আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সর্বনাশা নদীভাঙন ঠেকান

মুনযির আকলাম
| সম্পাদকীয়

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম ভাঙন। অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়েছে এ ভাঙনে। নদনদী ভাঙনে সরকারি ও বেসরকারি শত শত কোটি টাকার সম্পদ নদীতে বিলীন হচ্ছে। বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে দরিদ্র মানুষ আরও হতদরিদ্র হচ্ছে। কমছে ফসলি জমির পরিমাণও। উজানের বৃষ্টির মাত্রা যত বাড়ছে, ভাটি এলাকায় নদীভাঙনও তত তীব্রতর হচ্ছে। চোখের সামনেই আকস্মিকভাবে ভাঙনের করালগ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। বাড়িঘর পুড়ে গেলে ভিটেটুকু থাকে, ফলে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করা যায়। কিন্তু নদীর ভাঙনে মাথা গোঁজার ঠাঁইও মেলে না। নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রতি বছর হাজারো পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। ভূমিহীন এ পরিবারগুলো বেড়িবাঁধের ওপর আশ্রয় নেওয়া ছাড়াও জীবন-জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোয়। একসময় যাদের ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, শস্য ভরা মাঠ তারা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে এখন নগর জীবনে হতদরিদ্র মানুষের তালিকাভুক্ত হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্যা, সাইক্লোনের কারণে ব্যক্তির ক্ষতি হলেও সে জমি হারায় না। কিন্তু নদীভাঙনে মানুষ জমি, এমনকি ভিটেবাড়িও হারায়। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ইছামতি, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, আড়িয়াল খাঁ, গড়াই, কর্ণফুলী, মধুমতি, সুরমা, কুশিয়ারা, পদ্মা, মহানন্দা, মুহুরী, শঙ্খ, করতোয়া প্রভৃতি নদনদীর ভাঙনে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, আর এতে বাড়ছে আশ্রয়হীন পরিবারের সংখ্যা। বাংলাদেশে নদীভাঙন প্রলয়ংকরী দুর্যোগের মতো বিপজ্জনক হলেও ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের অবস্থা পরিবর্তনে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়নমূলক প্রকল্প একেবারেই নামমাত্র। একদিকে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি, আরেক দিকে নদীভাঙন দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সীমাহীন দুর্ভোগের কবলে ফেলেছে। আর সীমান্ত নদীভাঙনে গৃহহীন মানুষের অবস্থা আরও শোচনীয়।
সিইজিআইএসের তথ্যানুযায়ী, নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে যারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে তাদের মাঝে শতকরা ৫০ ভাগ লোক টাকাপয়সার অভাবে নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করতে না পারায় গৃহহীনে পরিণত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ গৃহহীন ভাসমান মানুষ রয়েছে এবং প্রতি বছর এদের সংখ্যা গড়ে লক্ষাধিক করে বাড়ছে। ভাসমান এসব মানুষ সাধারণত বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত রেল সড়ক, খাস চর বা খাসজমি প্রভৃতি স্থানে ভাসমান জীবনযাপন করে। অভাবের তাড়নায় এরা শহরমুখী হয় এবং শহরের বস্তিগুলোতে বাড়তি জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত হয়। ভাঙন যেখানে হয়, সেখানকার মানুষ কেন গরিব হয়ে যাচ্ছে? কারণ জমি জলে গেলে তা কোনোভাবে তারা উদ্ধার করতে পারছেন না, প্রভাবশালী কেউ সেই জমিটা নিজের নামে করে নিচ্ছেন পরবর্তী সময়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, নদীভাঙন রোধের কি কোনো উপায় নেই? ভাঙন প্রতিরোধে একাধিক নদী শাসন প্রকল্প, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকলেও নানা দীর্ঘসূত্রতায় তার বাস্তবায়নে সঠিক সুফল হয়নি আজ পর্যন্ত। কিন্তু আগ্রাসী নদীর স্রোতে ভাঙন থেমে নেই এখনও। নদীভাঙন এক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ দেশে সাধারণত বর্ষাকালে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাতের দরুন নদীর পানি বেড়ে যায় এবং তা প্রচ- গতিতে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। এ সময় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীসংলগ্ন স্থলভাগে পানির তীব্র তোড়ে সৃষ্টি হয় নদীভাঙনের। বাংলাদেশে এটা স্বাভাবিক চিত্র হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় তা আর স্বাভাবিক বলে পরিগণিত হচ্ছে না।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বলে ধারণা করা হয় বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।
নদীভাঙন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁঁকি, বর্ষা মৌসুমে নদনদীতে পানি বাড়া এবং নদীগুলো চ্যানেল পরিবর্তন করায় দেশে নদীভাঙনের তীব্রতাও বাড়ছে। ফলে প্রতি বছর দেশের নদীতীরবর্তী অসংখ্য মানুষ বসতভিটাসহ আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। ভাঙনে গেল চার দশকে দেশের প্রায় ১ লাখ হেক্টর ভূখ- হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে। এর মধ্যে সীমান্ত নদীভাঙনে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৫০ হাজার একর ভূমি। তবে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকান গেলেও তা কেন স্থায়ী সমাধান নয়? 

মুনযির আকলাম
কয়লা, পাথর আমদানিকারক ও সরবরাহকারী
[email protected]