মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
ফাসেকের প্রসংশা করা হলে কেঁপে ওঠে আল্লাহর আরশ
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বর্ণকারকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করার কাজটি খোদায়ী ইঙ্গিতে হয়েছে, প্রবৃত্তির কামনা বা ভ্রান্ত অনুমানের ভিত্তিতে নয়। পূর্বোক্ত গল্পের পরিসমাপ্তিতে আমরা দেখি, হেকিম গোপনে স্বর্ণকারকে বিষাক্ত ওষুধ সেবন করিয়ে তার শরীর ভেঙে দেন, এর ফলে তার মৃত্যু ঘটে। আপাতদৃষ্টিতে এটি নরহত্যা। বাদশাহ এবং হেকিম উভয়ই ছিলেন নেককার লোক। কাজেই গল্পের প্রয়োজনে নরহত্যার মতো কর্ম কি শোভনীয় হতে পারে? মওলানা রুমি পাঠক হৃদয়ে উঁকি দেয়া এই প্রশ্নের জবাবে নিম্নোক্ত পংক্তিসমূহের অবতারণা করেছেন।
কুশ্তানে ঈন মার্দ বার দাস্তে হাকীম
নাই পেয়ে ঊম্মীদ বূদ ও নাই যেবীম
২২২. হেকীমের হাতে এই লোক নিহত হওয়া
কোনো কিছুর আশায় বা আশঙ্কায় ছিল না তা।
উ নাকুশ্তাশ আয বারা'য়ে তাবএ শা'হ
তা' নায়া'মাদ আমর ও এলহা'মে ইলা'হ
২২৩. তিনি হত্যা করেন নি বাদশাহর মনঃতুষ্টির জন্যে
যতক্ষণ খোদায়ী আদেশ ও ইলহাম না এসেছে তার জন্যে।
আ'ন পেসার রা' কাশ খিযির বুব্রীদ হাল্ক
সিররে আ'নরা' দার নায়া'বাদ আ'মে খাল্ক
২২৪. ঐ ছেলেটির কথা, যার গলা কাটলেন খিযির
তার রহস্য বুঝতে অক্ষম সাধারণ লোকজন।
সূরা কাহফে (১৮ ); আয়াত: ৬০-৮২ এ ঘটনার বিশদ বিবরণ বিধৃত।
আঁকে আয হাক য়া'বাদ উ ওয়াহ্য়ো জাওয়া'ব
হারচে ফারমা'য়াদ বুওয়াদ এইনে সাওয়া'ব
২২৫. স্বয়ং আল্লাহ্র তরফ হতে যিনি লাভ করেন ওহী ও জবাব
তিনি যাই কিছু বলেন, হয়ে যায় সত্য হুবহু বাস্তব।
আঁকে জা'ন বাখ্শাদ্ আগার বুক্শাদ্ রাওয়া'স্ত
না'য়েবাস্ত ও দাস্তে উ দাস্তে খোদা'স্ত
২২৬. যিনি প্রাণ দেন, যদি তিনি হত্যা করেন তো বৈধ
তার হাত আল্লাহ্র হাত, তিনি যে প্রতিনিধি তাঁর।
হামচো ইসমা'ঈল পীশাশ সার বেনেহ্
শা'দ ও খান্দা'ন পীশে তীগাশ জা'ন বেদেহ
২২৭. ইসমাঈলের মতো সঁপে দাও তাঁর সামনে মাথা
হাসিমুখে সানন্দে তাঁর ছুরির সামনে দাও প্রাণটা।
তা' বেমা'নাদ জাঁ'ত খান্দা'ন তা' আবাদ
হামচো জা'নে পা'কে আহমাদ বা' আহাদ
২২৮. তোমার প্রাণ থাকে সহাস্য চিরকাল যাতে
আহমদের পাক রূহ যেরূপ যুক্ত আহাদের সাথে।
আল্লাহ্র সাথে আহমদ তথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসল্লামের প্রাণ যেমন চিরন্তনভাবে যুক্ত, খুশি-আনন্দে একাকার হয়ে আছেন, এভাবে প্রাণ উৎসর্গ করলে তোমার প্রাণও আনন্দের ফুলবনে উড়ে বেড়াবে চিরদিন ধরে। কারণ, প্রকৃত প্রেমিকদের গূঢ়রহস্য হলো—
আ'শেকা'ন জা'মে ফারাহ আ'নগাহ কাশান্দ
কে বেদাস্তে খীশে খোবা'নশা'ন কুশান্দ
২২৯. প্রেমিক তখনই আনন্দের পান পেয়ালা আকণ্ঠ পান করেন
প্রেমাস্পদের হাতে যখন নিহত হন, প্রাণটি অর্পণ করেন।
মওলানা বাদশাহ্ ও অলি-আল্লাহ্র এ কাজে আপত্তি উত্থাপনের ব্যাপারে সতর্ক করছেন—
শা'হ আ'ন খূন আয পেয়ে শাহওয়াত নাকার্দ
তো রাহা' কুন বদগুমা'নী ও নাবার্দ
২৩০. বাদশাহ ঐ রক্তপাত ঘটাননি কামনার বশে
তুমি কুধারণা ছাড়, লড়তে যেওনা তার সাথে।
তো গুমা'ন বুর্দী কে কার্দ আ'লূদাগী
দার সাফা' গেশ কাই হেলাদ্ পা'লূদগী
২৩১. তুমি ভাবছ কীনা, কামনার বশে তিনি কলুষিত
আগাগোড়া স্বচ্ছতার মাঝে কি কলুষতা সম্ভব?
বর্ণনার এ পর্যায়ে মওলানা হৃদয়ের স্বচ্ছতা কীভাবে আনা সম্ভব তার বর্ণনা দেন।
বাহরে আ'নাস্ত ঈন রেয়া'যাত ওইন জাফা'
তা' বার আ'রাদ কূরে আয নোকরে জুফা'
২৩২. নফসের শুদ্ধির জন্যেই এত দুঃখ, কৃচ্ছতা, যাতনা
সাধনার ভাটি যেন উদগার করে রৌপ্যের মরিচা।
বাহরে আ'নাস্ত এমতেহা'নে নীক ও বাদ
তা' বেজূশাদ বার সার আ'রাদ যার যোবাদ
২৩৩. এর জন্যেই তো নিরন্তর ভাল মন্দের পরীক্ষা চলে
যাতে স্বর্ণ সিদ্ধ হয়ে জং-ময়লা ভাসিয়ে তোলে।
গার নাবূদী কা'রাশ এলহা'মে ইলা'হ
উ সাগী বূদী দারা'নান্দে ন শাহ
২৩৪. বাদশাহর কাজ যদি আল্লাহ্র এলহামে না হত
হিংস্র কুকুর বলেই গণ্য হত, নয় বাদশাহ নামে খ্যাত।
পা'ক বূদ আয শাহওয়াত ও হেরচ ও হাওয়া'
নীক কার্দ উ লে-কে নীকে বাদনোমা'
২৩৫. কামনা-বাসনা লোভ থেকে তিনি পবিত্র ছিলেন
ভাল কাজ করেছেন, তবে দেখতে মন্দের মতন।
গার খিযির দার বাহর কেশতী রা' শেকাস্ত
সাদ দোরস্তী দার শেকাস্তে খিযর হাস্ত
২৩৬. খিযির যদি সাগরে ভেঙ্গে থাকেন সাম্পান
খিযিরের এ ভাঙ্গায় নিহিত ছিলসমূহ কল্যাণ।
ওয়াহমে মূসা বা' হামে নূর ও হুনার
শুদ আযা'ন মাহজূব তো বী পার মাপার
২৩৭. মূসার (আ) জ্ঞানে এত নূর এত দক্ষতা সত্ত্বেও
এ রহস্য বুঝতে অক্ষম হলেন। উড়তে যেওনা তুমি তো পালকহীন।
মূসা (আ) এতবড় পয়গাম্বর হওয়া সত্ত্বেও খিযির (আ)-এর মতো আল্লাহর অলীর কাজের রহস্য বুঝতে পারলেন না, যার বিবরণ কুরআন মজীদে সূরা কাহফে সবিস্তারে বর্ণিত আছে।
আ'ন গুলে সুরখাস্ত তো খুনাশ মখা'ন
মাস্তে আকলাস্ত উ তো মজনূনাশ মখা'ন
২৩৮. (স্বর্ণকারের রক্ত) সে তো রক্তিম ফুল, তুমি বল না তা রক্ত লাল
সে বাদশাহ বুদ্ধির পাগল, তুমি বলো না তিনি ছিলেন উন্মাতাল।
গার বুদী খূনে মুসলমা'ন কা'মে উ
কা'ফেরাম গার বুরদামী মান না'মে উ
২৩৯. মুসলমানের খুন ঝরানো যদি বাদশাহর উদ্দেশ্য হতো
আমিও কাফির তাহলে, তার নাম যদি মুখে নিতাম।
এর কারণ হচ্ছে—
মী বেলারযাদ আরশ আয মাদ্হে শাক্বী
বাদগুমা'ন গার্দাদ যে মাদ্হাশ মুত্তাকী
২৪০. নাফরমানের প্রশংসা করা হলে কেঁপে উঠে আল্লাহ্র আরশ
তার প্রশংসায় মুত্তাকীরাও হয়ে যায় কুণ্ঠিত, আস্থাহীন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে :
"যখন ফাসিফের প্রশংসা করা হয়, তখন আল্লাহ্ পাক ক্রোধান্বিত হন আর এ জন্যে আরশ কেঁপে ওঠে।" -(জামে সগীর, ১খ. পৃ. ৩৪)
শাহ্ বূদ ও শা'হে বাস্ আ'গা'হ বূদ
খা'স বূদ ও খা'সসায়ে আল্লা'হ বূদ
২৪১. বাদশাহ ছিলেন, আরও ছিলেন জ্ঞানে গরিমায় শাহানশাহ
নামদার তো ছিলেন আরো ছিলেন আল্লাহ্র খাস বান্দা।
আ'নকাসী রা' কাশ চোনীন শা'হী কুশাদ
সূয়ে বখত ও বেহতারীন জা'হী কাশাদ
২৪২. এরূপ কোনো বাদশাহ যদি কাউকে হত্যা করেন
নিয়ে যান তাকে সৌভাগ্যের পানে উত্তম আসনে।
গার নাদীদী সূদে উ দার কাহ্রে উ
কায় শুদী আ'ন লুতফে মুতলাক কাহ্র জূ
২৪৩. (বাদশাহ যদি) হত্যার মধ্যে না দেখতেন তার কল্যাণ
কীভাবে সেই দয়ার আধার নিষ্ঠুর হতেন?
আল্লাহ পাক বান্দার প্রতি সর্বদা দয়াপরবশ। বান্দার ওপর কখনো যদি রাগ করেন বা কঠোরতা আরোপ করেন, তার মধ্যেও আল্লাহ্র দয়া এবং বান্দার কল্যাণ নিহিত থাকে। আল্লাহ্্র খাস বান্দাদের কাজের স্বরূপও অনুরূপ। একটি সাধারণ উপমার সাহায্যে বিষয়টি তিনি পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন।
বাচ্চা মী লার্যদ আযা'ন নীশে হাজা'ম
মা'দারে মুশফেক্ব দারা'ন গ্বাম শা'দকা'ম
২৪৪. হাজামের ছুরির ভয়েতে ছেলে থরথর কাঁপে
দয়ার্দ্র মা ছেলের দুঃখের মাঝে আনন্দে হাসে।
খাতনার সময় ছেলে কষ্টে কাঁদে। কিন্তু মা আনন্দে হাসেন। কারণ তিনি ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। এই কান্না ও হাসির তাৎপর্য অনেক গভীর। বান্দার প্রতি আল্লাহ্ পাকের কোনো কোনো আচরণের তাৎপর্যও অনুরূপ।
নীমে জা'ন বেসেতা'নাদ ও সাদ জা'ন দাহাদ
আ'নকে দার ওয়াহমাত নায়া'য়াদ আ'ন দাহাদ
২৪৫. তোমার দুর্বল প্রাণ নেন, বিনিময়ে শত প্রাণ দেন।
তোমার কল্পনায় ধরবে না যা, তাই তিনি দেন।
"হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ্ পাক বলেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন পুরস্কার ও দান সামগ্রী সাজিয়ে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখে নি, কোনো কান শোনে নি এবং মানুষের কল্পনায় কোনো দিন তা আসেনি।"-(বুখারী, মুসলিম)
তো কেয়া'স আয খীশ মী গীরী ওয়া লে-ক
দূর দূর ওফতা'দেয়ী বেনগার তো নে-ক
২৪৬. তুমি শুধু নিজের ওপর অনুমান কর, কিন্তু
দূরে বহুদূরে পড়ে আছ ভাল করে লক্ষ কর।
অলী আল্লাহদের অবস্থাকে নিজের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বিচার করলে কী ধরনের বিভ্রাট ঘটে এবং গোটা সৃষ্টিতে একই ধরনের বস্তুর পরস্পরে যে তারতম্য বিরাজমান তার ব্যাখ্যায় মওলানা আরেকটি গল্পের অবতারনা করছেন।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবী শরীফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবীর গল্প ভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)
