মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহ.)-এর মসনবি শরিফ

আত্মিক রোগ নিরাময়ে করণীয়

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সেহ্হাতে ঈন হেস্ বে জূয়ীদ আয্ তাবীব

সেহ্হাতে আ'ন হেস্ বেখা'হীদ আয্ হাবীব

৩০৪. এই (জাগতিক) অনুভূতির সুস্থতা চাও ডাক্তারের কাছে

ওই (আত্মিক) ধমীয় অনুভূতির সুস্থতা চাও হাবিবের কাছে।

হাবিব মানে স্বয়ং আল্লাহ। তারপরে আল্লাহর বন্ধু অলিরা। তবে একটি বিষয় জেনে রেখো-

সেহ্হাতে ঈন হেস্ যে মা-মূরিয়্যে তান

সেহ্হাতে আ'ন হেস্ যে তাখ্রীবে বাদান

৩০৫. এই অনুভূতির সুস্থতা আসে দেহকে আবাদ করে

ওই অনুভূতির সুস্থতা আসে দেহকে বিরান করে।

মানুষের বাহ্যেন্দ্রিয়ের যে অনুভূতি তার সুস্থতা আনতে হলে দেহকে আবাদ করতে হয়। শরীর যদি ভালো না থাকে তাহলে নাক, কান, চোখ, মুখ প্রভৃতির অনুভূতি বিগড়ে যায়। তাই দৈহিক ইন্দ্রিয়ানুভূতিকে সুস্থ রাখার জন্যে দেহকে সুস্থ রাখতে হয়। জ্বর হলে সুস্বাদু খাবারও বিস্বাদ লাগে। নাকে সর্দির প্রকোপ হলে সুগন্ধির সুবাস বুঝতে পারে না। চোখ নষ্ট হলে তো দুনিয়াটাই অন্ধকার। কাজেই বাহ্যেন্দ্রিয়ের অনুভূতি ঠিক রাখতে হলে দেহকে সুস্থ ও আবাদ রাখতে হয়।

তার বিপরীত হচ্ছে আত্মিক অনুভূতি, তা ঠিক রাখার জন্য দেহকে বিরান করতে হবে, বরবাদ করে দিতে হবে। দেহের চাহিদাগুলো— যেমন লোভ, ভোগ, কামনা, বাসনা প্রভৃতিকে দমন করতে হবে। তবেই আত্মিক অনুভূতি চাঙা হবে, আধ্যাত্মিক জগতের রহস্যের দুয়ার খুলে যাবে। এছাড়া বিকল্প পথ নেই। তবে দেহের চাহিদা বিনাশের এই অভিযান একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই। দেহের ওপর সাময়িক দলন-দমন অভিযানের পর আবার পুনর্গঠন করা হয়। প্রক্রিয়া হলো—

রা'হে জা'ন মার জিস্ম রা' ওয়েইরা'ন কুনাদ

বাদ আযা'ন ওয়েইরা'নী আ'বা'দা'ন কুনাদ

৩০৬. প্রাণের পথ দেহকে বিরান ধ্বংস করে

সেই ধ্বংসের পর পুনরায় আবাদ করে।

কেউ যদি প্রাণের পথের পথিক হয়, আধ্যাত্মিক সাধক হয়, তাহলে প্রথমে দৈহিক ভোগ-লিপ্সাকে ধ্বংস করে ফেলতে হয়। দৈহিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো বিনাশ করার পরই সে আত্মিক তত্ত্বজ্ঞানে পূর্ণতা লাভের স্তরে উপনীত হয়। তখন উচ্চতর আধ্যাত্মিক সত্য-তাৎপর্য দর্শনের বদৌলতে তার হৃদয় চিরন্তন স্বাদ ও আনন্দে বিভোর হয়ে যায়।

প্রাণের পথ বা প্রাণের পথের পথিকের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সাধক নিজে হোক বা পীর-মুর্শিদ হোক, সাধনার প্রথম স্তরে দেহের চাহিদাগুলোকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে হয়। দেহকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার জন্য তার দাবির প্রতি অবহেলা করতে হয়। তখন দৈহিক চাহিদার ধ্বংসাবশেষের ওপর আত্মার উৎকর্ষ ঘটে। আত্মা তখন শক্তিশালী হয়। নফসের ওপর রুহের বা আত্মার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। দেহের দোসর নফস যখন পুরোপুরি কাঁবু হয়ে যায়, তখন আবার দেহের চাহিদাগুলোকে পরিচর্যা করা হয়, অর্থাৎ চাহিদাগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে পূরণ করতে হয়। এবার দেহ সুবোধ-সুশীল অনুগত ছেলের মতো রুহের কথা শোনে।

রমজানে একমাস আমাদের কৃচ্ছ্রতা পালন করতে হয় দেহের চাহিদাগুলো অস্বীকার করে। এরপরে রমজান শেষে পুনরায় অনুমতি দেওয়া হয় দিনের বেলা দেহের চাহিদা পূরণের। এই যে দেহকে বিরত রাখ বা দেহের চাহিদাগুলোকে দমন করার প্রক্রিয়া, তার সুফল কোন ধরনের হবে, একটি সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন মওলানা। কেউ যদি জানে যে, ভাঙা পুরোনো বাড়ির দেয়ালের নিচে গুপ্তধন আছে, তখন কী করা হবে? যে কেউ পরামর্শ দেবে যে, পুরোনো বাড়িটি ভেঙে গুপ্তধন উদ্ধার করতে হবে। গুপ্তধনের অগাধ সম্পদ হস্তগত হলে পর সে সম্পদ দিয়ে বাড়িটা পুনঃনির্মাণ করা যাবে। এ প্রসঙ্গে মওলানা বলছেন—

কার্দ ওয়েইরা'ন, খা'নে বাহ্রে গাঞ্জে যার

ওয়ায্ হামা'ন গাঞ্জাশ কুনাদ মা-মূর তার

৩০৭. স্বর্ণের গুপ্তধন পাবার জন্যে ঘরটি ভেঙে ফেলল

সেই ধনরত্ন দিয়ে আরও জমকালো বাড়ি বানাল।

কাজেই সব ধ্বংস ক্ষতিকর নয়। নতুনকে নির্মাণের জন্য পুরাতনকে ভাঙতে হয়। আত্মার সৌধ নির্মাণের জন্য দেহের জরাজীর্ণ বাড়ি ভাঙতে হয়। আরও উপমা—

আ'বরা' বুব্রীদ ও জও রা' পা'ক কার্দ

বা-দ আযা'ন দার জও, রওয়া'ন কার্দ আ'বে খোর্দ

৩০৮. পানি সেঁচে ফেলে দিল, কুয়া পরিষ্কার করল

এরপর খাবার পানি কুয়ায় প্রবাহিত করল।

হাজামজা কূয়া থেকে স্বচ্ছ খাবার পানি পেতে হলে প্রথমে বাইরের পানি ঢোকার নালা ও ছিদ্রগুলো বন্ধ করতে হবে। এরপর ভেতরের পচা পানি সেঁচে ফেলে দিতে হবে। তারপর আবর্জনা আর কাদা পানি খনন করে বাইরে নিক্ষেপ করতে হবে। এরপরই কূয়ার ভেতরে পাতাল থেকে স্বচ্ছ নির্মল সুপেয় পানি উৎলে উঠবে। এবার কূয়ার নালা খুলে দিলে অন্যরাও তা থেকে উপকৃত হবে। কাজেই আত্মার পাতাল থেকে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ পাবার জন্যে প্রথমে লোভ-লালসার নালা ও পথ বন্ধ করে খননকার্য চালাতে হবে। ভাঙা ও গড়ার এই সাধনার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করানোর জন্যে মওলানা রুমি (রহ.) আরও উদাহরণ, উপমা উল্লেখ করছেন :

পূস্ত রা' বেশ্কা'ফ্ত্ ও পয়কা'ন রা' কশীদ

পূস্তে তা'যে বা-দ আয্ আ'নাশ বার দামীদ

৩০৯. তীরের ফলা শরীরে বিদ্ধ হলে চামড়া ফেঁড়ে টেনে বের করা হয়,

যাতে পরবর্তীতে সে স্থানে নতুন চামড়ার উদ্ভব হয়।

নফসের শুদ্ধি ও কৃচ্ছ্রতা, চামড়া কেটে তীরের ফলা বের করার মতো কষ্টকর হলেও তার কোনো বিকল্প নেই। তা না করে কোনো উপায় নেই। আরও একটি উপমা—

কেলএ ওয়েইরা'ন কার্দ ও আয্ কা'ফের সাতাদ

বা-দ আযা'ন বার সা'খ্তাশ সাদ বোর্জ-ও-সাদ

৩১০. দুর্গ ভেঙে বিরান করে কাফেরদের কাছ থেকে উদ্ধার করল

এরপর শত গম্বুজ, সৌধ ও প্রাচীরে দুর্গ পুনঃনির্মাণ করল।

নতুনকে নির্মাণ করতে হলে পুরাতনকে ভাঙতে হবে। কাজেই আত্মার উৎকর্ষতার জন্য দেহের চাহিদাকে পর্যুদস্ত করতে হবে। দেহের প্রাচীর ভেঙে আত্মার সৌধমালা নির্মাণের এ শিক্ষা সম্পর্কে মাওলানা আশরাফ আলি থানবি (রহ.)-এর মূল্যায়ন হচ্ছে, 'এই কৃচ্ছ্র সাধনার মানে দেহকে ভেঙ্গে ফেলা বা খাওয়া-পরা, বিশ্রাম প্রভৃতি দেহের অনিবার্য দাবি ও হককে অস্বীকার করা নয়; বরং লোভ-লালসা ও ভোগের লাগামহীন চাহিদা পরিহার করা।' দেহের মৌলিক চাহিদাকে অস্বীকার বা অবজ্ঞা করার জন্য পীর-মুর্শিদ নির্দেশ দিলেও তা হবে সাময়িক এবং প্রস্তুতিমূলক।

আত্মনিয়ন্ত্রণের এই শিক্ষা বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। নফসের শুদ্ধি ও পবিত্রতার জন্য তো এর কোনো বিকল্প নেই। প্রাণী হিসাবে, মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে সবাই সমান হলেও মানুষের অন্তরের অবস্থার নিরিখেই মানুষ ভালো না মন্দ, সফল না ব্যর্থ তা নির্ণিত হয়। আল্লাহ ইরশাদ করেন— 'সে সফলকাম হবে, যে তার নিজকে পবিত্র করেছে আর ওই ব্যক্তি ব্যর্থ হবে, যে নিজকে কলুষিত করবে।' (সুরা শামস : ৯ ও ১০)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) ও হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে, যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) উপরোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করতেন তখন উচ্চস্বরে এ দোয়া পড়তেন— 'হে আল্লাহ, আমার নফসকে তাকওয়া দান কর, আর তাকে শুদ্ধ কর, তুমিই তার সর্বোত্তম সংশোধনকারী তুমিই তার অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক।' (সহিহ মুসলিম)।

 

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)।