আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বিদেশে নির্যাতিত নারী গৃহকর্মীদের পুনর্বাসন

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
| সম্পাদকীয়

সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নির্যাতিতা, সহায়-সম্বলহীন নারী গৃহকর্মীরা বেশিরভাগই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। অথচ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারী গৃহকর্মীদের জন্য সরকারের কোনো পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। বাংলাদেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখানকার প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কে নির্যাতনের তথ্য জানালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো অথবা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা ছাড়া কোনো কার্যক্রম নেই

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা নারীদের করুণ আর্তনাদের খবর প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে। তাদের হৃদয়বিদারক কান্না, পরিবারের মর্মস্পর্শী আর্তি যে কোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। দেশে নানা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে অনেক নারীই ভিটামাটি বিক্রি করে কিছু নামসর্বস্ব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ভাগ্য বদলাতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পরই তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। আশানুরূপ কাজ না দিয়ে তাদের সৌদি পরিবারে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখা হয়। সারা দিন অমানুষিক খাটুনির পরও তাদের কোনো বেতন মেলে না। দেওয়া হয় না ন্যূনতম খাবারটুকুও। উপরন্তু তাদের ওপর চলে অমানবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। সৌদি আরব ও জর্ডান থেকে অতি সম্প্রতি ফিরে আসা বেশকিছু নারীর শোকগাথা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। তারা কর্মস্থলে নির্যাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নিজেরা চোখের জলে ভেসেছেন। সৌদি আরবে মাত্র চার মাস কর্মরত এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফোনে জানিয়েছেন, সৌদি গৃহকর্তা ও তার ছেলে পালাক্রমে তাকে প্রতিরাতে এভাবে ধর্ষণ করে যে, তার গোপনাঙ্গের মাংসপি- বেরিয়ে আসে। পা বেয়ে রক্ত ঝরে। তিন-চারটা তালা দিয়ে তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়, কোনোক্রমেই সেখান থেকে বেরোনোর উপায় ছিল না। যন্ত্রণায় ছটফট করা এ নারী চিকিৎসার কথা বললেও সৌদি গৃহকর্তা ডাক্তারের কাছে না নিয়ে শুধু একটি বড়ি খেতে দেয়। বাংলাদেশের এক অভিবাসন কর্মকর্তার কাছে ফোনে এ নারী অনুরোধ জানান, ‘জানডা বাইর অই গেল, আমারে বাঁচান ভাই। দেশে গিয়া কাম করি খাব।’ (ভোরের কাগজ)।
সম্প্রতি জর্ডান থেকে দেশে ফিরে আসা এক কিশোরীর হৃদয়বিদারক শোকগাথা জনসমক্ষে এসেছে। নিভৃত গ্রামের ভ্যানচালকের ১৫ বছরের উচ্ছল কিশোরীর বয়স ২৫ বানিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারক এক আদম বেপারি তাকে জর্ডান পাঠায়। তাকে গৃহকর্মীর ভালো কাজ দেওয়া হবে বললেও জর্ডানে পৌঁছেই নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। যৌন নিগ্রহ ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এরপর এক বাংলাদেশি নারীর মাধ্যমে তাকে দেহ-ব্যবসায় লিপ্ত হতে বাধ্য করা হয়। তাতে অসম্মতি জানালেই তার খাবার-দাবার বন্ধ করে দেওয়া হতো। একবার সে পালিয়ে বাঁচতে চাইলেও তাকে ধরে এনে আবার যৌনকর্মে লিপ্ত করা হয়। এক সময় সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তখন আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি পাষ- নারী তাকে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং পুলিশ হেফাজতে তাকে দুই মাস থাকতে হয়। দেড় বছরে সে দেশে পাঠায় মাত্র চার হাজার টাকা। তারপর পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কিশোরী দেশে ফিরে এসে আর্তনাদ করে বলে, ‘মানুষ বিদেশ গিয়া স্যুটকেস ভইরা কত কী আনে, আর আমি পেটে কইরা নিয়া আইছি।’ দেশে ফিরে এসে লোকলজ্জায় সে হয়ে পড়ে গৃহবন্দি। গাঁয়ের মাতব্বর তার পরিবারকে একঘরে করে। তাদের পাশে আজ কেউ নেই। পরিবারটির আক্ষেপ, ‘যাদের জন্য আজ এ অবস্থা তাদের কোনো শাস্তি হলো না।’ (ভোরের কাগজ)।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে বাংলাদেশের গৃহকর্মীরা নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে আসার জন্য গড়ে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ জন ফোন করেন। দেশে ফিরতে চাইলেও নানা জটিলতার কারণে দেশে আসতে পারেছেন না অনেকেই। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১০৫ নির্যাতিত নারী দেশে ফিরে এসেছেন। ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন আরও অনেকে। ১৩ সেপ্টেম্বর একসঙ্গে ৬৫ নারী গৃহশ্রমিক অমানুষিক নিগ্রহের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন। তাদের মধ্যে নির্মম নির্যাতনের শিকার এক গৃহকর্মীকে গর্ভপাত করাতে বাধ্য করে তার সৌদি গৃহকর্তা। দেশে ফেরার পর ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির আওতায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। একইভাবে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছেন ৪২ নারী গৃহকর্মী। এদের মধ্যে অনেক নারী ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দালালকে দিয়ে, সৌদি আরবে জীবন-যৌবন বিলিয়েও নিয়ে আসতে পারেননি কোনো টাকা।  
সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেক নারী আর পরিবারে ফিরে যেতে চান না। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিবারই তাদের গ্রহণ করতে অপারগতা জানায়। এ ধরনের অনেক নারীকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আর্থিক সহায়তা দান, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা, সাময়িককালের জন্য আশ্রয় দেওয়ার মতো বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে থাকে। ব্র্যাকের একজন অভিবাসন কর্মসূচির দায়িত্বরত কর্মকর্তার মতে, ‘সৌদি আরব থেকে নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা নারীদের বিস্তারিত তথ্য, যেমন তিনি কার মাধ্যমে কীভাবে বিদেশে গিয়েছেন, কোথায় কী কাজ করেছেন, তার প্রতি কেমন আচরণ করা হয়েছেÑ এসব জেনে সৌদি সরকারের কাছে জবাব চাওয়া দরকার।’ (প্রথম আলো)। সৌদি আরবে এ ধরনের যৌন নির্যাতন দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি যৌনকর্মের জন্য তারা বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নেয়, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নির্যাতিতা, সহায়-সম্বলহীন নারী গৃহকর্মীরা বেশিরভাগই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। অথচ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারী গৃহকর্মীদের জন্য সরকারের কোনো পুনর্বাসন কর্মসূচি নেই। বাংলাদেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে সেখানকার প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কে নির্যাতনের তথ্য জানালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো অথবা বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা ছাড়া কোনো কার্যক্রম নেই। তবে কেউ চাইলে তাকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে বৈদেশিক কর্মস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘নির্যাতনের শিকার নারীদের সার্বিকভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে তাদের সুস্থ করে তোলা কঠিন।’ সৌদি আরবের মতো দেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরে আসা এসব নারী শ্রমিকের পুনর্বাসনের দায়িত্ব রিক্রুটিং এজেন্সি ও সরকারকে নিতে হবে। অভাবের তাড়নায় দেশ, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে বিদেশে চাকরির বিনিময়ে যে বৈদেশিক রেমিট্যান্স, তার একটি অংশ আসে বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে। আর সেই অর্থে চলে দেশের উন্নয়ন কর্মকা-। কাজেই তারা যাতে নির্যাতিত না হয়ে বরং সম্মানের সঙ্গে বিদেশে কাজ করতে পারে সে দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। হ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
কলাম লেখক 
পশ্চিম মালিবাগ, ঢাকা