তোমার চিন্তাধারা, চেতনা যদি উন্নত হয় এসব অভাবই তোমার প্রাণে সতেজতা আনবে। জীবনকে এগিয়ে নেয়ার শক্তি জোগাবে। শর্ত হলো, তোমাকে সতর্ক হয়ে পথ চলতে হবে। ভেজাল খাঁটি চিনতে হবে। ভেজাল অসুধ তোমার অসুখ ভালো করার চেয়ে মরণ ডেকে আনবে। রলানা পানি যদি পান করার সময় ঠান্ডাও মনে হয়, তোমার পিপাসা আরও বাড়বে তাতে। অনুরূপ বাজারে ভেজাল স্বর্ণ প্রতারক হয়ে খাঁটি স্বর্ণ চিনতে বাধ সাধে। ভণ্ড পীরদের দেখ কীভাবে খাঁটি পীরদের জন্য বাধার প্রাচীর তৈরি করে রেখেছে।
পা ও পারাত রা বে তাজবিরি বুরিদ
কে মুরাদে তো মানাম গির আই মুরিদ
তোমার মনোবল কেড়ে নেয় ভণ্ডপীর নানা কৌশলে
হে মুরিদ, সত্যকে খুঁজছ, আমাকে ধর, পথ পয়ে যাবে।
গোফত দরদত চিনম উ খোদ দর্দ বুদ
মাত বুদ আর চে বে জাহের বুর্দ বুদ
বলে, ব্যথার ওষুধ আমি, অথচ ভেতরে রুগ্ন কলুষিত
বিজয়ীর হাসি হাসে মিথ্যুক সে নিজেই পরাজিত।
কাজেই মিথ্যুক ভণ্ডকে পরিহার করে চল। তাহলেই তোমার দুঃখ, বেদনা, অভাব তোমাকে জীবনকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেবে। দারোগার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃস্ব লোকটির মনের আকাশে এসব চিন্তার মেঘের ভেলা ভেসে গেল। তার চেহারার দিকে বার কয়েক তাকিয়ে দারোগা দরদভরা ভাষায়,
গোফত ন দুজদি তো ও ন ফাসেকি
মর্দে নিকি লে কে গুল ও আহমকি
বলল, তুমি রচার নও, নও দুস্কৃতিকারীও
ভালো লোক তবে আহমক বোকার হদ্দ।
মনে একটা কল্পনার উদয় হলো, স্বপ্নে একটা কিছু দেখেছ, তাই বাগদাদ ছেড়ে মিশর এসেছ। রতামাকে আহমক ছাড়া আর কি বলা যায়। বিচক্ষণতা বলে তোমার কিছু থাকলে এত বড় ঝুঁকি তুমি নিতে না।
আমার কথা বলি, বহুবার আমি স্বপ্নে দেখেছি বাগদাদে এক জায়গায়, গুপ্তধন আছে লুকানো। সড়ক, গলির নামও আমাকে বলা হয়েছে স্বপ্নে। অমুক সড়কের অমুক গলিতে। অমুকের বাড়িতে। একথা বহুবার বলা হয়েছে স্বপ্ন যোগে। নিঃস্ব লোকটি চমকে উঠে দারোগার কথা শুনে। যে বাড়ির ঠিকানা বলছেন, তা রতা হুবহু তার বাড়ি। দারোগা আর বলল, এতবার স্বপ্ন দেখেছি, তবুও আমার জায়গা থেকে নড়িনি। অথচ একবার স্বপ্ন দেখেই তুমি মিশরে চলে এসেছ বাগদাদ ছাড়ি।
খাবে আহমক লায়েকে আকলে ওয়েই আস্ত
হামচো উ বি কিমত আস্ত ও লা শাই আস্ত
আহমকের স্বপ্ন হয় তার বুদ্ধির উপযোগী
তার মত মূল্যহীন আজে বাজে তুচ্ছ অতি।
আহমকের স্বপ্ন হয় আহমকের মতো আজে বাজে এলোমেলো। তা ছাড়া জ্ঞানী বুদ্ধিমান লোকেরা স্বপ্ন দেখলে যেখানে বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে তোমার মতো লোক স্বপ্ন দেখে মিশরে রত্নভাণ্ডার পেয়ে যাবে, কীভাবে ভাবতে পেরেছ? লোকটি দারোগার বয়ান শুনছিল আর মনে মনে বলছিল-
গোফত বা খোদ গঞ্জ দর খানায় মন আস্ত
পস মোরা অঞ্জা ছে ফকরো শিওন আস্ত
মনে মনে বলে, গুপ্তধন তো দেখি আমার বাড়িতে
আমি কেন ধুঁকে ধুঁকে কাঁদি দারিদ্রের কষাঘাতে।
সত্যিই আমি ধন-ভাণ্ডারের উপর বসে আছি। অথচ অভাবে দারিদ্র্যে মরে যাচ্ছি। এর কারণ, গাফলতি, উদাসীনতার পর্দায় ঢাকা আছি। দারোগার বয়ান শুনে তার সকল দুঃখ-বেদনাভারর যেন মুহূর্তে বদলে গেল আনন্দে। সে বুঝতে পারে, আমার রিজিক দারোগার লাথি-কিল-থাপ্পড় খাওয়ার উপর নির্ভরশীল ছিল। দিল অন্ধকার ছিল তাই নিজেকে মিসকিন ভেবেছি। বিশাল ধন-ভাণ্ডারের হাতছানি এখন পেয়ে গেছি। কারণ, আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। হে দারোগা! আপনি আমাকে আহমক বলেন বা বুদ্ধিমান, বাগদাদের সেই ধনরত্ন আমার, পেয়ে গেছি আমার মনষ্কাম।
এক লোক জনৈক দরবেশকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল। কী চাও এখানে, তোমাকে তো কেউ চিনে না। দরবেশ জবাব দিল, মানুষ আমাকে চেনে না তাতে ভয় নাই। আমি আমাকে চিনি, আসল কথা এটাই। যদি মানুষ আমার অবস্থা জানত আর আমি নিজেকে না চিনতাম, তা হত বিপজ্জনক, ভয়াবহ।
নিঃস্ব বাগদাদির মনে এখন আনন্দের হিল্লোল। মিশর থেকে সে ফিরে চলল বাগদাদের উদ্দেশ্যে। পথে পথে আল্লাহর শোকর করে, নামাজ পড়ে, আল্লাহকে মনের আকুতি উজাড় করে বলে, প্রভু হে! কী হেকমত নিহিত ছিল, কেন আমাকে ঘরহারা করে নিয়ে গেছ বিদেশে। কেন দারোগার পিটান খাওয়ায়ে হুঁশজ্ঞান ফিরিয়ে দিয়েছ। তাহেলে কোনো কোনো গোমরাহি কী মানুষকে হেদায়তের পথে নিয়ে আসে? কোনো কোনো গোনাহ কী সওয়াবে পরিবর্তিত হতে পারে? যাতে কেউ নিরাশ না হয় তোমার দরবার থেকে? আজ যে পাপে অন্যায়ে দুরবস্থায় আছে ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে যাতে সৎপথে আসতে পারে আর যে সৎপথে আছে অহংকার এলে তার ভাগ্য বদলে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়। বিষের মধ্যে আল্লাহ গোপন রাখেন বিষ হরণের প্রতিষেধক। একেই বলে আল্লাহর ‘গোপন দয়া’ বুঝতে হবে গভীরে গিয়ে।
নাফরমানরা নবী-রাসুলদের অপমানিত করার চেষ্টা করে; কিন্তু সেই চেষ্টার কারণে তাদের মুজেজা কারামাত প্রকাশ পায়, সম্মান বাড়ে। ফেরাউন জাদুকরদের জমায়েত করেছিল মুসা (আ.)-এর মোকাবিলা করতে। কিন্তু তার ফলে মুসা (আ.)-এর লাঠির মহিমা প্রকাশ পেয়েছে। জাদুকরদের চক্রান্ত দৃশ্যত মূসার জন্য ছিল ভয়াবহ। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে মুসার জন্য সম্মানের।
একেই বলে, আল্লাহর গোপন দয়া ‘লুতফে খফি’। কেউ যদি তাকওয়ার জীবন অবলম্বন করে আর বিনিময়ে আল্লাহর দয়াদান লাভ করে তা তো তার প্রাপ্য প্রকাশ্য। একে বলা হবে না রগাপন অপ্রকাশ্য। যদি কেউ দুঃখ-দুর্দশার আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়, কিংবা হেদায়তের পথ থেকে বিচ্যুত হয় আর নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সে জীবনের ছন্দ ফিরে পায়, হেদায়তের পথ খুঁজে পায় তাকে বলা হবে আল্লাহর গোপন অনুগ্রহ। বিপদগ্রস্ত বিপথে চালিত কোনো কোনো বান্দার বেলায় আল্লাহ তার গোপন রহমতের হাতছানি দেন।
বহু ওলি বুজুর্গ আছেন যারা অন্যায় পথে চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে হেদায়তের পথে ফিরে এসেছেন। আল্লাহর ওলিতে পরিণত হয়েছেন। এমন লোকও আছে, যারা ইবাদত বন্দেগী সুখী জীবন নিয়ে খুশিতে আছেন। কিন্তু অহংকারের পথ ধরে শয়তান তাদের উপর চড়াও। আল্লাহর গোপন ইশারায় তাদের ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হওয়া বিচিত্র নয়। কারণ, অহংকার সর্বনাশের মূল। এমন বহু মানুষ আছে, যারা জীবন যুদ্ধে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য হাতছানিতে তার ভাগ্য বদল হয়েছে। নিঃস্ব বাগদাদীর বেলায়ও তাই হলো।
খানা আমদ গঞ্জ রা উ বাজ ইয়াফত
কারাশ আজ লুতফে খোদায়ি সাজ ইয়াফত
বাড়ি এলো ফিরে ধন-ভাণ্ডার পেল সে ফিরে
আল্লাহর দয়ায় তার সবকাজ গেল ঠিক হয়ে।
দারোগার বর্ণনা মাফিক বাড়িতে এসে বাগদাদী গুপ্তধন পেয়ে গেল। মিশর সফর আর ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত হওযার আগে যদি এই ধনরত্ন তার হস্তগত হত, তাও সে উদাসীন বিলাসিতায় হারিয়ে ফেলত আগের সব সম্পদের মতো। দুঃখ-কষ্টের পর সম্পদের মর্যাদা এখন হয়ত বুঝবে। (মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৪২৭৪-৪৩৮৫)
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)
