আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চারগুণ খাদ্য উৎপাদন : কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হোক

ইফতেখার আহমেদ টিপু
| সম্পাদকীয়

স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। স্বাধীনতার বছরে ধান, আলু ও গম মিলিয়ে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য উৎপাদিত খাদ্যের এ পরিমাণ ছিল অপর্যাপ্ত। সাড়ে চার দশক পর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ধান, গম ও আলুর উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৫৩ লাখ টন। ধান, আলু, গম মিলিয়ে খাদ্য উৎপাদন চারগুণ বাড়ায় খাদ্যাভাবের দেশ হিসেবে শত শত বছর ধরে যে লজ্জা বাংলাদেশকে বহন করতে হতো তা অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। 
স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি থেকে বেড়ে ১৭ কোটিতে পৌঁছেছে। জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্য উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষুধা থেকে মুক্তি পেয়েছে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা পাড়ের মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭০-৭১ সালে দেশে ৯৯ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। মোট ধান উৎপাদন হয় ১ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার টন। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১ দশমিক শূন্য ৯৬ টন ধান উৎপাদন হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১১৪ লাখ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার টন। প্রতি হেক্টরে গড়ে উৎপাদন ৩ দশমিক শূন্য ৪১ টন। স্বাধীনতার বছর দেশে মাত্র ২ লাখ ৫৯ হাজার হেক্টর জমিতে ৮ লাখ ৪৯ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয় ৩ দশমিক ২৮ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৯ দশমিক ৬৪ টন করে মোট আলু উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯২ লাখ ৫৪ হাজার টনে। স্বাধীনতার বছর দেশে ১ লাখ ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়। উৎপাদন হয় ১ লাখ টন। প্রতি হেক্টরে ৮৭০ কেজি করে গম উৎপাদন হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সারা দেশে ৪ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে গমের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩ টন করে মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টন। 
স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের মানুষের গড় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। এ সময় যে দেশের বেশিরভাগ মানুষ ছিল হাড্ডিসার, তাদের দৈহিক গঠনে পরিবর্তন এসেছে। এ সাফল্য সম্ভব হয়েছে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের সুফল হিসেবে। কৃষকের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত হয়েছে এ সাফল্য। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা ধরে রাখতে হলে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বের মধ্যে চতুর্থতম। আর মাছের রাজা ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা অন্য দেশের অনুসরণযোগ্য। এ বছর ইলিশের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। মাছে-ভাতে বাঙালিÑ এ পরিচয়টি হারিয়ে যেতে বসেছিল দেড় দশক আগে। গেল ১৫ বছরে বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণেরও অনেক বেশি। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের সামনে অপার সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি নানা সীমাবদ্ধতার জন্য। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে বিশ্বের দ্বিতীয় মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়। কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখা যায়নি প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, মিয়ানমার ও ভিয়েতনাম আরও দ্রুতগতিতে মাছ উৎপাদনে এগিয়ে যাওয়ার কারণে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) প্রতিবেদনে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়েছে। এ অগ্রগতির সব প্রশংসা মাছ চাষিদেরই প্রাপ্য। কারণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সরকারের পক্ষ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ করা হলেও তার মাত্র ১০ শতাংশ দেওয়া হয়েছে মাছ চাষিদের। সাগরে যারা মাছ ধরেন, তাদের যে কী প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে হয়, সে বিষয়টিও এখন সবার জানা। উপকূল এলাকাজুড়ে দেশি-বিদেশি জলদস্যুদের উৎপাত। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ট্রলার অনুপ্রবেশ করে মাছ ধরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশি মৎস্যজীবীরা তাদের কাছে অসহায়। বাঙালির পরিচয় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। মাছের প্রতি বাঙালির টান সেই প্রাচীন যুগেও আলোচ্য বিষয় বলে বিবেচিত হতো। মাত্র দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারের চেয়েও কম আয়তনের বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটিরও বেশি। নদনদী, খালবিল, পুকুরসহ জলাধারের সংখ্যা হ্রাস পেলেও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য উৎপাদন বিস্ময়করভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমান উৎপাদন ৩৭ লাখ টনেরও বেশি এবং তা চার বছরের মধ্যে ৪৫ ভাগ টনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাছ চাষিদের সুযোগসুবিধা দেওয়া হলে উৎপাদন এক দশকের মধ্যেই অন্তত দ্বিগুণ করা সম্ভব। 

সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক নবরাজ
চেয়ারম্যান ইফাদ গ্রুপ
[email protected]