অন্যকে অগ্রাধিকার দিলে যে সওয়াব পাবেন
ফারহান হাসনাত
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া মহৎ গুণ। এটি সুন্নতও। এটি ইসলামের সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র হিসেবে বিবেচিত। অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিনিময়ে আল্লাহ দুনিয়া-আখেরাতে সফলতা দান করেন। তার আমলনামায় সওয়াব দেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বোখারি : ১২)।
আল্লাহর নেয়ামতে ভরপুর জান্নাত। সেখানে শুধু শান্তি আর শান্তি। অশান্তির কোনো কিছুই জান্নাতিকে স্পর্শ করতে পারবে না। জান্নাতের নেয়ামত যারা ভোগ করবে, তাদের অন্যতম ব্যক্তি হলো যারা নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়। জান্নাতের নেয়ামতের অধিকারীগণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোরআনে আছে, ‘(তারাই সেসব নেয়ামত লাভ করবে, যারা...) এবং যারা মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে তার প্রতি (নিজেদের) আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও। (আর বলে) আমরা তো তোমাদের খাওয়াই শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তোমাদের থেকে আমরা কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা দাহর : ৯)।
হাদিসে আছে, সাহল (রা.) বলেন, ‘এক নারী রাসুলুল্লাহ (সা.) কাছে একটি ঝালরযুক্ত বুরদা নিয়ে এলেন। সাহল বললেন, ‘তোমরা জান, বুরদা কী?’ তারা বলল, ‘চাদর’। তিনি বললেন, ‘ঠিক’। নারী বললেন, ‘চাদরটি আমি নিজ হাতে বুনে আপনার জন্য নিয়ে এসেছি, যেন আপনি এটি পরেন।’ মহানবী (সা.) তা গ্রহণ করলেন। তাঁর চাদরের প্রয়োজন ছিল। এরপর তিনি তা লুঙ্গি হিসেবে পরে আমাদের কাছে এলেন। তখন এক ব্যক্তি ওই চাদরের সৌন্দর্য বর্ণনা করে বলল, ‘বাহ, এ যে কত সুন্দর। আমাকে তা পরার জন্য দিন।’ সাহাবিরা বললেন, ‘তুমি ভালো করোনি। তিনি প্রয়োজনে পরেছেন, তবুও তুমি চেয়ে বসলে। অথচ তুমি জানো যে, তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না।’ ওই ব্যক্তি বলল, আল্লাহর শপথ, আমি তা পাওয়ার উদ্দেশ্যে চাইনি। আমার চাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য চাদরটি যেন আমার কাফন হয়।’ সাহল বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ওই চাদরই তার কাফন হয়েছিল।’ (বোখারি : ১৯৮৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চাদরের প্রয়োজন ছিল, এর বিকল্পও ছিল না তাঁর কাছে। উপহার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরে নেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও একজন প্রার্থী যখন সেই প্রয়োজনীয় চাদরটিই চেয়ে বসল, সঙ্গে সঙ্গে তা খুলে তাকে উপহার দিয়ে দিতে সামান্য দেরি করেননি তিনি। কীভাবে নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিতে হয়, এটাই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সুন্নাহ পালনে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘আমি খুব ক্ষুধার্ত।’ এরপর তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালেন। স্ত্রী বললেন, ‘যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ। আমার কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই।’ তিনি অন্য এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনিও একই কথা বললেন। এভাবে সব স্ত্রী একই কথা বললেন যে, ‘সেই সত্তার শপথ। যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার কাছে পানি ছাড়া অন্য কিছু নেই।’ তখন তিনি (সাহাবিদের লক্ষ করে) বললেন, ‘আজ রাতে কে লোকটির মেহমানদারি করবে, আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন।’ এ সময় এক আনসারি ব্যক্তি উঠে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি।’ এরপর লোকটিকে নিয়ে আনসারি নিজের ঘরে গেলেন এবং তার স্ত্রীকে বললেন, ‘তোমার কাছে কি কিছু আছে? সে বলল, ‘না। শুধু বাচ্চাদের জন্য সামান্য কিছু খাবার আছে।’ তিনি বললেন, ‘তুমি বাচ্চাদের অন্য কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখো। আর যখন মেহমান প্রবেশ করবে, তখন তুমি বাতি নিভিয়ে দেবে। তুমি তাকে দেখাবে যে, আমরাও খাবার গ্রহণ করছি। সে (মেহমান) যখন খাওয়া শুরু করবে, তখন তুমি আলোর কাছে গিয়ে সেটা নিভিয়ে দেবে।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘এরপর তারা বসে রইলেন, আর মেহমান খেতে লাগল। সকালবেলা তিনি (আনসারী) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলে রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘আজ রাতে মেহমানের সঙ্গে তোমাদের দুজনের আচরণে আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন।’ (মুসলিম : ২০৫৪)।
সাহাবিরা নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যের প্রয়োজন বড় করে দেখেছেন। আল্লাহ তাদের প্রতি খুশি হয়েছেন। তাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।
