যে কৌশল কাজে লাগিয়ে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন মহানবী (সা.)
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৫ হিজরির শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মক্কার কুরাইশ, মদিনার ইহুদি, বেদুইন ও পৌত্তলিকেরা মিলিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নামে। যুদ্ধের মূলে ছিল মদিনা থেকে বহিষ্কৃত ইহুদি গোত্র বনু নাজিরের ষড়যন্ত্র। মদিনায় থাকাকালে মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তারা। ফলে তাদের মদিনা থেকে বের করে দেওয়া হয়। তারা আশ্রয় নেয় খায়বারে। সেখানে গিয়ে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে পড়ে।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে বনু নাজিরের নেতারা একা কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। তারা মক্কার কুরাইশদের কাছে যায়। তাদের উসকানি দেয়। তাদের উসকানিতে কুরাইশরা আরও সাহস পায়। কারণ, মক্কার কুরাইশদেরও প্রধান শত্রু মদিনার মুসলিমরা। তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত জোট গড়ে তোলে। জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় বনু আসাদ, গাতফান ও বনু সুলাইম।
তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে মদিনা অভিমুখে রওনা দেয়। তাদের লক্ষ্য মদিনা থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে পারলেন, কাফেরদের সম্মিলিত এ জোট মদিনা আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে। মহানবী (সা.) জরুরি বৈঠক ডাকলেন। সাহাবিদের পরামর্শ চাইলেন, কী করা যায়? কাফেরদের বিশাল বাহিনীর সংখ্যা মদিনার মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। মুসলমান যোদ্ধাদের সংখ্যা তো আরও কম। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে কাফেরদের পরাজিত করা বেশ কঠিন ব্যাপার হবে?
সাহাবিরা বিভিন্ন রকম পরিকল্পনার কথা জানালেন। মতামত দিলেন। কেউ কেউ বললেন, ‘বদরের মতো সরাসরি লড়াই করব আমরা।’ কেউ বললেন, ‘মদিনার ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হোক।’ ইরানি সাহাবি সালমান ফারসি (রা.) পরিখা খননের পরামর্শ দেন। সালমান ফারসির জন্ম ইরানের ইস্ফাহানে (প্রাচীন নাম পারস্য)। সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি। তার পরিবার ছিল অগ্নিপূজক। তরুণ বয়সে সত্য ধর্মের খুঁজে মদিনায় আসেন। নবীজি (সা.) হিজরত করে মদিনায় এলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
সালমান ফারসি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এমন সংকটে ইরানে আমরা আমাদের চারপাশে খন্দক বা পরিখা খনন করতাম। মদিনাকে রক্ষা করতে পরিখা খনন করতে পারি?
আরবরা এ যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। নবীজি (সা.) তার কাছ থেকে পরিখা খননের বিস্তারিত জানলেন। তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন পরিখা খননের।
মদিনার ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, মদিনার তিন দিক ছিল পাহাড় ও ঘন খেজুরবাগানে ঘেরা, যা প্রাকৃতিকভাবেই সুরক্ষিত ছিল। উত্তর দিক ছিল উন্মুক্ত ও অরক্ষিত। এদিক দিয়ে শত্রু প্রবেশের শঙ্কা ছিল। তাই মহানবী (সা.) উত্তর দিকে পরিখা খননের নির্দেশ দেন।
প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গভীর পরিখা খননের কাজ শুরু হয়। সব সবল পুরুষ সাহাবিরা পরিখা খননে নেমে পড়েন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও কাজে নামেন। সে সময় বেশ কষ্ট হয় সাহাবিদের। না খেয়ে রাতদিন কাজ করেন। ক্ষুধায় পেটে পাথর বাঁধেন মহানবীও (সা.)। একটি ঘোড়া লাফ দিয়ে যতটা দূরত্ব পেরিয়ে যেতে পারে, গর্ত খনন করা হয় এর চেয়ে প্রশস্ত করে। পরিখা খনন শেষ করা হয় মাত্র ছয় দিনে। খননের দৈর্ঘ্য ছিল পাঁচ হাজার হাত, প্রস্থ ছিল নয় হাত এবং গভীরতা সাত হাত। সম্মিলিত বাহিনী মদিনার কাছাকাছি পৌঁছাল। তাদের দলে ১০ হাজার সেনা। নবীজির (সা.) সঙ্গে আছেন তিন হাজার সাহাবি। দুই দল দুই দিকে। মধ্যখানে খন্দক বা পরিখা। কুরাইশ বাহিনী খন্দক দেখে হতভম্ব। তারা প্রায় এক মাস মদিনা অবরোধ করে বসে রইল। তারা পরিখা খননের চারপাশে ঘুরে ঘুরে দুর্বল জায়গা খুঁজতে লাগল। কিন্তু ও রকম জায়গা খুঁজে পেল না।
উভয়পক্ষের মধ্যে তীর নিক্ষেপ হলো কয়েক দফা। পাথরও ছোড়া হলো দুদিকে। কিন্তু সরাসরি সংঘর্ষ হলো না। অবরোধ দীর্ঘ হওয়ায় শত্রুদের উৎসাহ কমতে লাগল। ১০ হাজার লোকের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল কঠিন কাজ। তার ওপর প্রচণ্ড শীত পড়ল। একদিন প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেল কাফেরদের ওপর। তাদের তাঁবুর ছাউনি উড়ে গেল। হাঁড়ি-পাতিল উল্টে গেল। তাদের মনে ভয় ঢুকে গেল। তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তাদের ফিরে যাওয়া ছাড় আর কোনো উপায় থাকল না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করো। যখন সৈন্যবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে নিকটবর্তী হয়েছিল, এরপর আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম ঝড়ো হাওয়া এবং এক (ফেরেশতারূপী) সৈন্যবাহিনী, যা তোমরা দেখনি। তোমরা যা করো আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী।’ (সুরা আহজাব : ৯)।
আল্লাহতায়ালা মুসলমাদেন বিজয় দান করেন। পরাজিত করেন কাফেরদের। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ কাফেরদের তাদের আক্রোশসহ ফিরিয়ে দিলেন, তারা কোনো কল্যাণ লাভ করতে পারেনি। যুদ্ধে মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, মহাপরাক্রমশালী।’ (সুরা আহজাব : ২৫)।
