পাপমুক্ত জীবনের আহ্বান

শায়খ ড. সালাহ বিন আল বুদাইর

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যারা আরাফাতে অবস্থান করেছে তাদের জন্য সুখবর। যারা মুযদালিফায় গিয়েছে ও রাত কাটিয়েছে তাদের জন্য সুখবর। যারা মিনায় পৌঁছে জামরায় পাথর নিক্ষেপ করেছে তাদের জন্যও সুখবর। যারা এসব পবিত্র স্থানে দাঁড়িয়েছে ও সেই ইবাদতগুলো সম্পন্ন করেছে তাদের জন্য শুভকামনা। আল্লাহ তাআলা হাজীদের হজ ও তাদের সাঈ কবুল করুন, তাদের হজকে কবুল হজ বানান, তাদের সাঈকে গ্রহণযোগ্য করুন ও তাদের গুনাহ মাফ করে দিন।

এ বছরে যে আরাফাতে অবস্থান করতে পারেনি, সে যেন আল্লাহর হক ঠিকভাবে আদায় করে। যে মুযদালিফায় রাত কাটাতে পারেনি, সে যেন তার রবের আনুগত্যে স্থির থাকে, যিনি অনুগত বান্দাকে নিজের কাছে নিকটবর্তী করেন। আর যে মিনায় অবস্থানকারীদের সঙ্গে থাকতে পারেনি, সে যেন সর্বদা তার রবের আনুগত্যে থাকে, তাতেই সে তার কাম্য লক্ষ্য অর্জন করবে।

তোমরা যারা প্রাচীন ঘর কাবায় হজ করতে গিয়েছ, দূর-দূরান্ত থেকে এসে চারদিক থেকে ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি তুলেছ! আল্লাহর অনুগ্রহে তোমাদের হজ পূর্ণ হয়েছে, তোমাদের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এখন তোমরা নিজ নিজ ঘরবাড়ি ও দেশে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ। তাই সাবধান! হারাম কাজে ফিরে যেও না, পাপের চাদর গায়ে দিও না, গুনাহের মধ্যে নিজেকে জড়িও না। তোমরা যেন সেই নারীর মতো না হও, যে নিজের সুতা শক্ত করে বুনে আবার নিজেই তা খুলে ফেলে। সে এক বোকা নারী। সকাল থেকে সন্ধ্যা পরিশ্রম করে সুতা বানায়, আর শক্ত করে গাঁথার পর আবার তা খুলে ফেলে, সব নষ্ট করে দেয়। এতে সে শুধু কষ্টই পায়, কোনো লাভ পায় না। তাই তোমরা যেন এমন না হও যে, নিজেদের গড়া আমল নষ্ট করে দিও না, অর্জনগুলো নষ্ট করো না, যা সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছ তা ভেঙে ফেলো না।

হে আল্লাহর ঘরের হাজিগণ! তোমরা তোমাদের জীবনে এক নতুন ও পরিষ্কার পৃষ্ঠা খুলেছ। হজের পর তোমরা পবিত্র ও নির্মল পোশাক ধারণ করেছ। তাই সাবধান! লজ্জাজনক কাজ, ধ্বংসের পথ ও নিকৃষ্ট আমলের দিকে ফিরে যেও না। একটি ভালো কাজের পর আরেকটি ভালো কাজ কত সুন্দর! আর ভালো কাজের পর খারাপ কাজ কতই না নিকৃষ্ট! তোমাদের হজ যেন তোমাদেরকে ধ্বংসের পথ থেকে রক্ষা করে, পাপের ফাঁদ থেকে বাঁচায়, আরও বেশি ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে। হাসান বসরী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘কবুল হজ কী?’ তিনি বলেন, ‘হজের পর মানুষ যেন দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হয় ও আখিরাতের প্রতি আগ্রহী হয়।’

কতই না সুন্দর, যখন একজন হাজি হজ শেষে তার পরিবার ও দেশে ফিরে আসে উত্তম চরিত্র, পরিপক্ব বুদ্ধি, স্থিরতা, পবিত্রতা ও ভালো গুণাবলী নিয়ে। কতই না সুন্দর, যখন সে মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে, সন্তানদের সঙ্গে সদাচরণ করে, যার অন্তর বাহিরের চেয়েও ভালো, আর গোপন অবস্থা প্রকাশ্য অবস্থার চেয়েও সুন্দর। যে ব্যক্তি হজ শেষে এসব গুণ নিয়ে ফিরে আসে, সে সত্যিই হজের মহান শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়েছে।

হজের আনুষ্ঠানিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইবাদত শুধু আল্লাহরই অধিকার, অন্য কারও জন্য নয়। কারণ তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনিই একমাত্র সত্তা যার কাছে আমরা নিজেদের সমর্পণ করি, যার দিকে আমরা মুখ ফিরাই, যার কাছেই আমরা প্রয়োজন পূরণের জন্য চাই, বিপদ থেকে রক্ষা চাই ও সংকটে সাহায্য প্রার্থনা করি। অতএব, একজন হাজী হজের পর দোয়া, সাহায্য প্রার্থনা, কুরবানি বা মানত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য করতে পারে? কী ধরনের হজ সেই ব্যক্তির, যে হজ শেষে মৃতদের কাছে সাহায্য চায়, কবরের চারপাশে তাওয়াফ করে, জিন-শয়তানের জন্য কুরবানি দেয়, বা কবরবাসীদের আল্লাহর সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী বানায়?! আবার কী ধরনের হজ সেই ব্যক্তির, যে হজ শেষে জাদুকর ও ভণ্ডদের কাছে যায়, রাশিফল ও জ্যোতিষে বিশ্বাস করে, কুসংস্কার মানে, তাবিজ ঝুলায় ও নিকৃষ্ট বিদআতে লিপ্ত হয়? আর সেই ব্যক্তির জীবনে হজের প্রভাব কোথায় যে হজ শেষে নামাজ নষ্ট করে, যাকাত দেয় না, ঘুষ ও সুদ খায়, মাদক ও নেশায় লিপ্ত হয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ও বড় বড় পাপের মধ্যে ডুবে থাকে?

হে প্রাচীন কাবাঘরের হাজিগণ! তোমরা যারা আল্লাহর ঘরের হজের সময় ইহরামের নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত ছিলে— জেনে রাখো, এমন কিছু নিষিদ্ধ বিষয় আছে যা সবসময়, সারাজীবন ও সব যুগেই নিষিদ্ধ। তাই সেগুলো থেকে সাবধান থাকো। সেগুলোর কাছে যেও না। যে ব্যক্তি হজে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ‘লাব্বাইক’ বলেছে, সে যেন এরপর এমন কোনো ডাক, মতবাদ, নীতি বা আহ্বানে সাড়া না দেয় যা আল্লাহর দ্বীনের বিরোধিতা করে যে দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যে হজে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছে, সে যেন সর্বদা ও সর্বস্থানে আল্লাহর আদেশ মেনে চলে।তার বাহন যেদিকেই যাক, সে যেখানে অবস্থান করুক না কেন; এতে সে দ্বিধা করবে না, নিজের পছন্দণ্ডঅপছন্দের অনুসরণ করবে না, অবহেলা করবে না ও বিরক্তও হবে না।

হে মদিনা মুনাওয়ারার যিয়ারতকারীরা, তোমরা যারা এই সম্মানিত ও পবিত্র শহরে আগমন করেছ, তোমরা এমন এক স্থানে আছ, যা হিজরতের ভূমি, সুন্নাহর কেন্দ্র, ঈমানের আশ্রয়স্থল এবং কল্যাণ ও বরকতের নগরী। হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! ইবরাহিম আ. তোমার বান্দা, তোমার বন্ধু ও তোমার নবী। আমিও তোমার বান্দা ও তোমার নবী। তিনি মক্কার জন্য তোমার কাছে দোয়া করেছিলেন, আর আমি মদিনার জন্য ঠিক তেমনই দোয়া করছি, বরং তার সঙ্গে আরও বেশি।’ (সহিহ মুসলিম : ৩২২৫)। আর হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর হাদিসে আছে, ‘হে আল্লাহ! বরকতের সঙ্গে আরও দ্বিগুণ বরকত দাও।’ (মুসলিম : ৩২২৭)। অতএব, তোমরা এই শহরের মর্যাদা চিনে নাও, এর মূল্য উপলব্ধি করো, এর পবিত্রতা রক্ষা করে এখানে উত্তম আচরণ বজায় রাখো। হজরত ইবনে উমর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার এই মসজিদে এক নামাজ অন্য সব মসজিদের এক হাজার নামাজের চেয়ে উত্তম, তবে মসজিদে হারাম ছাড়া।’ (মুসলিম : ৩২৬৫)। অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী এই ফজিলত ফরজ ও নফল উভয় নামাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

হে আল্লাহর বান্দা! তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কেটে গেছে, অথচ তুমি এখনও প্রবৃত্তির বাঁধনে আবদ্ধ। তুমি কল্যাণ ও রহমতের মৌসুমগুলো পেয়েছ, অথচ তুমি ব্যস্ত ছিলে খেলাধুলা ও পাপাচারে। তুমি কি হাজী, ওমরাহকারী ও ইবাদতকারীদের কাফেলা দেখনি? তুমি কি ইহরামধারীদের সরলতা, প্রার্থনাকারীদের হাত, তওবাকারীদের অশ্রু দেখনি? তুমি কি লাব্বাইক, তাকবীর ও তাহলীলের ধ্বনি শোননি? তাহলে বলো তো! কোন জিনিস তোমাকে ব্যস্ত রেখেছে? কী তোমাকে তোমার প্রভুর আনুগত্য থেকে বিরত রেখেছে? হে ঐ ব্যক্তি, যে দিন-রাত পাপের মধ্যে ডুবে আছ ও বলছ, আজ না কাল তওবা করব! মনে রেখো, একদিন তুমি একা কবরের মধ্যে রাত কাটাবে। তাই এখনই তওবা কর, যতদিন সতর্ক হওয়ার সময় আছে।

গুনাহ ও অপরাধ থেকে ফিরে আসো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ-আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার : ৫৩)।

আর তোমরা দরুদ ও সালাম পাঠ করো সেই মহান নবীর ওপর, যিনি আখেরাতে মানুষের সুপারিশকারী। যে ব্যক্তি তার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন। হে আল্লাহ! আমাদের নবী ও নেতা হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! আপনি সন্তুষ্ট থাকুন খোলাফায়ে রাশেদীন ও হেদায়েতপ্রাপ্ত ইমামদের ওপর। আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা., অন্যান্য পরিবারবর্গ ও সাহাবীদের উপর, আমাদেরকেও তাদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করুন, হে দয়ালু, হে দাতা।

হে আল্লাহ! ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মান বৃদ্ধি করুন, শিরক ও মুশরিকদের অপমানিত করুন ও দ্বীনের শত্রুদের ধ্বংস করুন। আমাদের দেশ ও সমস্ত মুসলিম দেশের হেফাজত করুন ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র, প্রতারকদের প্রতারণা, বিদ্বেষীদের বিদ্বেষ ও হিংসুকদের হিংসা থেকে।

অনুবাদ: আবদুল কাইয়ুম শেখ