মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবি শরিফ

নবী-ওলিদের সঙ্গে সাধারণের যোজন দূরত্ব

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বূদ বাক্কালী ওয়া ওয়েই রা' তূতিয়ী

খোশ নাওয়া'য়ী সাব্য গুয়া' তূতিয়ী

এক ছিল মুদির দোকানি আর তার একটি তোতা,

সুরেলা-সুকণ্ঠি সবুজ রঙের, কথা বলায় পাকা।

র্ব দোকা'ন বূদী নেগাহ্বা'নে দোকা'ন

নোক্তে গোফ্তী বা' হামে সাওদা'গারা'ন

দোকানের মধ্যে সে তোতা ছিল পাহারাদার

মিষ্টি মিষ্টি কথায় মন গলাত সব ক্রেতার।

র্দা খেতা'বে আ'দামী না'তেক বুদি

দার নাওয়া'য়ে তূতিয়া'ন হা'যেক বুদি

মানুষের ভাষায় কথা বলত সে সবার সঙ্গে

টিয়াদের সুরে গাইতেও পটু ছিল একই সঙ্গে।

খা'জা রোযী সূয়ে খা'নে রাফতে বূদ

দার দোকা'ন তূতী নেগাহবা'নী নামূদ

দোকান মালিক একদিন বাড়িতে গিয়েছিল

টিয়াপাখি তখন দোকানের পাহারা দিচ্ছিল।

গোরবেয়ী বরজাস্ত্ না'গাহ্ আয্ দোকা'ন

বাহ্রে মূশী তূতীয়াক আয্ বীমে জা'ন

একটি বিড়াল লাফ দিল হঠাৎ দোকানের মাঝ থেকে

একটি ইঁদুর ধরবে, কিন্তু বেচারা তোতা প্রাণের ভয়ে—

এমন সময় হঠাৎ একটি ইঁদুর দেখে ধরার জন্য একটি বিড়াল লাফ দিল, তখন—

জাস্ত আয সূয়ে দোকা'ন সূয়ী গুরীখ্ত্

শীশেহা'য়ে রওগনে গোল রা' বেরীখ্ত্

দোকানের এক প্রান্ত থেকে উড়াল দিয়ে ওপ্রান্তে গেল

সরিষার তেলের বোতলগুলো সে নিচে ফেলে দিল।

টিয়া দোকানের উচ্চাসনে বসা ছিল। মনে করল বিড়াল বুঝি তাকে ধরার জন্য লাফ দিয়েছে। তাই প্রাণের ভয়ে সেও লাফ দিল, একদিকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করল। তাতে পাখার ঝাপটায় সরিষা তেলের বোতলগুলো নিচে পড়ে গেল।

আয্ সূয়ে খা'নে বেয়া'মাদ খা'জা-আশ

বার দোকা'ন বেন্শাস্ত ফা'রেগ্ব খা'জা-ওয়াশ

খানিক পরে দোকানি বাড়ি থেকে ফিরে এল

মহাজনি আসনে নিশ্চিন্তে দোকানে বসল।

দীদ পুর রওগান দোকা'ন ও জা'মে চার্ব

বার সারাশ জাদু গাশ্ত্ তূতী কাল্ যে যার্ব

দেখল, দোকান তেলে ভর্তি আর জামা ছপছপে

মাথায় আঘাত করলে তোতা হয়ে গেল নেড়ে।

দোকানদার বাড়ি থেকে ফিরে দেখে, তেলের বোতলগুলো পড়ে গেছে। চারদিকে তেল ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে আর তার বসার গদি ও জামায় ছপছপে তেল। এ অবস্থায় হঠাৎ রাগের বশে দোকানদার তোতার মাথায় আঘাত করল। তাতে তোতার মাথার পালকগুলো উঠে গেল এবং তোতা একদম টাকু বনে গেল। এ অবস্থায় তোতা—

 

রূযাকী চান্দী সুখান কূতা'হ কার্দ

মার্দে বাক্কা'ল আয্ নাদা'মাত আ'হ্ কার্দ

কয়েকটা দিন কথা বলা বন্ধ করে দিল

অনুতাপে দোকানি হা-হুতাশ শুরু করল।

রীশ বার মীকান্দ ও মী গোফ্ত্ এই দারীগ

কা'ফতা'বে নে' মাতাম শুদ, যীরে মীগ্ব

টেনে টেনে দাঁড়ি ছিঁড়ে আর বলে, হায়রে কপাল!

আমার সৌভাগ্যের সূর্য গেল মেঘের আড়াল।

দাস্তে মান বেশ্কাস্তে বূদী আ'ন যামা'ন

চোন জাদাম মান বার সারে আ'ন খোশ যাবা'ন

হায়! যদি আমার হাতটাই ভাঙ্গা থাকত তখন

সুকণ্ঠি তোতার মাথায় আঘাত করলাম যখন।

তোতার মুখের বুলি ফিরে পাবার আশায় দোকানি নানা তদবীর শুরু করল।

হাদয়েহা' মী দা'দ হার দারবীশ রা'

তা' বেয়া'বাদ নোত্কে মোর্গে খীশ্ রা'

দান-খায়রাত করে অকাতরে ফকীর-দরবেশ দেখে

হয়তো হঠাৎ ময়নার যবান আবার খুলে যাবে!

বা-দে সে রূয ও সে শাব, হায়রা'ন ও যা'র

বার দোকা'ন বেন্শাস্তে বুদ নো-মীদওয়া'র

হা-হুতাশ পেরেশানিতে তিনদিন তিনরাত কেটে যায়

দুশ্চিন্তা ও হতাশায় দোকানি বসে বসে দিন কাটায়।

অন্যভাবেও সে তোতার মুখের বুলি ফুটানোর চেষ্টা করছিল—

মী নামূদ আ'ন মোর্গ্ব রা' হারগূন শেগোফ্ত

তা' কে বা'শাদ আন্দার আ'য়াদ-উ বে গোফ্ত্

নানা ভঙ্গি-ভেলকি দেখায় পাখিটির সামনে গিয়ে,

যদি হঠাৎ কথা বলে ওঠে সুন্দর টিয়ে।

জাওলাক্বীয়ী সার বেরেহনে মী গুযাশ্ত্

তা সারে বী মূ'চো পুশ্তে তা'স ও তাশত্

ছেঁড়া আলখেল্লা পরা, নেড়া মাথা এক ভবঘুরে দরবেশ

যাচ্ছিল সে পথে মাথা তার পাতিল ও বাসনের পিঠ সদৃশ।

দোকানির নানা কৌশল, অঙ্গভঙ্গি, ভেলকি-তদবির যখন বিফল হলো, তখন একদিন এক দরবেশ যাচ্ছিল দোকানের সামনের পথ দিয়ে। ঘটনাচক্রে দরবেশও ছিল নেড়া। পাতিল বা বাসনের পিঠের মতো তেলতেলে তার মাথা। তাকে দেখে হঠাৎ তোতার যবান খুলে গেল। দরবেশকে লক্ষ্য করে তোতা বলে উঠল :

তূতী আন্দার গোফ্ত্ আ'মাদ দার যামা'ন্

বা'ঙ্গ বার দারবীশ যাদ কে হেই ফোলা'ন

হঠাৎ তোতা কথা বলে উঠল ওই মুহূর্তে

ডাক দিল- কী খবর! ওহে-দরবেশ বলে।

আয্ চেয়ী কাল্ বা কালা'ন আ'মীখ্তী

তু মাগার আয্ শীশে রাওগ্বান রীখ্তী

তুমি কেন টাক-মাথা টাকুদের দলে?

তুমিও কি বোতলের তেল ফেলে দিয়েছ তাহলে?

আয্ ক্বেয়া'সাশ্ খান্দে আ'মাদ খাল্ক্ রা'

কূ চো খোদ্ পিন্দা'শত্ সা'হেবে দাল্ক্ব রা'

তোতার মুখের এমন তুলনা শুনে হেসে উঠল লোকেরা

নিজের মতো ভেবেছে সে লোকটিকে, যে আলখেল্লা পরা।

গল্পের এ পর্যায়ে এনে মওলানা আমাদের নিয়ে যাবেন আরেক জগতে। এ জগত কথার নয়, মর্মের। শব্দের নয়, অর্থের। জীবন ও জগতে বিরাজমান সাদৃশ্যের মাঝে লুক্কায়িত সত্যের, নানা বৈচিত্র্যের। বিশ্বের তাবৎ মানব সম্প্রদায়কে উপদেশ দিয়ে মওলানা বলছেন :

কা'রে পা'কা'ন রা' কিয়া'স আয্ খোদ মাগীর

গারচে মা'নাদ দার নেভিশতান্ শের ও শীর

পবিত্রজনদের কাজকে কেয়াস করো না নিজের মতো

যদিও লেখার সময় শের ও শির দেখায় একই রকম।

যাদের কথা, কাজ ও মন পরিচ্ছন্ন-পবিত্র, তাদের নিজের মতো কেয়াস-অনুমান করা মারাত্মক ভুল। এই ভুল হবে শের-কে শিরের সঙ্গে তুলনা করার মতো। শের ও শির ফারসিতে 'শিন, ইয়া ও র' -এই তিনটি অক্ষর দিয়ে লেখা হয়। শব্দ দুটির অর্থের পার্থক্য মসনবিতে দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 'শের' উচ্চারণে এর অর্থ বাঘ আর 'শির' উচ্চারণে অর্থ দুধ। অবশ্য আধুনিক উচ্চারণে উভয়ে কোনো তফাৎ নেই। বর্তমানে 'শির' বলতে বাঘ ও দুধ ছাড়াও পানির টেপও বুঝানো হয়। মওলানা বলেছেন, তিন অক্ষরে শের লিখলে একই রকম দেখালেও অর্থে আকাশ-পাতাল তফাৎ। একটিকে মানুষে খায়, আরেকটি মানুষকে খায়। এখানে একটি বয়েতের কথা আমার এক ওস্তাদের কাছে শুনেছিলাম তবে কলীদে মসনবিতে, নিকলসন সংকলনে বা মুসা নসরের গদ্যে তা পাইনি। বয়েতটি এরূপ :

 

শির আ'ন বা'শাদ কে মার্দুম মী খোরাদ

শের আ'ন বা'শাদ কে মার্দুম মী দারাদ

শির হলো, যা মানুষ পান করে

শের হলো যা মানুষকে ছিঁড়ে-ফাঁড়ে।

অনুরূপ সাধারণ মানুষ আর নবী-ওলীদের মাঝেও দুর্লংঘ্য তফাৎ বিদ্যমান। বাহ্যিক আকৃতি দেখে তাদেরকে নিজের মতো অনুমান করা মারাত্মক ভুল। যেমন শের এর অভিন্ন লেখ্যরূপ দেখে বাঘ ও দুধকে একই রকম মনে করার পরিণতি অতি মারাত্মক। মওলানা বলেছেন, দুনিয়ার মানুষ এই ভুলের মধ্যে নিপতিত।

জুমলা আ'লাম যীন সাবাব গুমরা'হ শুদ

কাম কাসী যাব্দা'লে হাক আ'গা'হ শুদ

গোটা দুনিয়া এই কারণে গুমরাহ্ হল যে,

কম লোকই আল্লাহ্র আবদালদের চিনতে পেরেছে।

'আবদালে হক' আল্লাহর আবদালরা। আল্লাহর অলিদের মাঝে একটি শ্রেণির নাম আবদাল। প্রত্যেক যুগে তাদের সংখ্যা চল্লিশজন। একজন মারা গেলে আরেকজন তার স্থানে আসেন। তবে এখানে 'আবদালে হক' বলতে সব আউলিয়ায়ে কিরামকে বুঝানো হয়েছে।

শেখ মুহিউদ্দীন আরাবি ফুতুহাতে মাক্কিয়ায় বলেন, আল্লাহর অলিদের একটি শ্রেণির নাম আবদাল। আল্লাহ তাআলা সাত একলিমকে (মহাদেশ) তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে সংরক্ষণ করেন। আর তারা সাত শ্রেণির হয়ে থাকেন। প্রথম শ্রেণির অবস্থান হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কদমের তলে, দ্বিতীয় শ্রেণির অবস্থান (হজরত মুসা) কালীমুল্লাহর কদমের তলে, তৃতীয় শ্রেণির অবস্থান হজরত হারুন (আ)-এর কদমের তলে, চতুর্থ শ্রেণি হজরত ইদরিস (আ)-এর কদমের তলে, পঞ্চম শ্রেণি ইউসুফ (আ.)-এর কদমের তলে, ষষ্ঠ শ্রেণি হজরত ইসা (আ)-এর কদমের তলে এবং সপ্তম শ্রেণির অবস্থান হজরত আদম (আ)-এর কদমের তলে। তাদের আবদাল নামে অভিহিত করার কারণ হচ্ছে, তাদের একজন যদি কোনো স্থান থেকে চলে যান তখন নিজের বদলে অন্য কাউকে রেখে যান। অবশ্য এখানে 'আবদাল' বলতে সাধারণভাবে আল্লাহর সমস্ত অলির কথা বুঝানো হয়েছে। (শারহে মসনবি, অলি আহমদ আকবরাবাদী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২২)।

কদমের তলে মানে তাদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের ফয়েজ ও প্রভাব ধারণ করেছেন। ওলি-আল্লাহদের মধ্যে কারও ওপর যদি কোনো খাস নবী ও রাসুলের (আ.) স্বভাব ও চরিত্রের ঝলক পড়ে, তাহলে বলা হয় তিনি অমুক নবীর (আ.) কদমের তলে বা তার পদাঙ্ক অনুসারী।

মসনবি শরিফের ব্যাখ্যাতা ড. বদিউজ্জামান ফুরুযানফর এই বয়েতের ব্যাখ্যায় 'আবদাল'-এর পরিচয় দিতে গিয়ে কিছু মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন।

তিনি বলেন, আবদাল হচ্ছেন একদল আল্লাহর বান্দা, যারা মানবীয় মন্দ স্বভাবগুলোকে আল্লাহ প্রদত্ত উত্তম স্বভাব দিয়ে বদলে ফেলেছেন। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী প্রত্যেক যুগে তাদের সংখ্যা ৭ জন। অন্য উক্তি অনুযায়ী ৪০ জন, কারও কারও মতে ৯০ জন অথবা ৪০৪ জন।

দু'টি কারণে তাদেরকে আবদাল নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একটি কারণ হচ্ছে, তাদের একজন যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার স্থানে আরেকজন বদল হয়ে আসেন, যাতে সব সময় চল্লিশজন পূর্ণ থাকেন। অপর কারণটি হচ্ছে, তারা নিজেদের মন্দ চরিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন এবং নিজেদের নফসকে অনুগত করে রেখেছেন। যার ফলে তাদের সুন্দর চরিত্রগুলো তাদের আমল ও ইবাদতের ভূষণে পরিণত হয়েছে।

বলা হয় যে, তাদের সংখ্যা নব্বইজন। তাদের মধ্যে যখনই কোনো একজন মৃত্যু বরণ করেন, তার বদলে আরেকজন স্থলাভিষিক্ত হন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়ার বরকতে বান্দাদের ওপর রহমত নাজিল করেন এবং দয়ার দৃষ্টি দান করেন। (শারহে মসনবি শরিফ, ড. বদিউজ্জামান ফুরুযানফর, পৃষ্ঠা: ১২৯)।

আরবি বদল শব্দটি বাংলায়ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন করীম আসে নাই তার বদলে জসীম এসেছে। এই বদল থেকেই 'আবদাল' পরিভাষার উৎপত্তি।

সাধারণত আমরা জানি যে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা করে পুলিশ, আর্মি তথা নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু যারা অভিজ্ঞ, গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন, তারা জানেন যে, নিরাপত্তা বাহিনীর নেপথ্যে আছে আরেকটি অদৃশ্য বাহিনী। যারা শান্তি-শৃঙ্খলার প্রকৃত সংরক্ষণকারী। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীকেও তারাই নিয়ন্ত্রণ করে।

এই বাহিনীকে এক কথায় গোয়েন্দা বাহিনী বলা হয়। সৃষ্টি জগতের নিয়ন্ত্রণে আল্লাহতায়ালার অদৃশ্য বাহিনীসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে এই 'আবদাল' শ্রেণি। এই ব্যবস্থাপনার জন্যে ফেরেশতাদের মধ্যেও বিভিন্ন শ্রেণি আছে। আবদালের পরে আছেন আওতাদ। তারা সৃষ্টি জগতের ব্যবস্থাপনায় আল্লাহর পক্ষ থেকে পেরেক স্বরূপ। কিন্তু দুনিয়ার সাধারণ মানুষ তাদের পরিচয় জানে না। বাহ্যিক আকৃতি দেখে সবাই নিজের মতো মানুষই ভাবে। তাদের কাজকেও নিজের সঙ্গে তুলনা করে।

 

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনরি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)