রমজানে দান-সদকার গুরুত্ব ও ফজিলত
ফারহান হাসনাত
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজান আমলের বসন্তকাল। এ মাসে যেকোনো আমলেরই রয়েছে ১০ গুণ সওয়াব। এ মাসের অন্যতম আমল দান-সদকা। গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়নো। কারণ রোজা ফরজ করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। আর এ কল্যাণ তখনই অর্জিত হবে যখন রোজাদার দানের হাত প্রসারিত করবে।
রমজানে মহানবী (সা.)-এর দানশীলতা : রমজানে দানের ফজিলত অনেক বেশি। এ জন্য অন্য ১১ মাসের তুলনায় এ মাসে অধিক দান-সদকা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উদার ও দানশীল ছিলেন। রমজানে যখন জিবরাইল (আ.) তার কাছে নিয়মিত আসতেন এবং কোরআন পড়ে শোনাতেন, তখন তার দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.)-এর চেয়ে বেশি দানশীল আমি আর কাউকে দেখিনি।’ (মুসলিম : ২৩০৭)।
রাসুল (সা.) তার উম্মতদের শিক্ষা দিয়েছেন, রমজান মাসে দান ও বদান্যতার হাত সম্প্রসারিত করতে। হাদিসে রমজান মাসকে সহানুভূতির মাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, গরিব-দুঃখী মানুষের কষ্ট অনুভব করা। যারা প্রাচুর্যের মধ্যে জীবনযাপন করেন তারা সারা বছর ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা না বুঝলেও রমজানে কিছুটা বোঝেন। এই বোঝা তখনই সার্থক হবে, যখন তারা গরিব-অসহায়দের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।
১ টাকা দানে ৭০ টাকা দানের সওয়াব : রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা প্রতিটি নফল কাজের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন। সে হিসাবে রমজানে এক টাকা দান করে ৭০ টাকা দানের সওয়াব লাভ করা সম্ভব। এ জন্য প্রত্যেক রোজাদারের উচিত, নিজের সাধ্য অনুযাযী অনাথ, আর্ত, সহায়-সম্বলহীন ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দানের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর পথে ব্যয় করো, নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর তোমরা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করো। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা : ১৯৫)।
ইফতার করানো সওয়াব : আমাদের সমাজে এমন অনেক অসহায়-নিঃস্ব লোক আছে, যারা সাহরি ও ইফতারে সামান্য খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খায়। বছরের অন্য সময় কোনোরকম চলে গেলেও রমজানে তাদের দুর্ভোগ ও দুর্দশা বেড়ে যায়। এ ধরনের মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। রমজানে গরিবের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অনেক সুযোগ ও উপলক্ষ্য ইসলাম করে দিয়েছে। জাকাত, সদকা ও সাধারণ দানের বাইরেও তাদের ইফতার করানো একটি বড় ফজিলতের কাজ। গরিব হোক ধনী হোক, যে কোনো রোজাদারকে ইফতার করালে সওয়াব রয়েছে।
রমজান উপলক্ষ্যে ব্যয়বহুল অনেক ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। এখানে গরিব-দুঃখীদের প্রবেশাধিকার থাকে না। এসব আয়োজনে সাধারণত অনেক অপচয় হয়ে থাকে। যদি যথার্থই সওয়াবের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে এর চেয়েও গরিব-দুঃখীদের মধ্যে ইফতার বিলিয়ে দেওয়ার সওয়াব অনেক বেশি। তাই পবিত্র রমজানে প্রত্যেকের উচিত, সাধ্যমতো গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
মেলে আল্লাহর দান : রোজার মাধ্যমে ব্যক্তির অন্তরে দানশীলতা ও বদান্যতার গুণাবলি সৃষ্টি হতে পারে। মানুষকে দানশীল, সহানুভূতিশীল, মানবদরদি ও পারস্পরিক কল্যাণকামী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ইসলামের প্রতিটি ইবাদত সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালায়। তাই রোজাদার ব্যক্তিকে ইবাদতে মগ্ন থেকে সদয় আচরণ, দানশীলতা ও বদান্যতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইহকালীন কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির পথ প্রশস্ত করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রোজার দ্বারাই মানুষ দানশীল ও আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ হয়। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি দান করতে থাকো, আমিও তোমাকে দান করব।’ (বোখারি : ৫৩৫২)।
যিনি দাতা বা দানশীল, তার হাত দানগ্রহীতা বা দান গ্রহণকারীর হাত থেকে উত্তম। দাতা শ্রেষ্ঠ এ জন্য যে তিনি দানশীলতা ও বদান্যতার মাধ্যমে অন্যের উপকার করেন। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা আত্মমর্যাদাশীল অথচ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত, তারা প্রকাশ্যে সাহায্য চাইতে লজ্জাবোধ করলেও তাদের থেকে দান আরম্ভ করা অপরিহার্য। আর দান-সদকা করে রোজাদার ব্যক্তি অন্তরে কষ্ট অনুভব করলে সেই দান আল্লাহর কাছে গ্রহণীয় ও পছন্দনীয় হয় না। তাই প্রাচুর্য থেকে দান করলে অধিক পুণ্য হয়। কেননা, এতে দাতার অন্তরে কোনো রকম কষ্ট হয় না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের (ধনীদের) অর্থ-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সুরা জারিয়াত : ১৯)।
রমজানে দান-সদকা : রমজান মাসে দানের ফজিলত অনেক বেশি। অন্য ১১ মাসের তুলনায় এ মাসে অধিক দান-সদকা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উম্মতদের বাস্তব শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে রমজান মাসে দান-দক্ষিণা ও বদান্যতার হাত বেশি করে প্রসারিত করতেন। মাহে রমজানে তার দানশীলতা অন্যান্য মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেত। এ মাসটিকে তিনি দানশীলতার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি রমজানে অন্যান্য সময় অপেক্ষা অধিক দয়ালু ও সহানুভূতিশীল হতেন। প্রত্যেক সাহায্যপ্রার্থী দরিদ্রকেই তিনি দান করতেন। এ সময় কোনো প্রার্থী তার কাছ থেকে বঞ্চিত হত না।
রোজার মাধ্যমে অন্তরে তাকওয়া বা খোদাভীতি সৃষ্টি হলো না, দানশীলতা ও বদান্যতার গুণাবলি তৈরি হলো না, তার রোজা পালন নিছক উপবাস ছাড়া আর কিছু নয়। তাই যে ব্যক্তি শুধু রোজা পালন করে, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা, ত্যাগ-তিতিক্ষায় এগিয়ে আসে না, সমাজের গরিব-দুঃখীদের অভাব দূরীকরণ তথা দারিদ্র্য-বিমোচনে হাত সম্প্রসারণ করে না, সে ব্যক্তি রমজান মাসের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়। একজন রোজাদার মন থেকে কৃপণতা পরিহার করে যদি দানশীল না হন, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে শুধু রোজা রাখার জন্য তার রহমত লাভে বঞ্চিত হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন কৃপণ আবেদের চেয়ে একজন মূর্খ দানশীল ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ আর যে ব্যক্তি রমযান মাসে দান-সদকা করে, সে সাধারণ সময়ের দানের চেয়ে বহুগুণ বেশি সওয়াব পাবে। হাদিসে আছে, ‘রমজান মাসে এক দিরহাম দান-খয়রাতের বিনিময়ে সহস্র দিরহামের পুণ্য লিপিবদ্ধ করা হয়।’
কে আসলে অভাবমুক্ত! : যে রোজাদারের মন উদার ও আত্মা পরিশুদ্ধ, সে দরিদ্র হলেও প্রকৃত ধনী। যার যত টাকা-পয়সা আছে, সেই অনুপাতে দান-সদকা আল্লাহ গ্রহণ করে থাকেন। ধনী ও বিত্তশালী রোজাদার ব্যক্তি বেশি টাকা দান করে যে পুণ্যের অধিকারী হবেন, অনুপাতে কম টাকা দানকারী বিত্তহীন ব্যক্তিও আল্লাহর কাছে সেই পুণ্যের অধিকারী হতে পারেন, যিনি বিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে খুশিমনে দান করবেন। দানের ব্যাপারে শুধু টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর করে না, তা মানুষের মনের ওপর নির্ভর করে। নবী (সা.) বলেছেন, ‘আত্মার অভাবমুক্তিই হচ্ছে আসল অভাবমুক্তি।’ (বোখারি : ৬৪৪৬)।
যে শুধু প্রথাগত রোজা পালন করে, কিন্তু দানশীলতা ও বদান্যতার চর্চা করে না, তার রোজা তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রিয় বানাতে পারবে না। জান্নাতে প্রবেশের জন্য দানশীলতা একটি অতি প্রয়োজনীয় গুণ।
