আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বিভীষিকাময় ভর্তিযুদ্ধ

মাহবুব নাহিদ
| সম্পাদকীয়

উচ্চমাধ্যমিক পাস করেই ভর্তিযুদ্ধ নামক এক বিভীষিকার মুখে পড়তে হয় আমাদের। আমাদের দেশে যারা সবেমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শেষ করল তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এ ভর্তিযুদ্ধ। আর এ ভর্তিযুদ্ধে অনেকেই জয়ী হবে, অনেকেই হবে পরাজিত। এই বিভীষিকা পার হওয়ার যোগ্যতা থাকলেও অন্তত যে কয়জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায় তাদেরই সবার বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার সুযোগ থাকে না অর্থাৎ সেই পরিমাণ আসন নেই। এ পর্যায়ে এসে ছোটবেলা থেকে বুকের ভেতর বোনা সেই স্বপ্ন ‘যে ডাক্তার হব’, সেই স্বপ্ন প্রয়োজন আর পারিপার্শ্বিকতার মাঝে হারিয়ে যায়। তখন মনে হয় যা পাই তাতেই চলবে। নিজের ইচ্ছানুযায়ী সেক্টরে পড়ালেখা করতে পারে না দেশের অধিকাংশ ছাত্রই। আর মাত্র এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার এমসিকিউ পরীক্ষা দিয়ে কী পরিমাণ মেধার যাচাই হয়, তা নিয়ে আমি সন্দিহান! যদিও প্রশ্ন ফাঁস নামক এক অন্য বিভীষিকার নাম তো রয়েই গেছে।
এখন বিষয় হচ্ছে আসলেই কি ভর্তিযুদ্ধ উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর শুরু হয়? যারা মনে করে ভর্তির প্রস্তুতি উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর শুরু করবে তাদের জন্য এ ভর্তিযুদ্ধ বেশি কঠিন হয়ে যায়। আমরা এসএসসিতে যে পড়ালেখা করে থাকি তার চারগুণ পড়তে হয় এইচএসসিতে, সময়ও থাকে কম। মূলত উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময়টা ছাত্রজীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়েই অনেক ছাত্র ঝরে পড়ে। কলেজে ওঠার মজা, স্বাধীনতা পেয়ে অনেকেই এলোমেলো হয়ে যায়। অনেকেই উন্মুক্ত হতে গিয়ে একদম হারিয়ে যায়। যারা উচ্চমাধ্যমিক বই হাতে পাওয়ার পর থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে তারা প্রকৃত সফলকাম হয়। যদিও এমসিকিউ পরীক্ষা দিয়ে মান যাচাইয়ের বিপক্ষে অবস্থানের মানুষও অনেক। কিন্তু আসলেই যারা পড়াশোনা করবে তারা কোথাও না কোথাও পড়ার সুযোগ পাবেই। ভাগ্যের জোরে বা আচমকা দুই-একজন এদিক-ওদিক হয়; তবে এ ভর্তিযুদ্ধ অবশ্যই একটা যোগ্যতার লড়াই। আর আমরাও জানি, একটা মানুষের জন্য পরিবারই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। পরিবারের মা-বাবা যেভাবে তার সন্তানকে ছোটবেলা থেকে বড় করবেন, বড় হয়েও সন্তানের মাঝে তারই প্রতিফলন দেখা যাবে। ভর্তি পরীক্ষার আগে হঠাৎ করে প্রেসার দিলে কাজ হবে না। একটি সন্তানকে ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর ইচ্ছা ছোটবেলা থেকেই ধারণ করতে হবে। সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে আগাতে হবে, একবারে উঠতে গেলে একদম মুখ থুবড়ে পড়তে হবে। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের জন্য অনেক বড় একটা সমস্যা ডাক্তার হওয়ার দারুণ স্বপ্ন। জীবনের কোনো না কোনো সময় এ স্বপ্ন মনে হয় সবাই দেখে। ইঞ্জিনিয়ারের ক্ষেত্রেও কিছুটা তেমন হয়। তবে এর কিছু ক্ষতিকর দিক আছে। যারা শুধু মেডিকেলের জন্য প্রস্তুতি নেয় তাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা কঠিন হয়ে যায়। অর্থাৎ প্রত্যেককে আবেগে গা ভাসালে চলবে না। আমরা কেউই কিন্তু বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নই। আমাদের অবশ্যই বিকল্প রাস্তার কথা ভেবে রাখতে হবে। মানবিক বা বাণিজ্য বিভাগের জন্য এ ধরনের সমস্যা হয় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের দেশের সিটের অপ্রতুলতা। আমরা উচ্চমাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পাওয়া সবাইকে তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে পড়তে দিতে পারছি না। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ না-ও পেতে পারি, এমন ধারণা মনের মধ্যে রাখবে। অন্তত নিজের মনোবল সঠিক রাখতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে একটি কথা থাকবে, অনেকেই হয়তো মনে করে মেডিকেল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়তে পারলে বোধহয় পিছিয়ে পড়তে হয়। আসলে এমন ধারণা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা অত্যন্ত জরুরি। অনেকে মেডিকেলে পড়েও জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়; কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ভালো কিছু করে। আসলে মূল কথা হচ্ছে, যেখানেই ভর্তি হোন সেখানে যেন নিজেকে মেলে ধরা যায়। যে জায়গায় যাবে সেখানেই নিজেকে সেরা বানানোর চেষ্টা থাকতে হবে। হ্যাঁ এখন অবশ্য বিকল্প কিছু ভাবার সুযোগ নেই। এখন শুধুই সামনে তাকাতে হবে। কঠিন সময় আসবে, শক্ত হাতে তা মোকাবিলা করতে হবে। তবে বাস্তবতা মেনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথাও মাথায় রাখতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য শুভকামনা রইল। 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়