আজ ভারতকে হারালেই বাংলাদেশের ‘হ্যাটট্রিক’
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৬, ১১:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে বিশ্বকাপ উন্মাদনায় মেতে আছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বাড়ির ছাদে, গাছের চূড়ায়, সড়কের ধারে নিজ নিজ পছন্দের দেশের পতাকা লাগিয়ে তার জানান দিচ্ছেন সমর্থকরা। তবে বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকদের মাথায় আরেকটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। আজ ফাইনালে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়ের মিশনের সফল সমাপ্তি টানতে চায় লাল সবুজের মেয়েরা।
বাংলাদেশ টানা দু’বার সাফ চ্যাম্পিয়ন। ভারতের আধিপত্য গুঁড়িয়ে ২০২২ সালে প্রথম শিরোপা জয়, ২০২৪ সালে সেই মুকুট ধরে রাখার কীর্তি, সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সামনে এবার টানা তৃতীয়বার সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের হাতছানি। অধিনায়ক মারিয়া মান্দা জানেন, এমন সুযোগ আসবে না বারবার। তাই সামর্থ্যের সবটা দিয়ে ভারতের বিপক্ষে লড়তে চান তিনি ও তার দল।
শনিবার (৬ জুন) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টায় গোয়ার জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে শুরু হবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ এই প্রতিযোগিতায় রেকর্ড পাঁচ ট্রফির সবশেষটি ভারত জিতেছিল ২০১৯ সালে।
এবার গ্রুপ পর্বের দেখায় সাফে বাংলাদেশের ১০ ম্যাচের অজেয় যাত্রার ইতি টেনেছে ভারত। ৩-০ গোলে মারিয়া-আফঈদাদের উড়িয়ে মানসিকভাবেও এগিয়ে তারা। নেপালকে সেমি-ফাইনালে হারিয়ে নানা প্রতিকূলতায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ অবশ্য গুছিয়ে নিয়েছে অনেকটা। গতকাল শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে মারিয়ার কণ্ঠে তাই প্রতিপক্ষের প্রতি সমীহ থাকলেও, নিজ দল নিয়ে ঝরল আত্মবিশ্বাস। ‘আমরা জানি, ভারত অনেক শক্তিশালী, তো আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি। আগের ম্যাচগুলোতে যে ভুলগুলো করেছি, আজকের দিনটা ছিল সেগুলো শুধরে নেওয়ার। আমরা সেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি, আমরা লড়াই করব। অধিনায়ক ও খেলোয়াড় হিসেবে খুব (রোমাঞ্চ কাজ করছে) মনের ভিতরে; কেননা, শিরোপা জয়ের সুযোগ পেয়েছি আবার।’
বাংলাদেশ দলপতি বলেন, ‘বিগত দিনে, আমরা দুইটা সাফ জিতেছি; তৃতীয়বারের মতো সুযোগ এসেছে। সবসময় তো আর এমন সুযোগ থাকে না। সুযোগটা পেয়েছি, এটা কাজে লাগানোর জন্যই আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এসেছি, পরিশ্রম করে এসেছি। তো অবশ্যই ফাইনালে আমরা যেন দেশবাসীকে কিছু দিতে পারি, ভালো খেলা উপহার দিতে পারি, সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে আমরা লড়াই করব।’ নেপালের বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে সেরা ছন্দে ছিল না বাংলাদেশ। শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পর, ঋতুপর্ণা চাকমার অলিম্পিক গোলে সমতায় ফিরে দল। পরে যোগ করা সময়ে প্রীতি রায়ের আত্মঘাতী গোলে জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের। মারিয়া বললেন, নেপাল ম্যাচের জয়ে দলের অন্দরে এখন বইছে আত্মবিশ্বাসের ফল্গুধারা। ‘প্রত্যেকটা ম্যাচই খুব গুরুত্বপূর্ণ; ম্যাচে অনেক সময় পারফরম্যান্স ভালো বা খারাপ হয়ে যায়, আমরা হেরে যায়। আমাদের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করেই সবকিছু হয়। ভারতের বিপক্ষে হারের পর নেপালের বিপক্ষে আমরা জিতেছি, এটা আমাদের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট। সেমি-ফাইনালে জিতে যে ফাইনালে আসতে পেরেছি, এটা আমাদের জন্য বড় কিছু এবং এতে করে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে আরও।’
শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিতে গতকাল শুক্রবার সকালে ব্যাম্বোলিম অ্যাথলেটিক ক্লাব মাঠে অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ। চারদিকে নানা মানুষের আনাগোনা, কারো কারো ক্যামেরা হাতে মাঠে ঢুকে পড়া, নিরাপত্তার বালাই না থাকাণ্ড এসব নিয়ে ফাইনালের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এসে শুরুতে ক্ষোভ উগরে দিলেন বাটলার। ‘আসলে, অসাধারণ বা ব্যতিক্রমী কিছুই নয়; সকালে আমরা কেবল একটা হালকা সেশন করেছি। গতকাল একটা ভিডিও অ্যানালাইসিস করেছি এবং আগামীকাল সকালে আরেকটি করার পরিকল্পনা আছে। তবে, আমরা মূলত এখানকার পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আজ সকালে আমাদের একটা পাবলিক স্টেডিয়ামে, উন্মুক্ত মাঠে অনুশীলন করতে হয়েছে, যা মোটেও আদর্শ ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘দেখুন, আসলে কাউকে ওভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; ওই লোকটা ক্যামেরা নিয়ে মাঠে চলে এসেছিল এবং আমি খেয়াল করেছি, সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ম্যাচের ভিডিও করছিল, যা আমার কাছে একটু সস্তা মানসিকতার মনে হয়েছে। উন্মুক্ত বা পাবলিক স্টেডিয়াম হলে মানুষকে ভেতরে আসা থেকে আটকানো কঠিন। সম্ভবত সাফের উচিত নয়, ফাইনালের প্রস্তুতির জন্য পাবলিক স্টেডিয়াম বুক করা। এটি তাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। ওই লোকটাকে সরাসরি মাঠে হেঁটে আসতে দেওয়াটা ভুল ছিল। যেকোনো কিছু ঘটতে পারত। আমরা জানি না, সে কে ছিল। তবে, আমার মনে হয়েছে, এটি ভুল এবং বিপজ্জনক ছিল।’ প্রস্তুতি কিছুটা বিঘ্ন হলেও, প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিয়েছেন বাটলার। চলতি আসরে প্রতিপক্ষের জালে ১৫ গোল দিয়ে নিজেদের পোস্ট অক্ষত রাখা ভারতের শক্তিশালী আক্রমণভাগ, নিজেদের ফিনিশিংয়ের দুর্বলতা, বিগত ম্যাচগুলোতে রক্ষণের মাঝেমধ্যে এলোমেলো হয়ে পড়া- সবকিছু নিয়ে কাজ সেরে নিয়েছেন তিনি।
এছাড়া, শিউলি আজিমের মায়ের মৃত্যুতে মানসিকভাবে মুষড়ে পড়া দল সেমি-ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে জিতে ফিরে পেতে শুরু করেছে আত্মবিশ্বাস। সাদামাটা ফুটবলের বৃত্ত ভেঙে নেপাল ম্যাচের শেষ পাঁচ মিনিটে আগ্রাসী ফুটবলের পসরা মেলেছিলেন রিপা-সাগরিকারা। প্রশংসা পেয়েছিলেন প্রতিপক্ষ কোচেরও। তা থেকেও অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন মারিয়া-আফঈদারা। সব মিলিয়ে ফাইনাল ভিন্ন এক ম্যাচ হতে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে বাটলারের। ‘দেখুন, মাঠের ভেতরে-বাইরে আমাদের সমস্যা ছিল, চোট ছিল-তারপরও আমরা এমন ফলাফল বের করে এনেছি, যেখানে সবাই আমাদের নিয়ে আশাবাদী। অথচ অনেকেই চান, আমরা হেরে যাই। আমি বরং গ্লাসটি অর্ধেক খালি না দেখে, অর্ধেক পূর্ণ দেখার মতো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে চলি এবং পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী থাকি। আমরা ফাইনালে উঠেছি; আমরা সেখানে দারুণ ফুটবল খেলে এসেছি নাকি জঘন্য ফুটবল খেলে এসেছি, তা কোনো ব্যাপার নয়। আমরা ফাইনালে আছি।’
বাটলার বলেন, ‘মেয়েরা অসাধারণ মানসিকতা ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিমত্তা দেখিয়েছে এবং এটাই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর আগামীকাল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিস্থিতি। ভারতের কাছে আমরা যে আগের ম্যাচটি হেরেছিলাম, সেটার সাথে এই ম্যাচের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, সেমি-ফাইনাল বা ফাইনালে পথচলায় সেরা দলগুলো যে সবসময় তাদের সেরা ফুটবলটা খেলে, তা কিন্তু নয়। এখানে মূল বিষয় হলো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা, কাঙ্ক্ষিত ফলাফলটা তুলে নেওয়া।’
