মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

নবীরা মানুষ তবে তোমার মতো নন

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হামসারী বা' আম্বিয়া' বার দা'শ্তান্দ

আউলিয়া'রা' হামচো খোদ পিন্দা'শতান্দ

এরা পয়গাম্বরদের সমকক্ষ হবার দাবি করেছে

ওলি-আল্লাহদের নিজের মতো বলে মনে করেছে।

তাদের চোখে ভালোমন্দ এক সমান। কারণ :

গোফ্তে ঈনাক্ মা' বাশার, ঈশা'ন বাশার

মা ও ঈশা'ন বাস্তেয়ে খা'বীম ও খাওর

তারা বলে যে, আমরাও মানুষ, এরাও মানুষ,

আমরা ও এরা ঘুম ও আহারের কাছে সমান বন্দি।

ঘুম ও আহার মানে প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও জৈবিক চাহিদা। পবিত্রজনদের সঙ্গে নিজেদের তফাৎ বুঝতে ব্যর্থতা কী ধরনের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে পবিত্র কোরআনে তার প্রমাণ বিদ্যমান। যেমন পবিত্র কোরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে— (কাফেররা নবী-রাসুলদের) বলল : তোমরা তো আমাদের মতো মানুষ ছাড়া আর কিছু নও।' (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ১০)। তারা বলল : এটা কোন ধরনের রাসুল যে (আমাদের মতোই) পানাহার করে এবং বাজারে হাঁটাচলা করে।' (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৭)

ঈন নদা'নিসতান্দ ঈশা'ন আয্ আমা'

হাস্ত ফারক্বী দার মিয়া'ন বী মুন্তাহা'

(অন্তরে) অন্ধত্বের কারণে এরা জানল না যে,

উভয়ের মাঝে অনন্ত ব্যবধান আছে।

প্রাকৃতিক জগত থেকে কয়েকটি দৃষ্টান্ত চয়ন করে মওলানা এই পার্থক্য ও ব্যবধানটি বুঝাতে এবং মানুষের অন্তর-চক্ষু খুলে দিতে প্রয়াস পেয়েছেন।

প্রথম উদাহরণ—

হার দো গূন যাম্বুর খোর্দান্দ আয্ মাহাল

লী-ক শুদ যান নীশ ও যীন দীগার আসাল্

উভয় প্রকার মৌমাছি একই স্থান হতে রস খায়

একটায় বিষাক্ত হুল আর অপরটায় মধু জন্মায়।

বোলতার বিষাক্ত কামড়ে মানুষ যন্ত্রণায় কাতরায় আর মৌমাছির মৌচাক হতে প্রাণসঞ্জীবনী মধু পায়। অথচ উভয়ে একই ফুলের রস চুষে খায়। কলীদে মনসবীতে প্রথম লাইনটি এ রকম—

হারদো য়্যক গোল খোর্দ যাম্বুর ও নাহাল

ক.ম. 'বোলতা ও মৌমাছি একই ফুলে আহার করেছে'।

আরেকটি উদাহরণ —

হার দো গুন আ'হু গিয়া' খোর্দান্দ ও আ'ব

যিন য়্যকী সারগীন শুদ ও যা'ন মেশ্ক্ না'ব

উভয় প্রকার হরিণ লতাপাতা খায়, পান করে পানি

একটি হতে বিষ্ঠা হয়, অপরটির খাঁটি কস্তুরি জন্মায়।

সাধারণ হরিণ লতাপাতা আহার করে শুধু মলমূত্র ত্যাগ করে। আর এক প্রকার হরিণ একই জিনিস খেলেও তার নাভীতে কস্তুরির খাঁটি মেশক জন্মায়।

 

আরও একটি উদাহরণ :

হার দো নায় খোর্দান্দ আয্ য়্যক আ'ব খা'র

ঈন য়্যকী খা'লী ওয়ান দীগার শেকার

উভয় বাঁশ অভিন্ন পানির উৎস হতে পান করে

একটির ভেতরে ফাঁকা, আরেকটি মিষ্টি রসে ঠাসা।

বাঁশ ও আখ ভুগর্ভস্থ পানির অভিন্ন উৎস চুষে বেঁচে থাকে, বর্ধিত হয়। কিন্তু সাধারণ বাঁশ ভেতরে ফাঁকা থাকে আর আখ থাকে মিষ্টি রসে ঠাসা। অথচ বাঁশ ও আখ উভয়ে দেখতে প্রায় একই রকম, তাদের আহারের উৎসও এক, অভিন্ন।

সাদ হেযা'রা'ন ঈন চোনীন আশবা'হ বীন্

ফার্কশা'ন হাফ্তা'দ সা'লে রা'হ বীন্

এ রকম শত হাজার সাদৃশ্য লক্ষ্য কর আর

তাদের মাঝে ব্যবধান দেখ ৭০ বছরের রাস্তার।

মানব সমাজ হতে উদাহরণ :

ঈন খোরাদ, গার্দদ পালীদী যূ জুদা'

আ'ন খোরাদ, গার্দাদ হামে নূরে খোদা'

একজন আহার করলে ময়লা নাপাকী নির্গত হয়,

অপরজন আহার করলে আল্লাহর নূরে পরিণত হয়।

মানুষ আহার করে বেঁচে থাকে; কিন্তু এক শ্রেণির মানুষের জীবনে পানাহার আর মল-মূত্র নির্গত হওয়াই সার। অথচ আরেক শ্রেণি একই আহার করলে তা আল্লাহর নুরে পরিণত হয়। এই ফারাক স্থূল দৃষ্টির লোকেরা বুঝতে অক্ষম। তারা বুঝে না আল্লাহর নাফরমান ও আল্লাহর ওলিদের মাঝে কত বিস্তর ব্যবধান।

ঈন খোরাদ, যা'য়াদ হামে বুখ্ল ও হাসাদ

অ'ন খোরাদ যা'য়াদ হামে এশ্কে আহাদ

একজন আহার করলে যত কৃপণতা হিংসাই জন্মে

অপরজন আহার করে তাতে জন্মায় আল্লাহ্র প্রেম।

কলীদে মসনবিতে শেষের শব্দে 'এশকে আহাদ'-এর পরিবর্তে 'নূরে আহাদ' উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রেমের পরিবর্তে আল্লাহর নুর।

আল্লাহর নাফরমান ও ওলিদের মধ্যকার এ তফাৎ বুঝতে হলে বিশ্ব প্রকৃতিতে আরও অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। এই পার্থক্যের কারণ হলো :

ঈন যামীনে পা'ক ও আ'ন শূর আস্ত ও বাদ

ঈন ফারিশতেয় পা'ক ও আ'ন দীব আস্ত ও দাদ

এই জমিন পবিত্র ওই জমিন লবণাক্ত, মন্দ

এই শ্রেণি পূতঃ ফেরেশতা-স্বভাব, ঐ শ্রেণি দৈত্য ও হিংস্র-স্বভাব।

এই জমিন পবিত্র বলতে নবী-রাসুল (আ.) ও ওলি-আল্লাহদের বুঝানো হয়েছে। আর ওই জমিন লবণাক্ত-মন্দ বলতে কাফের নাফরমানদের বুঝানো হয়েছে।

 

আরেকটি উদাহরণ :

হার দো সুরাত গার বেহাম মা'নাদ্ রাওয়া'স্ত

আ'বে তাল্খ ও আ'বে শিরীন রা' সাফা'স্ত

দুটি আকৃতি যদি এক রকম দেখায় (তা তো সম্ভব)

যেমন, তিতা পানি ও মিঠা পানি (বাহ্যত) স্বচ্ছ।

কিন্তু যখন পান করা হবে, স্বাদ নেয়া হবে তখনই উভয়ের ফারাক ধরা পড়বে।

জুয কে, সা'হেব যাওক নাশ্না'সাদ শারা'ব

উ শেনা'সাদ আ'বে খোশ্ আয্ শূরে আ'ব

মুখে রুচি ছাড়া চিনবে না কেউ পানীয়ের স্বাদ,

সে-ই চিনবে সুপেয় আর লবণাক্ত পানির ফারাক।

একমাত্র রুচিবান লোকই এই ফারাক চিনতে পারবে। যার মুখের রুচি নষ্ট হয়ে গেছে সে চিনবে না পানির স্বাদ।

স্থূল দৃষ্টির লোকদের বিভ্রান্তি বুঝাবার জন্য এখন ইতিহাস থেকে সাক্ষ্য আনা হচ্ছে:

সেহ্র রা' বা' মু'জিযা কার্দে কেয়া'স

হার দোরা' বার মাক্র পিন্দা'রাদ আসা'স

এরা জাদুকে মু'জিযার সাথে তুলনা করে ভেবেছে,

প্রতারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত উভয়ের বুনিয়াদ।

ফেরাউন মুসা (আ.)-এর মুজিযা এবং জাদুকরদের জাদুশক্তিকে এক সমান ভেবেছে। মনে করেছে মানুষের নজরবন্দি ও প্রতারণার ওপরই উভয়ের ভিত্তি। এ জন্যে-

সা'হেরা'ন বা' মূসা' আয্ এস্তিযে রা'

বার গেরেফতে চোন আসা'য়ে উ আসা'

মুসার সাথে জাদুকররা মোকাবিলার জন্য

মুসার লাঠির মতো তারাও লাঠি ধারণ করেছিল।

যিন্ আসা' তা' আ'ন আসা' ফারক্বীস্ত র‍্যাফ

যিন আমাল্ তা' আ'ন আমাল রা'হী শের্গাফ্

এই (মুসার) লাঠি আর ওই (জাদুকরের) লাঠির মাঝে বিরাট ব্যবধান,

এই আমল আর ওই আমলে আকাশ-পাতাল তফাৎ বিদ্যমান।

লা-নাতুল্লাহ্ ঈন আমাল রা' দার ক্বাফা'

রাহমাতুল্লাহ্ আ'ন আমাল রা' দার ওয়াফা'

(জাদুকরদের) আমলের পশ্চাতে আছে আল্লাহর লা'নত

সেই (মুসার আ.) আমলের সাথে আছে আল্লাহর রহমত।

কোরআন মাজিদে জাদু প্রসঙ্গে সুরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াত এবং মুসা (আ.)-এর সাথে ফেরাউনের লেলিয়ে দেয়া জাদুকরদের মোকাবিলা প্রসঙ্গে বিবরণ জানার জন্য সুরা শুআরার ৩৮-৪৬ দ্রষ্টব্য।

কাফেরদের স্বভাব বানরের মতো। আল্লাহর নাফরমানীতে এরা বানরের মতো অন্ধ অনুকরণে অভ্যস্ত, এরা বাহ্যিক আকৃতি দেখে বিভ্রান্ত হয়, অন্তরচক্ষে সত্যকে দেখে না। এরা চোখ থেকেও অন্ধ। জাদু ও মুজিযার মধ্যে তফাৎ এরা বুঝে না, আম্বিয়া-আউলিয়া ও সাধারণ মানুষকে এক পাল্লায় মাপে। এরা কাফের। এদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে:

কা'ফেরা'ন আন্দার মেরী বূযীনা তাব্

আ'ফাতী আ'মাদ দারূনে সীনা তাব্

কাফেররা শত্রুতার বেলায় বানর স্বভাবের হয়

বুকের মাঝে (আশ্রিত) কুস্বভাব এক বড় আপদ।

বানর মানুষকে যা করতে দেখে তাই অনুকরণ করে। এ ধরনের অন্ধ অনুকরণের স্বভাব মানুষের মধ্যে থাকলে তাও এক বড় আপদ। মানুষের সামনে তা সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

হারচে মর্দোম মী কুনাদ বূযীনে হাম

আ'ন কুনাদ কায্ মার্দ বীনাদ দাম বদাম

মানুষ যা করে বানরও তাই করে,

মানুষকে দেখে প্রতি মুহূর্তে তার অনুকরণ করে।

বানর মানুষের অনুকরণ করে। এটা তার স্বভাব। মানুষকে যা করতে দেখে সেও তা করে। কিন্তু এই অন্ধ-অনুকরণ তার জন্য বিপদ ডেকে আনে। মওলানা বলেন, মুনাফিকরাও মুসলমানদের দেখে দেখে ইবাদত করে, তাতে থাকে না তাদের লেশমাত্র আন্তরিকতা।

ভণ্ডনবী মুসায়লামা নিজকে নবীজির মতো মনে করে মারাত্মক ভুলের পরিণাম ভুগেছে দুনিয়ায়। আখিরাতে তো সে জাহান্নামী। মুনাফিকরাও নিজেদের মুমিনদের মতো ভেবে ইবাদতের অনুকরণ করে। মওলানা রুমির (রহ.) ভাষায় তারা বানর-স্বভাবের। মওলানা বলছেন :

উ গুমা'ন বোর্দে কে মান কার্দাম চো ঊ

ফার্ক রা' কাই দা'নাদ আ'ন এস্তিযে রো

সে (বানর) ভাবে, আমি কাজটা ঠিকই করেছি তার (মানুষের) মতো করে

শত্রুতায় লিপ্ত ব্যক্তি কীভাবে বুঝবে, উভয়ের ফারাক কিসে?

বাহ্যিক আকৃতিতে অভিন্নতা সত্ত্বেও দুটি জিনিসের স্বরূপ ও আকৃতিতে ব্যবধান কতখানি, তা বুঝতে এরা অক্ষম। তাই সত্যকে উপলব্ধি ও ধারণ করার কপাল এদের নেই।

ঈন কুনাদ আয আমর ও উ বাহ্রে সেতীয

বার সারে এস্তিযা জূয়া'ন খা'ক রীয

এরা করে আল্লাহ্র হুকুমে, ওরা শত্রুতার বশে

ধুলি নিক্ষিপ্ত হোক বিদ্বেষীদের মাথার উপরে।

কারণ, বানর স্বভাবের বিদ্বেষ-পরায়ণ লোকদের কাজে অন্ধ অনুকরণ ছাড়া ভিন্ন কোনো অর্থ ও তাৎপর্য নেই। উভয়ের কাজ দেখতে একই রকম; অথচ অর্থ ও তাৎপর্যের দিক থেকে আকাশ-পাতাল ফারাক। বিষয়টি মুনাফিক ও মু'মিনের মাঝে তুলনার নিরিখে মওলানা বলেন :

আ'ন মোনা'ফেক্ব বা' মুওয়া'ফেক্ব দার নামা'য

আয্ পেয়ে ইস্তিযে আ'য়াদ নাই নেয়া'য

ওই মুনাফিক মুওয়াফিক (মু'মিন)-এর সঙ্গে নামাজে দাঁড়ায়,

তবে শত্রুতার জন্যেই, নয় সমর্পিত হবার নিষ্ঠায়।

 

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)