মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবি শরিফ (কিস্তি- ০৩)
মাশুক মানে প্রেমময় আল্লাহ
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বা লাবে দামসাযে খোদ গার জুফ্তমি
হামচো নায় মান গোফ্তানিহা গুফতাসি
২৭. আপন সুরস্রষ্টা বন্ধুর ঠোঁটের সঙ্গে যদি যুক্ত হতাম
বাঁশরির মতো আমিও অনেক না বলা কথা ব্যক্ত করতাম।
বাঁশি কখনও একাকী বাজতে পারে না। শুধু যখন বাদকের ঠোঁটে উঠে- তখনই সে বাজে, তার মধ্যে সুরের সৃষ্টি হয়। তেমনি আল্লাহর প্রেমে মত্ত প্রেমিক তখনই তার প্রেম-রহস্য পূর্ণরূপে ব্যক্ত করতে সক্ষম হয়, যখন যোগ্য-বোদ্ধা শ্রোতার সঙ্গে মিলিত হয়। সেদিকেই ইঙ্গিত করে মওলানা রুমি বলছেন, আমিও যোগ্য শ্রোতার সঙ্গেমিলিত হতে পারলে এশকের কত রহস্য বর্ণনা করতে পারতাম।
হারকে উ আজ হাম যাবানি শুদ জুদা
বি যাবান শুদ্ র্গাচে দারাদ্ সাদ্ নাওয়া
২৮. যে জন আপন ভাষাভাষী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে
মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলে, যদিও মনে শত কথা থাকে।
পরম প্রেমময়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হলেই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। প্রাকৃতিক জগতেও এর উদাহরণ বিদ্যমান।
চোন্ক গোল রাফত ও গোলিস্তান দার গুযাশ্ত্
নাশ্নাভি যান্ পাস্ যে বুলবুল সার গুযাশ্ত্
২৯. যখন ফুল ঝরে ফুলবন উজাড় হয়ে যায়
বুলবুলের কাছে তখন শুনবে না বিহরগীতি।
জুমলা মাশুক আস্ত ও আশেক পার্দেয়ি
যেন্দে মাশুক আস্ত ও আশেক মোর্দেয়ি
৩০. সবকিছুই মাশুক, আশেক নিছক পর্দামাত্র
মাশুকই জীবন্ত, আশেক তো মুর্দা মাত্র।
মাশুক ও আশেকের পার্থক্য নির্ণিত হয়েছে। মাশুকই (প্রেমাস্পদ) সব কিছু। আশেক (প্রেমিক) যেন মাশুকের পর্দা। একমাত্র মাশুকই জীবন্ত; আশেক মৃত, নিষ্প্রাণ।
মাশুক মানে প্রেমময় আল্লাহ। তিনিই একমাত্র অস্তিত্বশীল। আশেক মানে সৃষ্টিলোক, সৃষ্টিলোকের নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনিই জিন্দা আর বাকী সব মুর্দা সমতুল্য। আল্লাহর রহমতের সংযোগেই সৃষ্টিলোকের সবকিছু সচল, অস্তিত্বশীল। এই রহমত বিচ্ছিন্ন হলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না; কিয়ামত ঘটে যাবে। তখন একমাত্র তিনিই থাকবেন।
গবেষকগণ এ বয়েতে মাওলানা রুমি (রহ.) তাসাউফের বহুল আলোচিত ‘হামাউস্ত’ বা ‘ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ’ (একক অস্তিত্ব) মতবাদ ব্যক্ত করেছেন বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। মওলানা থানবি (রহ.) সহ অনেকে এর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
‘ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ’ মানে একমাত্র আল্লাহতায়ালাই অস্তিÍত্ববান, অবিনশ্বর। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টি বাস্তবের বিপরীত মনে হবে। কারণ, বিশ্বলোকে বিরাজমান কোটি কোটি সৃষ্টি, সবই তো স্বতন্ত্র
অস্তিত্ববান দেখা যায়। তবে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে একমাত্র ‘আল্লাহর একক অস্তিত্ব’-এর যথার্থতাই উদ্ভাসিত হবে। কেননা, আল্লাহতায়ালা অনাদি, অনন্ত, চিরস্থায়ী, অক্ষয়, অব্যয়, অবিনশ্বর অস্তিত্বের অধিকারী। পক্ষান্তরে অন্য সবকিছুর অস্তিত্বই অতি ক্ষীণ ও ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহর অস্তিত্ব স্বয়ম্ভু, স্বয়ং বর্তমান, স্বয়ংসম্পূর্ণ। যখন কোনো কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না, তখনও তিনিই অস্তিত্বে ছিলেন। যখন কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না, তখনও তিনি তাঁর অনন্ত অস্তিত্বে বিদ্যমান থাকবেন। পক্ষান্তরে অন্য সবকিছুর অস্তিত্ব ক্ষণকালের জন্য আল্লাহতায়ালার দেওয়া। আল্লাহর অস্তিত্ব দান ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো কিছুই অস্তিÍত্ব লাভ করতে পারে নি; অস্তিÍত্ব নিয়ে টিকেও থাকতে পারবে না। আল্লাহতায়ালা এগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যে অস্তিত্ব দান করেছেন সে সময় পার হয়ে গেলে সব অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। এই বিশ্বাস ও বাস্তবতাই ‘ওয়াহদাতুল ওয়াজুদ’ দর্শন। এর সঙ্গে ‘সর্বেশ্বরবাদ’-এর ন্যূনতম সম্পর্ক নাই।
চোন নাবাশাদ এশ্ক্ রা পারওয়ায়ে উ
উ-চো মুরগি মান্দ বি পার ওয়ায়ে উ
৩১. প্রেমিকের প্রতি যদি প্রেমের (প্রেমাষ্পদের) দয়াদৃষ্টি না থাকে
তখন সে পালকহীন পাখি, আফসোস তার অসহায়ত্বে।
এশ্ক্ (প্রেম) এখানে মাশুক (প্রেমাস্পদ)-এর স্থলে ব্যবহৃত। মওলানা বলেছেন : প্রেমের এই পথে চলতে প্রেমাষ্পদের হাতছানি চাই।
মান চেগুনে হুশ দারাম পিশ ও পাস
চোন নাবাশাদ নুরে য়ারাম পিশ ও পাস
৩২. সামনে-পেছনে কীভাবে হুঁশ-জ্ঞান বহাল থাকবে আমার
যদি বন্ধুর নূর না থাকে সামনে ও পেছনে আমার?
মওলানা থানবি (রহ.) সংকলিত ‘কলিদে মসনবিতে দ্বিতীয় ছত্রে পিশ ও পাস-এর পরিবর্তে হাম নাফাস উল্লেখিত হয়েছে। এর অর্থ নিত্যসাথী। অর্থাৎ আমার বন্ধুর নুর যদি আমার নিত্যসাথী না হয় তাহলে সামনে-পেছনে চলতে আমার হুঁশ-জ্ঞান ঠিক থাকবে কীভাবে? পরম বন্ধু আল্লাহ্র দয়াদৃষ্টি ও নূরের আশ্রয় ছাড়া প্রেমের পথে অগ্রসর হওয়ার সাধ্য আমার নেই। কোরআন মজিদে এর প্রতিপাদ্য আয়াত :
‘যেদিন মোমিন পুরুষ ও নারীরা দেখবে যে, তাদের নুর তাদের সম্মুখে ও ডানে ছুটাছুটি করছে।’ (সুরা হাদিদ : ১২)। কোরআনে আরও বলেন, ‘আর তিনি তোমাদের নুর দান করবেন, যার সাহায্যে তোমরা চলবে।’ (সুরা হাদিদ : ২৮)।
নবী করিম (সা.) এই নুরের জন্য দোয়া করেছেন ও উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন, ‘ইয়া আল্লাহ, আপনি আমার অন্তঃকরণে জ্যোতি দান করুন। আমার চোখে নুর দান করুন। আমার কানে নুর দান করুন। আমার ডানে নুর দান করুন। আমার বামে নুর দান করুন। আমার উপরে নুর দান করুন। আমার নিচে নূর দান করুন। আমার সম্মুখে নূর দান করুন। আমার পেছেনে নুর দান করুন এবং আমাকে বৃহত্তর নুর দান করুন।’ (বোখারি : ৫৯৬৭)।
এই নুরের প্রথম প্রতিফলন হয় কলবের আয়নায়। তাই প্রেমাসক্ত, স্বচ্ছ নির্মল ক্বলবের দর্পণ চাই।
এশ্ক খাহাদ কিন সুখান বিরুন বুয়াদ
আয়েনে গাম্মাজ নাবুয়াদ চোন বুয়াদ
৩৩. প্রেম চায় এ তত্ত্বকথা বাইরে প্রকাশ হোক
আয়না প্রতিবিম্বকারী না হলে তা কীভাবে হবে?
প্রেমের দৃষ্টান্ত হিসেবেও আয়না বা দর্পণকেই মানায়। প্রেমের ধর্ম হলো, সে নিজকে প্রকাশ করবেই। কেউ প্রেমাসক্ত হলে সে তার প্রেম ও আসক্তির কথা চেপে রাখতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে লোকসমাজে প্রকাশ করবেই। ঠিক আয়নার মতো। স্বচ্ছ আয়নার সামনে যা কিছু আসবে তাই সে প্রতিফলিত করবে। আয়নার মাঝে দৃশ্যমান হবে ব্যক্তি বা বস্তুর স্বরূপ। অনুরূপ, প্রেমের মাঝে প্রকাশিত হবে প্রেমিক বা আশেকের স্বরূপ। এমনকি স্বয়ং মাশূকও ধরা দেবে আশেকের নিমগ্ন-চিত্তের আয়নায়। কিন্তু আমাদের প্রেম ও আয়না কেন এরূপ নয়? কেন আমাদের প্রকৃত আয়না বন্ধুর চেহারা দেখে আত্মহারা হয় না? কেন সে বাসনা স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়? মওলানা এ প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলছেন-
আয়েনে আত দানি চেরা গাম্মায নিস্ত
যানকে যাঙ্গার আয রুখাশ মোমতায নিস্ত
৩৪. তোমার আয়না কেন প্রতিফলনকারী নয়, তা জান কী?
কারণ, তার চেহারার মরিচা পরিষ্কার হয়নি।
এ বয়েতের সুন্দর ব্যাখ্যা রয়েছে পরবর্তী বয়েত দুটিতে। কলিদে মসনবির বর্ণনা মতে-
আয়েনে কায যাঙ্গ ও আলায়েশ জুদাস্ত
পুর শোআয়ে নুরে খুরশিদে খোদাস্ত
ক.ম. যে আয়না মরিচা ও ময়লা হতে মুক্ত
তা আল্লাহর সূর্যের নুরের রশ্মিতে পূর্ণ।
রো তো যাঙ্গার আয রুখে ঊ পাক কুন
বাদ আযান আন নুর রা এদ্রাক কুন
ক.ম. যাও তুমি তার চেহারার মরিচা পরিষ্কার কর
এরপরই সেই নুরের মহিমা উপলব্ধি কর।
যাও, প্রথমে তুমি দিলের আয়নার ওপর হতে মরিচা দূর করে নাও, তাকে পরিষ্কার কর। তারপরই সেই নুরকে তুমি অনুভব ও উপলব্ধি করতে পারবে। দিলের আয়নায় আল্লাহর নুরের ঝলক ধারণ করার এটাই পথ ও প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া কী হবে, কীভাবে অন্তরকে মরিচামুক্ত করা সম্ভব হবে মওলানা তা বাৎলে দিচ্ছেন বাদশাহ ও বাঁদীর প্রেমের এক মনমুগ্ধকর কাহিনীর মাধ্যমে।
বেশ্নাভিদ এই দুস্তান ইন দাস্তান
দার হাকিকত নাকদে হালে মাস্ত আন
৩৫. শোনো ওহে বন্ধুরা! এই গল্পখানি
আমাদের বাস্তব অবস্থার প্রকৃত চিত্রখানি।
আমাদের হৃদয় দর্পণে কীভাবে মরিচা পড়েছে আর তা পরিষ্কার করার উপায় কী, তার রূপক চিত্র এই কাহিনি।
