মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ০২)
সব আত্মিক রোগের মহৌষধ প্রেম
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাতাসে ইথার ভাসে। সেই ইথারে ভর করে শব্দ ও ছবি আসে আমাদের কানে, চোখে, বেতারে, টিভিতে। ইথার আমাদের একান্ত আপন; তবুও তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না বেতার আবিষ্কারের আগে। ইথারের মতো সমগ্র বিশ্বে নিত্য বিরাজমান আল্লাহর রহমত। সুফি তাত্ত্বিকগণ বলেন, আল্লাহর প্রেমের আকর্ষণ। এই আকর্ষণই মাধ্যাকর্ষণের মতো স্থির রেখেছে সমগ্র জাহান। এই প্রেম লাভে জীবন ধন্য হয়। বৈদ্যুতিক সংযোগের মতো জীবন ও জগত আলো-ঝলমল হয়। এতে ব্যর্থ হলে জীবন ও জগত আঁধারি, জুুলমাত ও পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়।
এই বিশ্ব প্রেমের সঙ্গে হৃদয়ের প্রেমের সংযোগ কীভাবে সম্ভব? অনুভবের পর্দায় রহমতের বরিষণের পথ কোনটি? মওলানা বলছেন : বস্তুর মোহ-বাঁধন থেকে মুক্তি।
বান্দ বোগসাল বাশ আজাদ আয় পেসার
চান্দ বাশি বান্দে সিম ও বান্দে জার
বাঁধন ছিন্ন কর মুক্ত স্বাধীন হও, ওহে বৎস!
আর কতকাল থাকবে স্বর্ণ ও রূপার শিকল-বদ্ধ?
দুনিয়ার মায়াজাল ও ধন-সম্পদের মোহ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে ও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে মায়ামোহমুক্ত অন্তঃকরণে সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে গেলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। সুতরাং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সাধনার পূর্বশর্ত হচ্ছে পার্থিব ধন-সম্পদের প্রতি মোহ-এর বন্দিত্ব-শিকল থেকে মন ও আত্মাকে মুক্ত করা।
গার বেরিজি বাহর রা দার কুজেয়ি
চান্দ গুঞ্জাদ কেসমাতে য়্যক রুজেয়ি
যদি সাগরকে এনে একটি কলসির মধ্যে ঢাল
কতখানি ধরবে? একদিনের খোরাকির আন্দায।
একটি খালি কলসির ওপর একটি সাগর এনে ঢেলে দিলেও কলসিতে কতখানি পানি ধরবে? নিশ্চয়ই এক কলসির বেশি বা একদিনের প্রয়োজনের অধিক পানি ধারণ করবে না। তাহলে কলসিরূপ মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য সম্পদের কাছে নিজকে বন্দি করে রাখবে কেন? জগতের যাবতীয় সম্পদ অর্জন করলেও তো নিজে সব খেতে, ভোগ করতে পারবে না। কিন্তু লোভী মানুষ এই সহজ সরল কথাটি বুঝে না। কারণ-
কুজেয়ে চাশমে হারিসান পুর নাশুদ
তা সাদাফ কানে নাশুদ পুর দোর নাশুদ
লোভীদের চোখের কলসি কখনো পূর্ণ হয়নি
ঝিনুক যতদিন তুষ্ট না হয়েছে মুক্তায় পূর্ণ হয়নি।
ঝিনুক গ্রীষ্মের তাপদাহে আকাশের পানে হা করে থাকে। বর্ষায় প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ বন্ধ করে সাগর তলায় চলে যায়। তখন বৃষ্টির সে ফোঁটাটি মুক্তায় পরিণত হয়। এক ফোঁটা বৃষ্টিতে তুষ্ট না হয়ে যদি ঝিনুক আরও আরও পাওয়ার আশায় হা করে বসে থাকে, তাহলে তার পেটে মুক্তা জন্মায় না। মানুষের অবস্থাও অনুরূপ। প্রশ্ন হলো, এই মোহমুক্তি ও অল্পেতুষ্টির উপায় কী?
হারকে রা জামে জে এশ্কি চাক শুদ
উ জে হেরস্ জুমলা এইবি পাক শুদ
প্রেমে পড়ে যার (সম্মানের) জামা দীর্ণ হয়েছে
লোভ ও যাবতীয় দোষ হতে সে পাক-সাফ হয়েছে।
প্রেমের মহিমা নিয়ে এতক্ষণ আলোচনার কল্যাণে প্রেম যেন এখন সরাসরি মওলানার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে। তাই তাকে সম্বোধন করে বলছেন :
শাদ বাশ এই এশ্কে খোশ সওদায়ে মা
এই তাবিবে জুমলা ইল্লাতহায়ে মা
ধন্য হও হে প্রেম! ওহে আমার সুখময় মগ্নতা
ওহে আমার সকল রোগের চিকিৎসক!
এই দাওয়ায়ে নাখ্ওয়াত ও নামুসে মা
এই তু আফলাতুন ও জালিনুসে মা
ওহে আমার আত্মপূজা, খ্যাতির গরিমার ওষুধ
ওহে তুমিই তো আমার প্লেটো ও জালিনুস।
আফলাতুন প্লেটো, বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক। জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭ সালে। আনুমানিক ৮০ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি ছিলেন এ্যথেন্সের অধিবাসী বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ ও মনীষী। সংখ্যাতত্ত্ব ও সৌর বিজ্ঞানে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন এশরাকী ঊষঁসরহধঃরড়হ আলোকন দর্শনের প্রবক্তা। তিনি হাকিকত বা সারসত্যে উপনীত হওয়ার পথ নফসের শুদ্ধি ও কাশফ বলেই মনে করতেন। সেদিক থেকে তিনি আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। জালিনুস গ্যালেনাস, তিনি অনড়য়ৎধঃ-এর পর প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ চিকিৎসাবিদ। বারগামাশ শহরে তার জন্ম। তিনি দেশ ভ্রমণ করে বেড়াতেন। ১৭ বছর বয়সেই চিকিৎসা, দর্শন ও গণিতশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ২৪ বছর বয়সে এসব জ্ঞানে সিদ্ধান্ত দানের পারদর্শিতা অর্জন করেন। দক্ষ চিকিৎসক বুঝাতে জালিনুস (গ্যালেনাস)-এর নাম ব্যবহার করা হয়। (শারহে করিম জামানি, ১খ. পৃ. ৬৪-৬৫)।
মওলানার মতে এশ্ক্ বা প্রেম সব আত্মিক রোগের মহৌষধ। সব রোগের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকও এই প্রেম। শুধু তাই নয়, প্রেমের গুণেই মানুষ এ জগৎ, আকাশ, মহাশূন্য ও ঊর্ধ্বলোক পাড়ি দিয়ে আল্লাহর সন্নিধানে যেতে সক্ষম।
জেস্মে খাক আয্ এশ্ক্ বার আফলাক শুদ
কুহ দার রাক্স্ আমাদ্ ও চালাক শুদ
মাটির দেহ প্রেমের কারণে ঊর্ধ্বাকাশ পাড়ি দিল
পর্বত নেচে উঠল ও প্রাণচঞ্চল হলো।
এখানে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে রাসুলে পাক (সা.)-এর মিরাজ গমন এবং আল্লাহর নুরের তাজাল্লিতে মুসা (আ.)-কে নিয়ে কুহে তুর প্রকম্পিত হওয়ার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। (সুরা বনি ইসরায়েল, ১; সুরা নাজম, ৫৩ : সুরা আরাফ : ১৪৩)।
এশ্ক্ জানে তুর আমাদ আশেকা
তুর মাস্ত ও খাররা মুসা সাএকা
প্রেম যখন তুর পাহাড়ে প্রাণ সঞ্চার করল,
তুর উন্মাতাল আর মুসা মূর্ছিত হয়ে পড়ে গেল।
কেবল মানুষ বা প্রাণী কেন, জড়জগতেও প্রেমের শিহরণ-জাগরণ বিদ্যমান। তূর পর্বতে আল্লাহর নুরের যে তাজাল্লি পতিত হয়েছিল, মাওলানার ভাষায় তা ছিল এশকের বিচ্ছুরণ। এর ফলে তুর পর্বত জড়বস্তু হওয়া সত্ত্বেও তাতে প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছিল। পাহাড় উন্মাতাল হয়ে কাঁপতে লাগল আর আল্লাহর জলিলুল কদর পয়গাম্বর মুসা (আ.) প্রেমের শৌর্য ও মাহাত্ম্যের প্রভাবে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেয়ে মূর্ছিত হলেন। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘তারপর যখন তার প্রভু পাহাড়ের ওপর আপন জ্যোতির বিকিরণ ঘটালেন, সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।’ (সুরা আরাফ : ১৪৩)।
এ পর্যন্ত এসে মাওলানা রুমি (রহ.) যেন প্রেমকে অতিক্রম করে প্রেমাষ্পদের সান্নিধানে চলে গেছেন।
