আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ডাকসু নির্বাচন আসছে

ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান আসবে তো?

শাওয়াল খান
| সম্পাদকীয়

দীর্ঘ ২৮ বছরেরও অধিক সময় ক্যাম্পাসে ডাকসুর অনুপস্থিতি স্বয়ং ডাকসুকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অপরিচিত বিষয়ে পরিণত করেছে। অথচ ডাকসু সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার চর্চার উন্মুক্ত মঞ্চ, প্রতিবাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, অধিকার আদায়ের হাতিয়ার, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূতিকাগার, জ্ঞানবিজ্ঞান, খেলাধুলা ও বিনোদনের বিশাল প্রান্তর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বহুল আলোচিত একটা বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর কাছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী সব মানুষের তা প্রত্যাশিত এমনটা বললে বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবে না। কারণ ডাকসু বহু বছর গণ্য হয়েছে বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডাকসু নেতারাই প্রথম উত্তোলন করে বিশ্বে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন, দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে ছিলেন। কিন্তু ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাকসু স্থবির হয়ে পড়ে নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের অভাবে। নিয়ম অনুসারে নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায় কার? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা মনে করিয়ে দিতে ডাকসু নির্বাচনপ্রত্যাশীদের আদালত পর্যন্ত যেতে হলো কেন? 
অবশেষে দীর্ঘ ২৮ বছরেরও বেশি সময় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষপরিক্রমা শুরু হতে যাচ্ছে আদালতের নির্দেশনায়। অর্থাৎ ডাকসু নির্বাচন বিষয়ে ২৮ বছরেরও বেশি সময় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নীরবতা ভেঙেছে আদালতের হস্তক্ষেপে। অথচ নিয়ম অনুসারে প্রতি বছর একবার ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই। 
দীর্ঘ ২৮ বছরেরও অধিক সময় ক্যাম্পাসে ডাকসুর অনুপস্থিতি স্বয়ং ডাকসুকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অপরিচিত বিষয়ে পরিণত করেছে। অথচ ডাকসু সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার চর্চার উন্মুক্ত মঞ্চ, প্রতিবাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, অধিকার আদায়ের হাতিয়ার, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূতিকাগার, জ্ঞানবিজ্ঞান, খেলাধুলা ও বিনোদনের বিশাল প্রান্তর। বিগত ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এ বঞ্চনার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করে যাচ্ছেন। এ মুক্ত মঞ্চে বিচরণের অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীরা কোথায় গিয়ে পাবে? এ অনুতাপের কথা বিবেচনায় এনে গেল বছরের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন ইজ অ্যা মাস্ট। ডাকসু নির্বাচন না হলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। দুঃখজনক হলো রাষ্ট্রপতির এমন আহ্বানেও কোনো কাজ হয়নি, ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ডাকসু গঠিত হয় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর। প্রতিষ্ঠার পর ডাকসু এত দীর্ঘ বিরতি আর নেয়নি। রাষ্ট্রপতির তাগিদকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, অবহেলা করা হয়েছে, এমন কা-ও কিন্তু অতীতে ঘটেনি।
১৯৯০ সালের পর বিভিন্ন সময় ডাকসু নির্বাচনের কথা আলোচিত হলেও কার্যত তা আগায়নি। ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনের এক বছর পর ১৯৯১ সালের ১২ জুন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিয়া ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তখন বিধি অনুসারে ছাত্রত্ব হারানো ছাত্রনেতারা ছাত্রত্ব ঠিক রেখে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিশেষ ভর্তির দাবি করেন। এ নিয়ে সৃষ্ট সহিংসতায় নির্বাচন আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়।
আবার ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার দোহাই দিয়ে ছাত্রলীগের বাধার মুখে নির্বাচন স্থগিত হয়। ১৯৯৫ সালেও ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেবারও একইভাবে নির্বাচন ভেস্তে যায়। ১৯৯৬ সালে একে আজাদ চৌধুরী উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর একাধিকবার ডাকসু নির্বাচনের আলোচনা আগায়, এমনকি কয়েকবার সময়সীমাও নির্ধারণও করা হয়, অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ১৯৯৮ সালের ২৭ মে তৎকালীন উপাচার্য একে আজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ডাকসু নির্বাচনের পর এর সময়সীমা হবে এক বছর। পরবর্তী তিন মাস নির্বাচন না হলে বিদ্যমান কমিটি কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। এ সিদ্ধান্তের পর ডাকসু ভেঙে দেওয়া হয়। তখন থেকে ডাকসু এখনও নির্বাচনের মুখ দেখেনি। 
২০১২ সালে ২৫ শিক্ষার্থীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গেল ১৭ জানুয়ারি ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকার পরও ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে কেন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না, এজন্য ৫ সেপ্টেম্বর গৌরবের এ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানসহ প্রক্টর একেএম গোলাম রাব্বানী ও কোষাধ্যক্ষ কামাল উদ্দিনকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়েছে, আগামী সাত দিনের মধ্যে আদালতের নির্দেশনা অনুসারে ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে তিনজনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে। বিষয়টা অনেকটা এমনইÑ ‘যার বিয়ে তাঁর খবর নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই।’ আদালত নির্দেশনা দিচ্ছে, আইনি নোটিশ দিচ্ছে, গণমাধ্যম খবর করে বেড়াচ্ছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ দফায় দফায় আন্দোলন করে, অনশনে বসে, সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন। অনশন চালিয়ে যাওয়ার দুই সপ্তাহ পর ওয়ালিদ আশরাফ অনশন ভেঙে ছিলেন উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের আশ্বাসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তখন যা বলেছিলেন তার অর্থ দাঁড়ায় এ রকমÑ আমরা ডাকসু নির্বাচন করব। তবে এর সঙ্গে যেহেতু অনেক অংশীজন জড়িত, তাই একটু সময় লাগবে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ার যে সংস্কৃতি চলে আসছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। তা এত বেশি সময় নেবে, তা ছিল অভাবনীয়। 
দীর্ঘদিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ১৬ সেপ্টেম্বর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরিবেশ পরিষদের’ সভা থেকে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থানের দাবি উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সিন্ডিকেট সদস্য, আবাসিক হলগুলোর প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরের সঙ্গে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের একটি যৌথ প্ল্যাটফরম এ পরিবেশ পরিষদ। ডাকসুর সভাপতি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এর সভাপতি। ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ১৩টি ছাত্র সংগঠনের নেতারা সভায় অংশ নেন। বিধান অনুসারে এ বছরের ডিসেম্বর নাগাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই হিসেবে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে মতভেদ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন মত প্রকাশ করে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর ক্যাম্পাসে সহাবস্থান প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘হলগুলোয় অবস্থানের জন্য প্রভোস্টরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মধুর ক্যানটিনকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক চর্চা, সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের যে কার্যক্রম চালাবে, তাতে প্রশাসন থেকে কোনো বাধা নেই।’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলেই ডাকসু তার প্রাণ ফিরে পাবেÑ এটা সবার জানা।
পরিবেশ পরিষদের আলোচনায় যেসব প্রস্তাব এসেছে, তা প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জানান উপাচার্য। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই কমিটির এক সভায় ৩০ মের মধ্যে ভোটার তালিকার কাজ শেষ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে তা সিন্ডিকেটেও পাস হয়। কিন্তু উপাচার্য আশা প্রকাশ করেন, অক্টোবরের মধ্যে ভোটার তালিকার খসড়া প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। (১৭/৯/১৮, প্রথম আলো)। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে গেল বছরের শেষদিকে টানা ১৫ দিন অনশন করে আলোচনায় আসা ওয়ালিদ আশরাফ বলেন, উচ্চ আদালতের দুই দফা বাধ্যবাধকতার পরও ছাত্র সংসদ নির্বাচন না দেওয়াটা হতাশার। এখন আদালত অবমাননার আরেকটা মামলা হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদের ডাকা সভা এক ধরনের রাজনৈতিক নাটক। ডাকসু নিয়ে কোনো নাটক নয়, ডাকসুর স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনই সবার কাছে প্রত্যাশিত। 
ছাত্র সংসদে যাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের সেরা ছাত্রছাত্রী, সেরা খেলোয়াড়, গায়ক, আর্টিস্ট, কবি, লেখক, প্রযুক্তিবিদ, সাংস্কৃতিককর্মী ও সৃজনশীলরা নির্বাচিত হতে পারে তার সুযোগ অবারিত হোক। ডাকসু শুধু প্রচলিত ধারার ছাত্র সংগঠনের নেতাদের জন্য নয়, ডাকসু তো সাধারণের মধ্য থেকে নেতৃত্ব তৈরির একটা স্বীকৃত মুক্ত মঞ্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শেষ হবে অথচ ডাকসুর স্বাদ নিতে পারবে নাÑ এটা হয় না। বার্ষিক একাডেমিক ক্যালেন্ডারেই ডাকসুর দিনক্ষণ নির্ধারিত থাকা উচিত। যেমনভাবে দীর্ঘ ২৮ বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলেও শিক্ষার্থীরা ডাকসু খাতে নির্ধারিত ফি দিয়ে আসছে। 

 শাওয়াল খান
লেখক ও শিক্ষাকর্মী