আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির প্রাসঙ্গিকতা

শাহেদ শুভ্র হোসেন
| সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর। শিক্ষিতের হার বেড়েছে। প্রত্যেক বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রবেশ করছে চাকরির বাজারে। কিন্তু সে অনুযায়ী কর্ম খালি না থাকায় চাকরি পাচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন। একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ পাস করে চাকরি খুঁজতে খুঁজতেই তার ৩০ বছর পেরিয়ে যায়। ৩০ বছর হয়ে গেলে তখন সে সরকারি চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। অথচ তার অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রকে অনেক কিছু দেওয়ার বাকি ছিল। ৩০ বছরের মাধ্যমে একজন তরুণকে বেঁধে ফেলা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট গ-ির ভেতরে। হয় তুমি ৩০ বছরের ভেতর চাকরি পাবে না হলে তুমি বাতিল হয়ে যাবে। অথচ ৩০ বছরের মধ্যে সরকারি চাকরি না পাওয়া একজন তরুণকে মুখোমুখি হতে হয় নির্মম বাস্তবতার। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সে হয়ে ওঠে অবহেলার পাত্র। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো মানে চাকরি দেওয়া নয়; বরং একটি শেষ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের নতুন করে শুরু। 
দেশের যুবনীতিতে যুবকদের বয়স যেহেতু ১৮ থেকে ৩৫, তাই সরকারি চাকরিতে প্রবশের বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিটা অযৌক্তিক কিছু নয়। পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। কোনো কোনো দেশে অবসরের আগের দিন পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, বিভিন্ন প্রদেশে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০, শ্রীলঙ্কায় ৪৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫, ইতালিতে ৩৫ বছর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৮, ফ্রান্সে ৪০, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ এবং সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। আফ্রিকায় চাকরি প্রার্থীদের বয়স বাংলাদেশের সরকারি চাকরির মতো সীমাবদ্ধ নেই। অর্থাৎ চাকরিপ্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যে-কোনো বয়সে আবেদন করা যায়। রাশিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যে যোগ্যতা থাকলে অবসরের আগের দিনও যে-কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল গভর্নমেন্ট ও স্টেট গভর্নমেন্ট উভয় ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়।
দেশের মানুষের গড় আয়ু যখন ৪৫ ছিল, তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭। যখন গড় আয়ু ৫০ ছাড়াল, তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা করা হলো ৩০ বছর। বর্তমানে যখন দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর, তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স অবশ্যই বাড়ানো উচিত?
চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছর; এ গ-ি, এ দেয়াল, এ সীমানা প্রাচীর অবরুদ্ধ করে রেখেছে বাংলাদেশের লাখ-কোটি ছাত্রসমাজকে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্পিকার থাকা অবস্থায় ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি মহান জাতীয় সংসদে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে যুবসমাজ আশার আলো দেখে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ২১তম বৈঠকে ৩২ বছর করার সুপারিশ করে। নবম জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে ৩৫ বছরের প্রস্তাবটি প্রথম প্রস্তাব হিসেবে গৃহীত হয় এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের জুন মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার সুপারিশ করে। কিন্তু বারবার এ ধরনের উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা আর সফল হয়নি। 
স্বাধীনতার পর সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা করা হয় ৫৭ বছর। দেশের মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ২০১১ সালের ২৬ ডিসেম্বরে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৫৯ বছরে উন্নীত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করা হয়। এছাড়া বিচারপতিদের ৬৫ থেকে ৬৭ বছর এবং বৈজ্ঞানিকদের ৫৯ থেকে ৬৭ বছর করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ সিদ্ধান্ত প্রশংসিত; কিন্তু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমার কোনো পরিবর্তন আজও হয়নি। এখনও তা আগের মতো ৩০ বছরেই রয়ে গেছে। বয়সসীমা অবসরের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি হলেও প্রবেশে বয়সসীমা বৃদ্ধি পায়নি। সংগত কারণেই এখন প্রশ্ন উঠেছে, চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নিয়ে। 
চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি করলে একজন তরুণ যেমন উপকৃত হবে, তেমনি দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হবে অনেকাংশে। একজন তরুণ তখন নিজের একাডেমিক পড়ালেখাকে গুরুত্ব দিতে পারবে, আবার চাকরির পড়াশোনাতেও সময় পাবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধি মানে কারও কাছে চাকরি চাওয়া নয়; বরং তার যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনাকে আবার জাগিয়ে তোলা। ঠিক যেন গল্পের সেই ফিনিক্স পাখির মতো এ দেশের হাজার হাজার তরুণ ফিরে পাবে নতুন শক্তি, নতুন প্রেরণা। 

শিক্ষক ও গবেষক
[email protected]