মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহ.)-এর মসনবি শরিফ

খ্রিষ্টান নিধনে ইহুদি বাদশাহর পাতানো ফাঁদ

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মসনবি শরিফ প্রথম খণ্ডের তৃতীয় গল্প এক ধর্মান্ধ ইহুদি বাদশাহকে নিয়ে। ধর্মান্ধ ইহুদি বাদশাহ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে হত্যার জন্য কী সুদূর প্রসারী জঘন্য চক্রান্ত করেছিল তার বিবরণ দিয়েছেন মওলানা রুমি (রহ.) তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে। গল্পটি দৃশ্যত সাদামাটা; কিন্তু এর আবেদন অনেক গভীর ও ব্যাপক। বিশেষত গল্পের পরতে পরতে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষাসমূহ মানুষের মন, জীবন ও চিন্তাকে আলোকিত করতে অতুলনীয়।

আগের মুদির দোকানি ও তোতা পাখির গল্পের শেষ ভাগে প্রতারক ভণ্ডপীরদের ব্যাপারে মওলানা সতর্ক করেছিলেন। ধর্মান্ধ ভণ্ড-প্রতারক মানব জাতির জন্য কত বিপজ্জনক হতে পারে, তার বিবরণ এই কাহিনি।

মওলানা রুমি যে সমাজে বসবাস করছিলেন তার চারপাশে এক বিষাক্ত পরিবেশ বিরাজমান ছিল। পূর্বদিকে হালাকু খাঁর বাহিনী মোঙ্গল তাতারীদের লুটতরাজের বিভীষিকার আতঙ্ক। পশ্চিমে খ্রিষ্টান জগতের পরিচালিত ক্রসেড যুদ্ধের উন্মত্ততার রেশ। মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরেও চলছিল ফেরকাগত হানাহানি; রক্তপাত। মানব সমাজের এহেন বিপর্যয়ের স্রোতকে রোধ করতে বা পাল্টে দিতে প্রয়োজন এমন এক বিশ্ব দর্শনের, যার মাধ্যমে মানুষে মানুষে ঐক্য ও বন্ধুত্বের রাজপথ রচনা সম্ভব। তাই মওলানা এখানে যুক্তি ও হৃদয়ের আর্তি দিয়ে তুলে ধরেছেন জগতের মহাপুরুষ নবী-রাসুল (সা.) ও অলি-আল্লাহদের মধ্যকার ঐক্য, একাত্মতা ও অভিন্নতার চিরন্তন বাণী। মওলানা দেখিয়েছেন, মানব সমাজে অনৈক্য হানাহানির মূল কারণ ধর্মান্ধ সমাজপতিদের চক্রান্ত। বর্ণচোরা ধর্মপুরুষরা কত জঘন্যভাবে মানব সমাজে রক্তক্ষয়ী হানাহানি লাগিয়ে দিতে পারে, তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছেন তাদের খপ্পর থেকে বাঁচবার জন্য। আমাদের মতে গল্পের এই আবেদন কালজয়ী এবং তার শিক্ষা গোটা মানব সমাজের জন্য সৌভাগ্যের জিয়নকাঠি।

আমরা প্রথমে গল্পটির সংক্ষিপ্ত চিত্র দেখার চেষ্টা করব, এরপর গল্পের ছলে যে অমূল্য শিক্ষা ও উপদেশ মাওলানা রুমি মানবজাতির সামনে পেশ করেছেন তার অন্তহীন প্রান্তরে বিচরণ করার চেষ্টা করব। কাহিনিসংক্ষেপ— এক ইহুদি বাদশাহ খ্রিষ্টানদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালাচ্ছিল। তার লক্ষ্য ছিল, খ্রিষ্টান ধর্মের শিকড় উপড়ে ফেলা। বাদশাহ একদিন তার মন্ত্রীকে চক্রান্তের নীল-নকশা তৈরির নির্দেশ দিল। মন্ত্রী তখন নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের পরামর্শ দিল। বলল, আপনি আমার নাক-কান কেটে রাজ-দরবার থেকে বিতাড়িত করবেন। আমি তখন খ্রিষ্টানদের কাছে আশ্রয় নিয়ে আমার গোপন নীল-নকশা কার্যকর করব। প্রস্তাবটি বাদশাহর পছন্দ হলো। পরিকল্পনা মাফিক কাজ হলো। মন্ত্রী খ্রিষ্টান সমাজের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইল। বলল, আমি গোপনে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত ছিলাম, এ কারণে বাদশাহ আমাকে এমন নৃশংস শাস্তি দিয়ে বিতাড়িত করেছে। খ্রিষ্টানরা তার কথায় বিশ্বাস করে তাকে বরণ করে নিল। মন্ত্রী খুব দ্রুত ও অনায়াসে খ্রিষ্টানদের মাঝে তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলো। সবাই এখন তাকে জিন্দা শহীদ ও আসমানী শিক্ষক হিসেবে মান্য করতে লাগলো। অবশ্য গুটি কতক লোক তার বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি টের পেয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ লোকই তার ধোঁকায় পতিত হলো।

খ্রিষ্টানরা ১২টি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য একজন ধর্মগুরু পাদ্রী ছিল। মন্ত্রী গোপনে প্রত্যেক ধর্মগুরুকে একটি করে নিয়োগপত্র দিল এবং সাথে কিছু ধর্মোপদেশও দিল। মন্ত্রী কাজটি খুব বিচক্ষণতার সাথে করল, প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন এবং পরস্পর বিরোধী উপদেশ দিল। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপদেশনামায় রোযা পালনের কথা, আরেকটিতে অন্য কোনো সৎকর্মের নির্দেশ। বারজন ধর্মগুরুকে ভিন্ন ভিন্ন উপদেশনামা দেয়ার পর মন্ত্রী গুহার নির্জনতায় চলে গেল। অনুসারীরা যতই অনুনয় বিনয় করলো মন্ত্রীর মায়া হলো না, তাদের আদেশ-উপদেশ দেয়ার জন্য গুহার বাইরে আসল না। এরপর বারজন ধর্মগুরুকে কাছে ডেকে নিয়ে প্রত্যেককে পৃথকভাবে গোপনে তালিম দিল। প্রত্যেককে বলল, তুমিই আমার স্থলাভিষিক্ত, একমাত্র খলিফা। গোপনে তাদের প্রত্যেকের হাতে পৃথক খিলাফতনামা তুলে দিয়ে বলল, এই নীতিমালা অনুযায়ী চলবে, লোকদের উপদেশ দেবে, তুমিই আমার পক্ষ হতে খ্রিষ্টানদের নেতা। অন্য কেউ নেতৃত্বের দাবিদার হলে তার দফা রফা করবে। ১২ জন পাদ্রীর হাতে খিলাফতনামা প্রদানের পর নির্জনতার মধ্যে মন্ত্রী আত্মহত্যা করে। পরে শুরু হয় সংঘাত। প্রত্যেক ধর্মগুরু বলে, আমিই মন্ত্রী পীরের খলিফা। আমিই খ্রিষ্টান সমাজের একমাত্র নেতা। এভাবে মন্ত্রীর নীল-নকশামাফিক খ্রিষ্টানরা পরস্পরের চিরশত্রু হয়ে বারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে রক্তপাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

তবে এই নীল-নকশা সবাইকে চক্রান্ত জালে আবদ্ধ করতে পারেনি। কারণ, একদল মোমিন আখেরি নবী মুহাম্মদ (সা)-এর তরিকা অনুসরণ করে, যার উল্লেখ তওরাতে ছিল। এর বদৌলতে তারা এই ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রেহাই পায়।

মাওলানা রুমির (রহ.) বিশ্লেষণের ধারাভাষ্য

গল্পটির ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। গবেষকরা ইতিহাস থেকে দু'একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা উল্লেখ করে গল্পটির ঐতিহাসিক ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, গল্পের কাঠামো ও আঙ্গিক মওলানা রূমীর নিজস্ব। মূলত গল্পের ছলে যে শিক্ষা ও তত্ত্বকথা বিবৃত হয়েছে তা-ই মুখ্য, আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। মাওলানার জবানিতে গল্পটির বিবরণ নিম্নরূপ—

এক ইহুদি বাদশাহ ছিল অত্যন্ত জালিম প্রকৃতির, খ্রিষ্টানবিরোধী, এমনকি খ্রিষ্টানদের রক্ত পিপাসু। হজরত মুসা (আ.) ও ইসা (আ.) ছিলেন আত্মিক দিক থেকে এক ও অভিন্ন। উভয়ে আল্লাহর নবী, একই বাণী নিয়ে দুনিয়াতে এসেছিলেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। কিন্তু এই জালিম বাদশাহ গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার কারণে উভয় নবীকে পরস্পরের বিরোধী বলে ভাবত। আসলে গোঁড়ামি ও পক্ষপাতিত্বের স্বভাবটাই হলো, মানুষের দৃষ্টিশক্তিকে বিভ্রান্ত করা।

গল্পের ধারাবাহিকতায় মাওলানা এখানে এক উস্তাদ ও তার টেরাচোখ সাগরেদের গল্পের অবতারণা করেন এবং উপসংহার টানেন যে, বাদশাহও পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে সত্যকে চেনার ক্ষেত্রে মস্তবড় ভুলের শিকার হয় আর ইহুদী ধর্মের পক্ষপাতিত্বের নামে অগণিত নিরীহ নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটায়।

বাদশাহর এক চতুর মন্ত্রী ছিল। সে জানত যে, মানুষের আকিদা ও বিশ্বাস জোর জবরদস্তি করে বদলানো যায় না; বরং যতই চাপ প্রয়োগ করা হয়, আকিদা ও বিশ্বাস আরও জোরদার হয়। মজলূম মানুষের মাঝে এর আবেদন ব্যাপকতা লাভ করে, অধিকহারে মানুষ সেই ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এসব চিন্তা করে মন্ত্রী বাদশাহকে একটি প্রস্তাবে রাজি করায়। প্রস্তাবটি ছিল, বাদশাহ মন্ত্রীর হাত, কান ও নাক কেটে দেবে এবং রাজদরবার থেকে বহিষ্কার করবে আর প্রচার করবে যে, এই মন্ত্রী আসলে খ্রিষ্টান, গোপনে খ্রিষ্টান ধর্মের চর্চা করেছে। খ্রিষ্টানদের গুপ্তচর ছিল। উদ্দেশ্য, খ্রিষ্টানদের কাছে মন্ত্রীকে গ্রহণযোগ্য করানো এবং খ্রিষ্টান জনগণের মনে মন্ত্রীর ভালবাসা সৃষ্টি করা।

বাদশাহ পরিকল্পনা মাফিক কাজ করলেন। ফলে অচিরেই মন্ত্রী খ্রিষ্টান জনগণের মাঝে ব্যাপক সমর্থন পেল। পঙ্গু অবস্থায় অধিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সে মিশনারী তৎপরতা শুরু করল। সাধারণ মানুষ তার প্রতি একযোগে ঝুঁকে পড়ল। মন্ত্রী ইঞ্জীল কিতাবের নানা তত্ত্ব-রহস্য ও খ্রিষ্টান ধর্মের নীতি-নিয়ম মানুষকে তালিম দিতে লাগল। তার কথাবার্তা বাহ্যত ছিল ওয়াজ-নসিহত ও উপদেশ মিশ্রিত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুমরাহী ও বিভ্রান্তিতে ভরা। মানব দেহের অভ্যন্তরে নফসের অবস্থাও তাই। মানুষের অভ্যন্তরে যে নফস, অনেক সময় সে সাধককে কৃচ্ছ সাধনা ও অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগীর উৎসাহ দেয়। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য থাকে সাধকের মনে অহংকার ও গাফিলতি সৃষ্টি করা অথবা বাহ্যিক ইবাদত বন্দেগীতে জীবনটা কাটিয়ে দিতে প্ররোচিত করা। এ জন্যেই হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) নবীজির (সা.) কাছে মুনাফিকীর আলামত জিজ্ঞেস করতেন। ঈমানের পথে বিপদ কোথায় কোথায় আছে, সবসময় জানতে চাইতেন।

মন্ত্রীর ধোঁকা প্রতারণা এবং সাধারণ মানুষের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি মাওলানা রুমির অন্তরকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। তার হৃদয়-মনকে প্রকম্পিত করে তোলে। কারণ তিনি জানেন যে, মানুষ কতই না দুর্বল। কথায় কথায় সে ভুল করে বসে। কত শক্তিশালী সাধক পুরুষই না জানা-অজানা অনেক কারণে বিভ্রান্ত হয়েছেন। পদস্খলিত হয়ে গুমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছেন। মানুষ শত তাকওয়ার গুণ ও বিচক্ষণতা থাকা সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ উপাদানের প্রভাব তথা নফসের ধোঁকা থেকে বাঁচতে পারে না; যদি না স্বয়ং আল্লাহ্ তাকে রক্ষা করেন। এ কারণেই মওলানা এখন আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ জানান। এই দোয়ার ফাঁকে তিনি নফসের ধোঁকার একটি কৌশল এবং ইবাদত-বন্দেগি ও মানুষের রুহের ওপর তার প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া কোন ধরনের হতে পারে, তার বর্ণনা দেন। নফসকে তিনি তুলনা করেন এমন ইঁদুরের সাথে, যে গমের গোলার নিচে গর্ত করে শস্যগুলো নীরবে উজাড় করে ফেলছে। মওলানার চিন্তায় নফস এমন এক চোর, যে রাতের আঁধারে সিঁদ কেটে গৃহস্থের বাড়িতে ঢোকেছে। গৃহস্থ কিসের আভাস পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে পাথরে পাথর ঘষে চেরাগে আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করছে। ওদিকে চোর হাত দিয়ে গৃহস্থের অজান্তে বার বার সে আগুন নিভিয়ে দিচ্ছে। কাজেই এই নফসের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্যে আবারো আল্লাহ্র দরবারে ফরিয়াদ জানান।

এ পর্যায়ে এসে মওলানা মানুষের স্বপ্ন এবং স্বপ্নের অবস্থায় সব ধরনের দায়িত্ব ও ঝামেলা হতে মুক্তি ও প্রশান্তির কথা উল্লেখ করেন। এখানে এসে তিনি সাধকের আল্লাহ্তে ফানা ও বিলীন হওয়ার অবস্থাকে স্বপ্নের সাথে উপমা দেন। কারণ ঘুমের সময় বান্দা একান্ত আল্লাহ্র নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নিজের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তিনি এখানে আসহাবে কাহফের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তবে মওলানার দৃষ্টিতে আসহাবে কাহফ সেই সুনির্দিষ্ট কয়েক ব্যক্তি নন, যাদের বর্ণনা কুরআন মজিদের সুরা কাহাফ ও বিভিন্ন রিওয়ায়াত সূত্রে এসেছে। মওলানার মতে তারা প্রত্যেক যুগেই আছেন। যদিও স্থুলদর্শী অপরিপক্ক মানুষের দৃষ্টি তাদের উপলব্ধি করতে পারে না।

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন CHAYAPATH PROKASHONI)