রোজার প্রতিদান দেন আল্লাহ

রায়হান রাশেদ

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামের মৌলিক পাঁচটি বিধান আছে। এর একটি রোজা। দ্বিতীয় হিজরিতে মুসলমানদের ওপর রোজা ফরজ হয়। প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর রোজা রাখা ফরজ। রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহকারে পানাহার, দাম্পত্য মিলন ও রোজাভঙ্গকারী সব কাজ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমারদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগেরকার মানুষদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যেন তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)।

শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজন ছাড়া রোজা ভাঙা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো অজুহাত বা রোগ ছাড়া রমজান মাসের একটি রোজা ভেঙে ফেলে, সে ওই রোজার পরিবর্তে আজীবন রোজা রাখলেও ওই এক রোজার ক্ষতিপূরণ হবে না।’ (তিরমিজি : ৭২৩)।

রমজান বছরের শ্রেষ্ঠ মাস : মুমিন বান্দার জীবনে আমল-ইবাদতের বসন্ত মাস রমজান। এ মাসে তার জীবনে আমলের স্পৃহা তৈরি হয়। আমলের উজ্জীবিত পরিবেশ পায় সে। সারা বছরের ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে সে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, মুসলমানদের জন্য রমজানের চেয়ে উত্তম মাস আসেনি। মুনাফিকদের জন্য এর চেয়ে বেশি ক্ষতির মাসও আসেনি। মুমিন এ মাসে ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। মানুষের উদাসীনতা ও দোষত্রুটি খুঁজে মুনাফিকরা। মুমিনের জন্য এ মাস গণিমত। মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ।’ (মুসনাদে আহমদ : ৮৩৬৮)।

আল্লাহ দেন রোজার প্রতিদান : রোজার প্রতিদান আল্লাহতাআলা নিজে দেন। বান্দার রোজাকে আল্লাহ নিজের বলেছেন। হাদিসে কুদসিতে আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘রোজা আমারই জন্য। আমি এর প্রতিদান দেব। বান্দা আমার জন্য পানাহার ও কামনা-বাসনা ছেড়ে দেয়।’ (বোখারি : ৭৪৯২)।

রোজার প্রতিদান জান্নাত : মুমিন-মুসলমান মাত্রই জান্নাতে যেতে চান। এর চেয়ে বড় প্রত্যাশা মুমিন-মুসলমানের জীবনে আর নেই। রোজা রাখার মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়া যায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় একদিন রোজা রাখার পর ব্যক্তির মৃত্যু হলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)।

জান্নাতের বিশেষ দরজা : জান্নাতের একটি বিশেষ দরজার নাম রাইয়ান। এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদার ব্যক্তি প্রবেশ করতে পারবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতের একটি দরজার নাম রাইয়ান।

কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে শুধু রোজাদার ব্যক্তি প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ‘কোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোজাদার’ বলে ডাকা হবে। তারা উঠে দাঁড়াবে। তারা ছাড়া কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। তারা প্রবেশ করলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ১৮৯৬)।

জাহান্নাম থেকে বাঁচায় রোজা : নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ঢাল। রোজাদার রোজা দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

রোজাদারের জন্য দুটি খুশি : রোজাদারের জন্য দুটি খুশির বিষয় আছে। এগুলো তাকে আনন্দিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি খুশি আছে। যা তাকে খুশি করে। এক. যখন সে ইফতার করে। দুই. যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন রোজার বিনিময়ে আনন্দিত হবে।’ (বোখারি : ১৮৯৪)।

আমলের স্বর্ণপ্রহর পবিত্র রমজান মাস। ইবাদতের বসন্ত মৌসুম। মুসলিম মাত্রই পবিত্র এই মাসের আগমনে আমল-ইবাদতের প্রতি আগ্রহী হন এবং বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি আমল-ইবাদতে মনোযোগী থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমান সহকারে ইখলাসের সঙ্গে রমজানের রোজা রাখে এবং ইবাদত করে, তার অতীতের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ৩৮)।

হাদিসে আছে, ‘যে এ মাসে কোনো ভালো কাজ করার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য কামনা করে, সে অন্য মাসে কোনো ফরজ কাজ করার সমান সওয়াব লাভ করবে। আর এ মাসে কোনো ব্যক্তি যদি একটি ফরজ কাজ করে, সে অন্য সময়ে ৭০টি ফরজ আদায়ের নেকি লাভ করবে।’

প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের উচিত রমজান মাসে বেশি বেশি আমল-ইবাদতে মনোযোগী হওয়া। রমজান মাসে যেসব আমল বেশি করা যায়, সেগুলো হলো-

রোজা রাখা। ইসলামের পাঁচটি রুকনের অন্যতম একটি রুকন রোজা। রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ।

সময়মতো নামাজ আদায় করা। রোজা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সময়মতো নামাজ আদায় করার মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়।

বিশুদ্ধভাবে কোরআন শেখা ও তেলাওয়াত করা। রমজান মাসেই পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ মাসের অন্যতম আমল হলো বিশুদ্ধভাবে কোরআন শেখা ও তেলাওয়াত করা।

সাহরি খাওয়া। সাহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে এবং রোজা পালনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

ইফতার করা ও করানো। রমজান মাসে ইফতার করা ও করানো ফজিলতপূর্ণ আমল।

তারাবি নামাজ পড়া। তারাবি নামাজ পড়া এ মাসের অন্যতম আমল।

তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া। রমজান মাসে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার মধ্যে অনেক সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে। যেহেতু সাহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হয়, সে জন্য রমজান মাসে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে।

বেশি বেশি দান-সদকা করা। এ মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করার জন্য চেষ্টা করতে হবে।

সামর্থ থাকলে উমরা পালন করা। এ মাসে উমরা করলে একটি হজ আদায়ের সমান সওয়াব পাওয়া যায়।

তওবা ও ইসতেগফার করা। এ মাসে তওবা করার উত্তম সময়।

ইতেকাফ করা। রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

লাইলাতুল কদরকে কদর বা সম্মান করা। লাইলাতুল কদর তালাশ করা এবং এই রাতে ইবাদত করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।

সদকাতুল ফিতরা দেওয়া। রমজান মাসের রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণের জন্য ফিতরা দেওয়া আবশ্যক।

আল্লাহর জিকির করা।

কল্যাণকর কাজ করা।

মিসওয়াক করা।

মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা।

তাকওয়া অর্জন করা।

রোজাদারের সুন্নত আমল : রোজা রেখে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যার ফলে মানুষ কষ্ট পায়। রোজাদারের উচিত, সব সুন্নত আমল স্বযত্নে অনুসরণ করা। রোজাদারের সুন্নত আমলগুলো হচ্ছে-

রোজাদারকে কেউ গালি দিলে অথবা তার সঙ্গে ঝগড়া করলে এর বিনিময়ে ভালো ব্যবহার করে বলবে, ‘আমি রোজাদার’।

রোজাদারের জন্য সাহরি খাওয়া সুন্নত। সাহরির মধ্যে বরকত আছে।

তাড়াতাড়ি ইফতার করা সুন্নত; আর দেরিতে সাহরি খাওয়া সুন্নত।

কাঁচা খেজুর দিয়ে ইফতার করা; কাঁচা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর দিয়ে; শুকনো খেজুরও না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত।

রোজাদারের বেশি বেশি দোয়া করা মুস্তাহাব।