মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
মননে আচরণে মোমিন ও মুনাফিকের তফাৎ
ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দার নামা'য ও রূযে ও হাজ্ব-ও যাকা'ত
বা মোনা'ফেক্ব মুমেনা'ন দার বুর্দ ও মা'ত
নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের ক্ষেত্রে
মুনাফিক ও মোমিনদের অবস্থা হার-জিতের।
মোমিনরা যেহেতু সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসী আর ইখলাসের ভিত্তিতে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আদায় করে, সেহেতু দুনিয়া ও আখিরাতে জিত ও সাফল্য তারাই লাভ করবে। পক্ষান্তরে মুনাফিকরা কপটতা আর স্বার্থ-দুষ্ট অনুকরণের কারণে উভয় জগতে হার ও যন্ত্রণাই তাদের কপালে জুটবে। মওলানা বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন :
মু-মেনা'নরা' বুর্দ বা'শাদ আ'কেবাত
বার মোনা'ফেক্ব মা'-ত আন্দার আ'খেরাত
মোমিনদেরই জিত হবে পরিণাম বিচারে
মুনাফিকরা হেরে যাবে আখিরাতে।
গারচে হারদো বার সরে য়্যক বা'যিয়ান্দ
হার দো বা'হাম মারওয়াযী ও রা'যিয়ান্দ
যদিও উভয়ে একই খেলায় মত্ত হয়, তবুও
উভয়ে যোজন দূরে, একজন মার্ভে অপরজন রেই শহরে।
মোমিন ও মুনাফিকের মধ্যকার পার্থক্য বাহ্যিক আকৃতিতে নয়, কিংবা শুধু আমল-আখলাকের মধ্যেই নয়, বরং এই তফাৎ তাদের সত্তা ও উৎসের সাথে যুক্ত। সেই উৎসই তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে এগিয়ে নেয়।
হার য়্যকী সূয়ে মাকা'মে খোদ্ রাওয়াদ
হার য়্যকী বার বেফ্কে না'মে, খোদ্ রাওয়াদ
প্রত্যেকে নিজের জন্য নির্ধারিত স্থানের দিকে ধাবিত হয়
প্রত্যেকে নিজের নামের চাহিদা মাফিক অগ্রসর হয়।
মোমিন ও মুনাফিক বাহ্যত একই ধরনের ইবাদত-বন্দেগি করলেও উভয়ের লক্ষ্য ও গন্তব্য এক নয়; মুনাফিক দোজখের নিকৃষ্টতম স্থানে যায় আর মোমিন বেহেশতের সুউচ্চ আসনে গমন করেন। মোমিন ও মুনাফিক নাম দু'টির উৎপত্তিও উভয়ের সত্তার সাথেই যুক্ত—
মু'মিনাশ্ খা'নান্দ জা'নাশ খোশ্ শাওয়াদ
ওয়ার মোনা'ফেক্ব গূয়ী পুর আ'তাশ শাওয়াদ
কাউকে মোমিন নামে ডাকা হলে তার মন খুশিতে ভরে যায়,
যদি মুনাফিক নামে ডাকা হয় রেগে অগ্নিশর্মা হয়।
দুটি শব্দ উচ্চারণে এমন পার্থক্য ও প্রতিক্রিয়া কেন হয়? আসলে-
না'মে উ মাহবূব আয্ যা'তে ওয়াই আস্ত
না'মে ঈন মাব্গুয আয্ আ'ফা'তে ওয়াই আস্ত
তার নাম যে আদরণীয়, তা তার মূল সত্তার গুণে
এর নাম যে ঘৃণিত, তা তার কপটতার কারণে।
মীম ও ওয়া ও মীম ও নূন তাশ্রীফ নীস্ত
লাফযে মু'মিন জুয পেয়ে তা-রীফ নীস্ত
মীম ওয়া মীম নূন (মোমিন) অক্ষরে সম্মান নিহিত নেই,
ঈমানের পরিচয় বহন ছাড়া মু'মিন শব্দের অন্য ভূমিকা নেই।
গার মোনা'ফেক্ব খা'নিয়াশ ঈন না'মে দূন
হামচো কায্ব্দোম মী খালাদ্ দার আন্দারূন
যদি মুনাফিককে সেই নিকৃষ্ট নাম ধরে ডাক
তার অন্তরে দংশন জ্বালা হয় বিচ্ছুর দংশনের মত।
গার না ঈন্ না'ম এশ্তেক্বা'কে দূযাখ্ আস্ত
পাস চেরা' দার ওয়াই মাযা'ক্বে দূযাখ আস্ত
মুনাফিক শব্দটির উৎপত্তি যদি দোযখ থেকে না হয়
এই নামটি নিলে কেন দোযখের বিষাদ উদগত হয়?
মুনাফিক শব্দটির কদর্যতা কয়েকটি অক্ষরের কারণে নয়; বরং অক্ষরের সমষ্টিতে যে অর্থ, সেই অর্থের কারণেই মুনাফিক ডাকলে মুনাফিকরা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। এখানে মুনাফিক শব্দটি পাত্র সদৃশ আর মুনাফিক বলতে যে অর্থ বুঝায়, তা পানির সাথে তুলনীয়। কাজেই বুঝা গেল-
যেশ্তিয়ে আ'ন না'মে বাদ্ আয্ র্হাফ নীস্ত
তালখিয়ে আ'ন আ'বে বাহ্র আয্ র্যাফ্ নীস্ত
এই নামের কদর্যতা নিছক অক্ষরের উচ্চারণে নয়
লোনা সাগরের পানি যে তিতা, পাত্রের কারণে নয়।
হরফ যরফ আ'মাদ দরও মা-না চো আ'ব
বাহরে মা-না, ইন্দাহু উম্মুল কিতা'ব
হরফ বা অক্ষর পাত্রের মত, অর্থের দৃষ্টান্ত পানি
অর্থের যে সাগর, আল্লাহ্র কাছেই তার উৎস-মূল।
এই বয়েতে মওলানা পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন— আল্লাহ যা চান মুছে দেন আর যা চান স্থায়ী রাখেন, আর তাঁর নিকটই উম্মুল কিতাব (মূল গ্রন্থ)।' (সুরা রাদ : ৩৯)
সেই উম্মুল কিতাব বা সংরক্ষিত ফলক লওহে মাহফুজে যে প্রকৃত স্বরূপ ও পরিচয় বিধৃত সেটিই আসল।
সেই স্বরূপের প্রভাবে মোমিন নাম প্রিয় আর মুনাফিক নাম স্বয়ং মুনাফিকের কাছেও ঘৃণিত। মওলানা এখন পার্থিব জীবনে ভালো-মন্দের তফাৎ বর্ণনা করছেন নানা উপমার সাহায্যে। বলছেন
বাহ্রে তাল্খ্ ও বাহ্রে শিরীন দার জাহা'ন
দার মিয়া'ন্শা'ন বারযাখুন লা' য়াবগ্বিয়া'ন
এই জগতে লোনা সাগর আর মিঠা পানির সাগর
মাঝখানে অদৃশ্য প্রাচীর, যা উভয়ে লংঘন করে না।
সাগরে লোনা পানি, মিঠা পানি একই সঙ্গে চলে, অথচ পরস্পরে মিশ্রিত হয় না। আল্লাহ্র কী কুদরত, কী অপার হেকমত। যেন সাগরের স্রোতের মাঝেই প্রাচীর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে— 'তিনিই প্রবাহিত করেন দুই দরিয়া, যারা পরস্পর মিলিত হয়, উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল, যা ওরা অতিক্রম করতে পারে না।' (সুরা রহমান : ১৯ ও ২০)
সংসার জীবনের সর্বত্র এই ব্যবধান বিদ্যমান। চক্ষুষ্মানরাই তা দেখতে পায়। মু'মিন ও মুনাফিকদের অবস্থাও এ রকমই। উভয়কে এক রকম দেখালেও উভয়ের মাঝখানে আকাশ-পাতাল তফাৎ। মু'মিন ও মুনাফিকদের অবস্থা বর্ণনায় 'বাহার' বা সাগর পরিভাষাটি কয়েকবার এসেছে। প্রশ্ন জাগতে পারে এই সাগরের উৎস কোথায়? সাগর, মহাসাগর দেখতে এমন অনন্ত, না জানি তার উৎস আরো কত অনন্ত, অসীম। মওলানা এখন আমাদের পথ দেখাতে চান সেই অনন্তের পানে।
দা'ন কে ঈন হার দো যে য়্যক আসলী রাওয়া'ন
বরগুযার যীন হার দো, রও তা' আস্লে আ'ন
জানো (লোনা-মিঠা) উভয় সাগর এক উৎস থেকেই প্রবাহিত,
কাজেই তুমি উভয়কে ছাড়িয়ে যাও ওদের উৎসমূলে।
সুফিয়ায়ে কিরাম সৃষ্টি জগতকে আল্লাহ্র নামগুলো ও গুণাবলীর মাযহার বা প্রকাশক বলে মনে করেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তারা মনে করেন, কুফরি হচ্ছে আল্লাহ্র 'মুদিল্ল' (বিপথে পরিচালনাকারী) গুণবাচক নামের প্রকাশক এবং ঈমান 'হাদী' গুণবাচক নামের প্রকাশক। কাজেই সাধককে সৃষ্টি বৈচিত্র্যের বিভিন্নতার দিকে না তাকিয়ে একক অভিন্ন সত্তার দিকে তাকাতে হবে। সেটিই হচ্ছে জগত ও জীবনের উৎস। উৎসের সন্ধান পেলেই দিব্যচক্ষু খুলে যাবে। তখন পৃথিবীতে ভালো ও মন্দের মাঝে ফারাক করতে পারবে।
যররে ক্বালব ও যাররে নেকূ দার আয়া'র
বি মাহাক্ব হারগেয্ নাদা'নী যে-তেবা'র
ভেজাল স্বর্ণ ও খাঁটি স্বর্ণের খাঁদ ফারাক বুঝতে
পারবে না, বিনা কষ্টিপাথরে, নিছক অনুমানে।
কারণ, বাহ্যিকভাবে দেখতে উভয় স্বর্ণই এক রকম দেখায়। ফলে সবটাই খাঁটি স্বর্ণ বলেই মনে হয়। এই খাঁটি-ভেজাল বা ভালো-মন্দের ফারাক সবাই বুঝতে পারে না।
হার কে রা' দার জা'ন খোদা' বেন্হাদ্ মাহাক
মার ইয়াকীন রা' বা'য দা'নাদ উ যে শাক
যার অন্তরে আল্লাহ্ দান করেছেন কষ্টিপাথর
তিনি বুঝতে পারেন ইয়াকীন কোনটি? সংশয় কী?
মানব চরিত্রের কোনো কোনো প্রশংসনীয় গুণাবলী হতে ঈমান ও ইয়াকীনের ফসল ফলে আর কোনো কোনো কুস্বভাবের কারণে সন্দেহ-সংশয়ের অন্ধকার জন্মায়, তা ফারাক করার শক্তি শুধু আল্লাহ প্রদত্ত কষ্টি পাথরওয়ালা লোকেরাই বুঝতে সক্ষম। বিষয়টি পুরোপুরি সহজবোধ্য হওয়ার জন্য একটি চমৎকার উপমা দেয়া হচ্ছে :
দার দাহা'নে যেন্দেয়ী খা'শা'কী জাহাদ
আ'নগাহ আ'রা'মাদ কে বীরূনাশ নাহাদ
জীবিত প্রাণীর মুখে যদি কোনো খড় ঢুকে পড়ে
তখনই সে শান্ত হয়, যখন টেনে বের করে।
শরীরের বা মুখের ভেতরে কোথাও কাঁটা ঢুকে পড়লে কী অস্বস্তিকর অবস্থা হয়, তার অভিজ্ঞতা আমাদের সবার আছে।
দার হেযা'রা'ন লোক্মে য়্যক খা'সা'ক খোর্দ
চোন দার আ'মাদ, হেস্সে যেন্দে পেয় বেবোর্দ
হাজারো লোকমার মাঝে একটি ময়লা পাথর কণা
যখনই ঢোকে জীবন্ত অনুভূতি ধরে ফেলে তৎক্ষণাৎ।
এই যে অনুভূতি, তা না থাকলে কেউ ভালো-মন্দ ফারাক করতে পারবে না। খাদ্যের সাথে অখাদ্য-কুখাদ্য প্রবেশ করে শরীর-স্বাস্থ্য নষ্ট করে দেবে। জাগতিক সব ব্যাপারেই এই অনুভূতি ও সতর্কতা একান্তই প্রয়োজন। সচেতন জীবন্ত প্রাণী বলতে সবার মধ্যেই তা আছে, থাকতে হয়। কিন্তু মওলানা রুমি এই অনুভূতি বা স্বাস্থ্য সচেতনতা জাগানোর চাইতে আরো গভীরে পথ-নির্দেশ করেছেন মাটির মানুষকে। বলছেন :
হেস্সে দুনয়া' নার্দবা'নে ঈন জাহা'ন
হেস্সে দীনী নার্দবা'নে আ'সেমা'ন
দুনিয়াবী যে অনুভূতি সে তো এই জগতের সিঁড়ি
ধর্মীয় যে অনুভূতি, তা আসমানী জগতের সিঁড়ি।
পার্থিব অনুভূতি দিয়ে জাগতিক ভালো-মন্দ, লাভ-লোকসান বোঝা সম্ভব। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতি যদি অর্জিত হয় তাহলে আধ্যাত্মিক জগতের রহস্য অনুধাবন সম্ভব। সুস্বাস্থ্য ও পার্থিব সাফল্য যেমন জীবন, দৈহিক তৎপরতা ও পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সক্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল, তেমনি আত্মার শুদ্ধতা, মুক্তি ও উন্নতির জন্য আত্মার বা মানস লোকের ইন্দ্রিয় শক্তির চর্চা ও পরিশোধন প্রয়োজন। প্রশ্ন হলো, এ কাজ কীভাবে সম্ভব?
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে
ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)
