রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও অনুবাদক অধ্যাপক আখতার ফারূক
শেখ নজরুল
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক জগতে এক স্বতন্ত্র নাম। তার জীবন, কর্ম ও চিন্তাধারা শুধু একটি ব্যক্তির জীবনী নয়; বরং একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি চিন্তাধারার সংগ্রাম এবং একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার নির্মাণপ্রচেষ্টা। তার মৃত্যুবার্ষিকী আমাদের সামনে সেই জীবনকে পুনরায় স্মরণ করার সুযোগ এনে দেয়, যে জীবন ছিল কর্মমুখর, আদর্শনিষ্ঠ এবং গভীরভাবে চিন্তাপ্রসূত।
২০০৬ সালের ২৯ এপ্রিল, পান্থপথ জামে মসজিদে আসরের নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। এই মৃত্যু যেন তার জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন- নিঃশব্দ, বিনম্র এবং আল্লাহমুখী। একজন মানুষ তার জীবনের শেষ মুহূর্ত কোথায় এবং কীভাবে অতিবাহিত করছেন, তা অনেক সময় তার জীবনদর্শনের সারাংশ বহন করে; আখতার ফারূকের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়।
অধ্যাপক আখতার ফারূকের জন্ম ১৯২৯ সালে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত কর্পূরকাঠি গ্রামে। তার পিতা মৌলভী ইদ্রিস আহমেদ ছিলেন একজন জনপ্রিয় সমাজসেবক ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। ফলে শৈশব থেকেই তিনি সমাজসেবা, নেতৃত্ব ও নৈতিকতার এক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। গ্রামীণ জনজীবনের বাস্তবতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী জীবনে তার লেখালেখি ও রাজনৈতিক চিন্তায় এই গ্রামীণ শিকড় এবং সমাজসচেতনতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এই দ্বৈত শিক্ষাধারা- একদিকে প্রাচ্য ইসলামি জ্ঞানচর্চা, অন্যদিকে আধুনিক বাংলা সাহিত্য- তার চিন্তাকে করে তোলে বহুমাত্রিক। ফলে তিনি যেমন ধর্মীয় গ্রন্থ অনুবাদে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, তেমনি সাহিত্য ও ইতিহাস বিষয়েও মৌলিক চিন্তা উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
রাজনৈতিক জীবনে অধ্যাপক আখতার ফারূকের যাত্রা শুরু হয় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে। তবে পরবর্তীকালে তিনি হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৮১ সালে এই আন্দোলনে তার যোগদান ছিল তার আদর্শিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার রাজনৈতিক চিন্তা ছিল মূলত ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা, নৈতিক সমাজ এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিবেদিত। সাংবাদিকতা ছিল তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামে যোগদান করেন এবং পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সাংবাদিকতা ছিল শুধু সংবাদ পরিবেশন নয়; বরং একটি আদর্শ প্রচার এবং জনমত গঠনের মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণমাধ্যম একটি জাতির চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাই এর দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখালেখির জগতে তার যাত্রা শুরু হয় একজন মৌলিক লেখক হিসেবে। তার ভাষা ছিল সরস, সহজবোধ্য এবং যুক্তিনির্ভর। তিনি জটিল বিষয়কেও সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— দাঙ্গা, জাহান্নামের আগুনে বসিয়া, পশুবাদ পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ, মধ্যপ্রাচ্যে হাফেজ্জী হুজুর, ফুটলো গোলাপ ইরান দেশে, আকবরের নবরত্ন, বাঙালীর ইতিকথা প্রভৃতি। এসব গ্রন্থে তিনি ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ ও ধর্মীয় চিন্তাধারাকে একত্রে বিশ্লেষণ করেছেন।
তার অনুবাদকর্ম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তাফসিরে ইবনে কাসির, যাদুল মাআদ, মিনহাজুল আবেদীন, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা, ফাতহুর রাব্বানী, কুরআন ব্যাখ্যার মূলনীতি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে বিশ্বমানের ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দেন। তার অনুবাদ ছিল শুধু ভাষান্তর নয়; বরং ভাবান্তর, যেখানে মূল ভাব ও প্রাসঙ্গিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। অধ্যাপক আখতার ফারূকের চিন্তাজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে অবস্থান। তিনি বাঙালি জাতির উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত কিছু কাহিনির তীব্র সমালোচনা করেন। বিশেষ করে মহাভারতে বর্ণিত রানি সুদেষ্ণা ও ঋষি দীর্ঘতমার কাহিনি, যেখানে বলা হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পু-্র ও সুহ্ম- এই পাঁচ পুত্রের মাধ্যমে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে- এই বর্ণনাকে তিনি ‘কুৎসিত কাহিনি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার মতে, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়কে হেয় করার একটি প্রচেষ্টা। বাঙালির সঙ্গে বহিরাগত আর্যরা আত্মীয়তা পাতাতে এক কুৎসিত কাহিনির অবতারণা করে। মহাভারতে বর্ণিত রানি সুদেষ্ণা ও ঋষি দীর্ঘতমার কাহিনিটি বেশ কৌতুকপ্রদ! দীর্ঘতমা ঋষি ছিলেন উতথ্য ঋষি ও তার স্ত্রী মমতার পুত্র। মমতা যখন গর্ভবতী, তখন তার দেবর দেবগুরু বৃহস্পতি তার সঙ্গে মিলিত হতে চাইলে গর্ভস্থ শিশু পা দিয়ে তাকে বাধা দেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বৃহস্পতি শিশুটিকে আজীবন অন্ধ থাকার অভিশাপ দেন। এই অভিশাপের ফলেই তার নাম হয় দীর্ঘতমা (দীর্ঘ অন্ধকার)।
পরবর্তীকালে, তার স্ত্রী প্রদ্বেষী ও সন্তানেরা তার গোধর্ম (পশুর মতো যেখানে সেখানে সংগম) এবং ভরণপোষণ করতে না পারার কারণে তাকে একটি ভেলায় বেঁধে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। ভেলায় ভাসতে ভাসতে দীর্ঘতমা অসুররাজ বলির রাজ্যে পৌঁছান। বলিরাজ তাকে গঙ্গায় স্নান করতে এসে দেখতে পান এবং উদ্ধার করে নিজের প্রাসাদে নিয়ে আসেন।
রাজা বলি ও রানি সুদেষ্ণা ছিলেন নিঃসন্তান। বংশ রক্ষার জন্য রাজা বলি ঋষি দীর্ঘতমাকে অনুরোধ করেন, যাতে তিনি নিয়োগ প্রথা অনুসারে তার স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন। তিনি এতে রাজি হন। দীর্ঘতমার ঔরসে রানি সুদেষ্ণার গর্ভে পাঁচটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। এই পুত্রেরা হলেন: অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পু-্র ও সুহ্ম। এদের নাম অনুসারেই পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের দেশগুলোর নামকরণ হয়। অর্থাৎ বাঙালি হল ঋষি দীর্ঘতমার জারজ সন্তান!
মহাভারত থেকে ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার তার বাংলা দেশের ইতিহাস গ্রন্থে বিকৃতভাষ্য এই কাহিনিটি তুলে ধরেছেন। (বাংলা দেশের ইতিহাস ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৭)
আখতার ফারূকের মতে এটি একটি বিকৃত ভাষ্য। এর প্রতিবাদেই তিনি বাঙালীর ইতিকথা গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বাঙালি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তার এই প্রচেষ্টা ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ, যা উপনিবেশিক ও আর্যকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। দুঃখজনক বিষয় হলো, এমন একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আজকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। বাংলাপিডিয়া বা উইকিপিডিয়ার মতো জায়গায় তার অনুপস্থিতি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবহেলার একটি উদাহরণ। এটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়; বরং একটি ঐতিহ্য ও চিন্তাধারার প্রতি অবহেলা। অধ্যাপক আখতার ফারূকের জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে- একজন মানুষ কীভাবে জ্ঞান, আদর্শ ও কর্মের সমন্বয়ে একটি অর্থবহ জীবন গড়ে তুলতে পারেন। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে চিন্তাবিদ, কর্মী, লেখক ও সংগঠক। তার জীবনে আমরা দেখি আদর্শের প্রতি দৃঢ়তা, জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।
বর্তমান সময়ে, যখন ইতিহাস বিকৃতি, সাংস্কৃতিক সংকট এবং আদর্শিক বিভ্রান্তি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান, তখন আখতার ফারূকের মতো ব্যক্তিত্বদের পুনরাবিষ্কার অত্যন্ত জরুরি। তার চিন্তা ও কর্ম আমাদেরকে একটি বিকল্প বুদ্ধিবৃত্তিক পথের সন্ধান দেয়- যেখানে আত্মপরিচয়, নৈতিকতা এবং জ্ঞানচর্চা একসূত্রে গাঁথা।
অধ্যাপক আখতার ফারূক শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি চিন্তাধারার প্রতীক। তার জীবন ও কর্ম আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে সত্যের সন্ধানে, ন্যায়ের পথে এবং জ্ঞানের আলোয় এগিয়ে যেতে। তার মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ তাই শুধু শোকের নয়; বরং আমাদেরকে আত্মসমালোচনা, পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন করে পথচলার প্রেরণা যোগায়।
