আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২০-০২-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

পরিবেশের হুমকি : উত্তরণের উপায়

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন
| প্রকৃতি ও পরিবেশ

আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে ভূমি সজীব ও উর্বর হয় এবং তাতে উদ্ভিদ ও বৃক্ষ উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তায়ালা জানান দেন, এখনই সময় বৃক্ষরোপণ করার। কিন্তু আমরা বুঝেও বুঝি না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীবজন্তুর জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে

 

বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রিন হাউস ইফেক্ট, ওজোন স্তরের ক্ষয়, বরফ গলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মরুকরণ, খরা ও বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাসসহ বিভিন্ন কারণে আজ আমরা মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিককালে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রতি বছর সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বন্যার প্রকোপ, মরুকরণÑ এসব আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে ভবিষ্যতের ভয়াবহ পরিণামের কথা। এজন্য এসব বিষয় নিয়ে খুব দ্রুত ভাবতে হবে। কিছু বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাকÑ

বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে বরফ দ্রুত গলছে। যার পরিণামে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। এ বৈশ্বিক উষ্ণতার পেছনে অন্যতম কারণ গ্রিন হাউস ইফেক্ট, যা ওজোন স্তরের ক্ষতি করছে। আর এ সবকিছুর পেছনে মূলত দায়ী আমরা মানবজাতি। আমরা নিজেরাই নিজেদের কী পরিমাণ ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছি, তা আমরা নিজেরাই বলতে পারি না। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে অবশ্যই আমরা; কিন্তু সেই প্রযুক্তি অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে।

আমরা ব্যবসার জন্য গাছপালা কেটে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছি। কিন্তু এ গাছের পরিবর্তে আর একটি নতুন গাছ আমরা লাগাই না। এ অনীহার কারণে আমরা প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস করছি, তা কি আমরা জানি? গাছই আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং প্রকৃতির কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এখন আমরা প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করছি; কিন্তু অক্সিজেন উৎপাদনের ক্ষেত্র ধ্বংস করছি। ভেবে দেখেছি, এর পরিণাম কি হবে?

নগরায়ণ এবং শহরায়ণের নামে আমরা বনাঞ্চল কেটে ঘরবাড়ি বানাচ্ছি, ফলে বিচিত্র ধরনের পশুপাখির অভয়ারণ্য এ পৃথিবীর জায়গা ছোট হয়ে যাচ্ছে এ পশুপাখির জন্য। যার পরিণাম আমরা ভেবে দেখি না। ফলে জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির সম্মুখীন। প্রতিনিয়তই বিলুপ্ত হচ্ছে কোনো না কোনো প্রজাতি।

সারা দেশে নদীনালা, খালবিল দখল ও বনভূমি উজাড় করে পাহাড় কেটে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। তাছাড়া অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধস সারা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে, যা খুবই দুঃখজনক। বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে ৯৬০ কোটি। তখন মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য তিনটি পৃথিবীর সমান সম্পদের দরকার হবে। বাংলাদেশে ২৫টি জৈব প্রতিবেশ ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ৩৯৫ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। জনসংখ্যার চাপ আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এ প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। 

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের বিভিন্ন নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। পার্থিব জগতে প্রতিটি বস্তু মানবজাতির কল্যাণের জন্য সৃজন করেছেন। পৃথিবীকে সাজিয়েছেন হরেকরকম সৃষ্টি দিয়ে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বৃক্ষ। গাছগাছালি জীবজন্তুকে পরিশোধিত বায়ু দ্বারা জীবনধারণে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। গাছপালা পরিবেশ রক্ষা, ওষুধপত্র, গৃহ নির্মাণ, আসবাবপত্র ও জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন উপকারে আসে। কোরআনের ভাষ্যÑ ‘রাব্বুল আলামিন তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। এ পানি থেকে তোমরা পান করো। এ পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর ও সব ধরনের ফল।’ (সূরা নাহল : ১০)। আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে ভূমি সজীব ও উর্বর হয় এবং তাতে উদ্ভিদ ও বৃক্ষ উৎপন্ন হয়। আল্লাহ তায়ালা জানান দেন, এখনই সময় বৃক্ষরোপণ করার। কিন্তু আমরা বুঝেও বুঝি না। জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছপালা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীবজন্তুর জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বিশেষভাবে বৃক্ষের অভাবে পরিবেশের ওপর বিপর্যয় দেখা দেয়। মরুকরণ, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ ভয়াবহ আকারে দেখা দেয়। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে, কোনো দেশের পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় সে দেশের মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার বর্গমাইলে মাত্র ১০ হাজার বর্গমাইল বনভূমি রয়েছে। অর্থাৎ আয়তনের মাত্র ১৫ ভাগ। নির্বিচারে গাছ কাটা, যত্রতত্র বৃক্ষকে অবহেলাভরে পদদলিত করা রীতিমতো দেখা যাচ্ছে সব জায়গায়। এভাবে চলতে থাকলে সুন্দর বৃক্ষময় এলাকা একসময় বৃক্ষশূন্য অবস্থায় রূপ নেবে বলে মনে করি। তাই আমাদের এক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বিভিন্ন ঋতুর প্রাকৃতিক পরিবর্তন হয়। শীত ঋতুতে গাছের পাতা ঝরে যায়। সে সময় বৃষ্টিপাত না থাকায় অনেক বৃক্ষ অঙ্কুরেই মরে যায়। তাই বর্ষার বৃষ্টিপাতে বৃক্ষরোপণ করলে তা সহজেই সতেজ হয়ে ওঠে। এদিকেও আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বৃক্ষের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে; ভেষজ, আসবাব ও জ্বালানিরূপে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ফলদানকারী বৃক্ষও আছে। বর্ষাকালে আম, জাম, কাঁঠালের ফলন হয়। আসবাবপত্র তৈরিতেও বৃক্ষের কোনো জুড়ি নেই। জ্বালানিতেও বৃক্ষের চাহিদা খুব। রাব্বুল আলামিন মানবজাতির জন্য বিভিন্ন ধরনের অগণিত বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন। আমাদের পক্ষে এর নাম ও গুণগত কল্পনা করা অসম্ভব। বৃক্ষের লতাপাতায় রয়েছে চিকিৎসার সব ধরনের বৈশিষ্ট্য। চিকিৎসকরা অবাক হয়ে পড়েন বৃক্ষের গুণাগুণ দেখে। সুতরাং বৃক্ষকে বাঁচাতে হলে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বৃক্ষরোপণ অভিযানে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি প্রত্যেকে একটি করে গাছ লাগাই, তাহলে দেশে বৃক্ষের কমতি হবে না কখনোই। পরিবেশও আমাদের অনেকটা অনুকূলে চলে আসবে। 

এ রকম আরও অনেক যুক্তি দেওয়া যায়। তবে এজন্য আমরা দায়ী অনেককেই করতে পারি। কিন্তু অন্যকে দায়ী না করে আমরা নিজেরা একটু সচেতন হই পরিবেশ রক্ষায়। আমরা শুধু পরিবেশকেই ধ্বংস করছি না, বরং তার সঙ্গে নিজেদের অনাগত ভবিষ্যৎকেও ধ্বংস করছি। তাই আসুন আমরা আমাদের পরিবেশকে বাঁচাই এবং নিজেদেরও বাঁচাই। আমরা একটু সচেতন হই নিন্মোক্ত বিষয়েÑ 

 

- বৃক্ষনিধন না করে বৃক্ষরোপণ করি।

- যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশকে দুর্গন্ধ করব না।

- ধূমপান করে নিজের ক্ষতি করব না; সঙ্গে অন্যের ক্ষতিও করব না।

- পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহী হব।

- প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

- জল ও বনভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

- নদী, বন ও জলাশয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

- প্রতি জেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস থাকতে হবে। 

- প্রতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পরিবেশের বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে থাকতে হবে। 

- যে কোনো প্রকল্প অনুমোদনের সময় পরিবেশের বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষক ও রোভার স্কাউট লিডার