আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

অ ভি ম ত

দুর্বলতাকে পুঁজি করেই যে পেশা তাকে আদর্শ পেশা বলে না

সাঈদ চৌধুরী
| সম্পাদকীয়

মা-বাবা শঙ্কা নিয়ে হাসপাতালে গেলেন সন্তানকে ভালো ও সুস্থ করে ফিরিয়ে আনার জন্য। ডাক্তাররা মা-বাবার দুর্বলতাকে পুঁজি করে বসলেন। শিশুটির কিছুই হয়নি; তবু ডাক্তাররা বললেন, গুরুতর অসুস্থ। কিছুই হয়নি আমরা সাধারণরা বলতে পারি না, কারণ আমরা ডাক্তারি ভাষা বুঝি না। কিন্তু ডাক্তার যখন নিজেই বলেন, কিছু হয়নি; তবু বাচ্চাটিকে আটকিয়ে রাখ, ইনজেকশন দে, তারপর ছেড়ে দিসÑ এসব কথাবার্তা তখন কি আর তা ডাক্তারি আলোচনা বলে বিবেচিত হয়?
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এক সুস্থ শিশুকে অসুস্থ সাজিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে রাখার অভিযোগ ওঠে সম্প্রতি। সেই সঙ্গে সুস্থ শিশুকে অসুস্থ সাজিয়ে প্রতারণা করা দুই চিকিৎসকের কথোপকথনের অডিও ফাঁস হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে সারা দেশেই তোলপাড় হচ্ছে। মোবাইল ফোনের অডিও ফাঁস হওয়ার পর থেকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা! আলোকিত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিতও হয়েছে।
কিছুদিন আগে কিছু নির্মমতার বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম। সেখানকার তথ্যটি ছিল এমন যে, মাসের শেষে গার্মেন্ট শ্রমিক ও অন্যান্য পেশার নিম্ন আয়ের মানুষ ২০ তারিখের পর চিকিৎসাসেবা নিতে পারে না টাকার অভাবে। মাসের শেষ শুক্রবারে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় একেবারে ফাঁকা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলে তারা এ তথ্য দেন। যে দেশে এমন মানুষের বসবাস, সে দেশে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসাটা সত্যিই খুব হতাশার। 
একজন ডাক্তার রোগী দেখলেই টাকা পান, আর সেখানে একজন শ্রমিক মাসজুড়ে যে টাকা পান, তা দিয়ে তাদের খাবারই জোটে না! এ বিষয়টি গেল একটা দিক। আরেকটি দিক চিন্তা করুন। ছোট্ট একটি বাচ্চার যখন অসুখ হয়, তখন বাবা-মায়ের মনের অবস্থাটা কেমন থাকে, তা শুধু ওই বাবা-মা-ই জেনে থাকেন। ছোট মানুষ, কিছু বলতে পারে না, আর শুধু কাঁদে আর কাঁদে। তখন ছুটে যেতে হয় ডাক্তারের কাছে। সে ডাক্তার যদি বাবা-মাকে তখন আরও ভয় দেখিয়ে দেন, তবে এই অসহায় মানুষগুলোর সহায় আসলে কারা? 
এই যে মানুষটি ভোগান্তির শিকার হলো এ-ও নিম্নবিত্ত একজন মানুষ। যদি পর্যাপ্ত টাকা না থেকে থাকে তবে অবশ্যই অন্যজনের কাছ থেকে ধার করে এনে শিশুটির চিকিৎসা করতে হয়েছে! তার মানে আবার ঋণ আবার বোঝা! ডাক্তারদের কথোপকথনে যে ব্যাপারটি উঠে এসেছে, তা শুধু অমানবিকই নয়, অপরাধও। এ অপরাধের হয়তো অনেক বড় সাজা হবে না; তবে এ অপরাধটি সত্যিই আমাদের কাছে খুব হতাশাজনক। মানুষের দুর্বলতার জায়গাকে এভাবে পুঁজি করতে শিখে ফেলেছে কিছু অসাধু মানুষ! তবে মানুষ যাবে কোথায়, কার কাছে গিয়ে এর বিচার চাইবে?
এই ছোট্ট জীবনে যত ডাক্তার দেখেছি তার বেশিরভাগ ডাক্তারকেই মনে হয়েছে আন্তরিক ও ভালো মানুষ। কিন্তু এই অতিলোভী মানুষগুলোর কারণেই একটি পেশা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর সধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসহীনতা বাড়ছে দিনকে দিন! পুঁজিবাদ আর মানবিকতা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পথের উপাদান। এ রকম অপরাধী একটি পেশার কলঙ্ক। এদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সবার প্রতি আবেদন, অপরাধীরা যেন সহজে শাস্তি না পেয়ে বের হতে না পারে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে আরও সুস্পষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আমাদের চাওয়াÑ যেন কখনই পুঁজিবাদ সব পেশার মানুষের কাছে প্রধানতম ব্যাপার না হয়ে ওঠে! হ

সাঈদ চৌধুরী
রসায়নবিদ ও সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি
শ্রীপুর, গাজীপুর