আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৮-১১-২০১৯ তারিখে পত্রিকা

গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, নিহত ৭

ঘটনাস্থল : চট্টগ্রামের পাথরঘাটা

সাইফুদ্দিন তুহিন ও শানে আলম সজল, চট্টগ্রাম
| প্রথম পাতা

চট্টগ্রামের পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে রোববার গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে ভবনের একাংশ ধসে নিহত স্বজনদের আহাজারি ষ পিবিএ

- পূজার ঘরে ম্যাচ জালাতেই আগুন

- ভবনটি বিধি অনুযায়ী হয়নি : সিডিএ

- ৯৯৯ এ ফোন পেয়ে আসে পুলিশ

- অগ্নিদগ্ধ ১০

নগরীর কোতোয়ালি থানাধীন পাথরঘাটা এলাকায় গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে ধসে গেছে একটি পাঁচতলা ভবনের একাংশ। এ ঘটনায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় অগ্নিদগ্ধ হন আরও ১০ জন। রোববার সকাল ৯টার দিকে পাথরঘাটা এলাকার ব্রিকফিল্ড রোডে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। 

ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর থেকে ব্রিকফিল্ড রোডে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। আহতদের কয়েকজন জানান, ভবনের পূজার ঘরে ম্যাচ জ্বালাতেই আগুন ধরে বিস্ফোরণ ঘটে। মৃতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন পটিয়া উপজেলার একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এ্যানি বড়–য়া (৩৮), রং মিস্ত্রি নূরুল ইসলাম (৩০), ফারজানা বেগম (৩২), আতিকুর রহমান শুভ (৭), জুলেখা বেগম (৩২), শুক্কুর (৫০)। অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহতরা গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, নিহত ৭
ষ ১ম পৃষ্ঠার পর
হলেন আরিফ (২২), অর্পিতা নাথ (১৬), আবদুল হামিদ (৪০), মো. ইউসুফ (৪০), সন্ধ্যারানী দেবী (৩৫), ইসমাঈল (৩০)। আহত অন্যদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বড়–য়া বিল্ডিং থেকেই সকাল ৯টা ৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পার্শ্ববর্তী ভবনের সিসি টিভি ফুটেজ থেকে বিষয়টির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমরা ঘটনার পর ছুটে এসে পার্শ্ববর্তী একটি ভবনের সিটি টিভি ফুটেজ চেক করি। সেখান থেকেই বিস্ফোরণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পেরেছি। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৩২ সেকেন্ডের একটি সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, রোববার বিস্ফোরণের সময় রাস্তা দিয়ে একটি রিকশা পার হচ্ছিল। এছাড়া ভবনটির অপর পাশে একটি পিকআপও দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় বিকট শব্দে ভবনের দেওয়াল দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তায় এসে পড়ে। এ ঘটনার পরই ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে পথচারীরা দুর্ঘটনার খবরটি পুলিশকে জানান। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসীম উদ্দিন বলেন, খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। ১৬ জনকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠিয়েছি। সেখানে সাতজন মারা গেছেন। নন্দনকানন, চন্দনপুরা ও আগ্রাবাদ তিন স্টেশনের ১০টি গাড়ি উদ্ধার কাজ শুরু করে। গ্যাসের লাইন পুরোনো ছিল। লিকেজ, নাশকতা, কেমিক্যাল আছে কি নাÑ তদন্ত করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে দুইটি আবাসিক ভবনের প্রাচীর ও সড়কের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দোতলা পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাসান শাহারিয়ার কবির মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন করে জানান, আহত হয়ে মোট ১৭ জন হাসপাতালে এসেছিলেন। তার মধ্যে মারা গেছেন সাতজন। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন দুই নারী, চার পুরুষ, এক শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১০ জন। এর মধ্যে রয়েছেন ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে পাঁচ, বার্ন ইউনিটে দুই, নিউরোলজিতে এক, অর্থোপেডিক বিভাগে এক ও কার্ডিওলজি বিভাগে একজন।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা গেছে, বিস্ফোরণে ওই ভবনের নিচের তলার দেওয়াল ও সীমানাপ্রাচীর ধসে রাস্তার ওপর পড়েছে। এতে পথচারী ও চলাচলরত যাত্রীরাও হতাহত হন। বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের পাশাপাশি উল্টো দিকের জসীম বিল্ডিংয়ের নিচের তলার দোকানও বিস্ফোরণের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানগুলো যেন তছনছ হয়ে গেছে। 
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের নিচের তলায় সীমানাপ্রাচীরের পাশেই ওই বাড়ির গ্যাস রাইজার। বিস্ফোরণটি নিচের তলাতেই হয়েছে। হয়তো রাইজারে কোনো সমস্যা ছিল, হয়তো লিকেজ থেকে গ্যাস বের হয়ে জমে গিয়েছিল। সকালে বাসায় কেউ আগুন ধরালে তাতে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে তদন্তের আগে বিস্তারিত বলা কঠিন।
নিচের তলার বাসিন্দা আহত সন্ধ্যা নাথ ও অর্পিতা নাথ হাসপাতালে জানান, সকালে পূজার ঘরে ম্যাচ জ্বালানোর সময় বিস্ফোরণ ঘটে। পাঁচতলা বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের বর্তমান মালিক অমল বড়ুয়া ও টিটু বড়–য়া থাকেন ভবনের পঞ্চম তলায়। পৈত্রিক সূত্রে তারা ওই বাড়ি পেয়েছেন।
ভবনের চতুর্থ তলার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক অঞ্জন কান্তি দাশ জানান, সকালে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের সঙ্গে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে। তার বাসার জানালার কাঁচ ভেঙে যায় এবং অনেক জিনিসপত্র মেঝেতে পড়ে যায়। কী ঘটেছে বোঝার জন্য আমি নিচে নামার সময় দেখি দোতলার দরজা-জানালাও ভেঙে গেছে বিস্ফোরণের ধাক্কায়।
এদিকে পাথরঘাটার ভবনে গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় কারও অপরাধ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। রোববার বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। মেয়র বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাসের লাইন থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আহত সবার চিকিৎসাভার বহন করা হবে। তিনি বলেন, সেবা সংস্থার সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যদি কারও অপরাধ থাকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন : পাথরঘাটায় ভয়াবহ গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বিস্ফোরণে হতাহতের খবর পেয়ে রোববার সকালে ঘটনাস্থলে আসেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এজেএম শরিফুল হাসানকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। জেলা প্রশাসক বলেন, গঠিত কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিস্ফোরণে মৃত শিশুসহ সাতজনের দাফন-কাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হবে। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও তিন সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আহত রোগীদের দেখতে এসে সিএমপি কমিশনার মাহবুবর রহমান বলেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হবে। কমিটির আহ্বায়ক মহানগর দক্ষিণের উপ-পুলিশ কমিশনার মেহেদী হাসান। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন নগর পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মঞ্জুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা।
গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পরিদর্শন করেন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি নিহতদের আাত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে হতাহতদের সহায়তার জন্য চসিকের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার দুপুরে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে দিয়ে এ ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া নিহতদের লাশ গ্রামের বাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য আরও ২০ হাজার টাকা করে প্রদান ও দুর্ঘটনায় আহতদের সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করারও ঘোষণা দেন তিনি।
গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি সিডিএ’র নিয়ম ও বিধি মোতাবেক হয়নি বলে জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলাম খান। রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রথম দর্শনেই বলা যায় ভবনটি বিধি অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। অবৈধভাবে সড়কের জায়গা দখল করে ভবনের সামনের অংশ বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া বিপজ্জনকভাবে সড়কের পাশে সেপটিক ট্যাংক করা হয়েছে। শাহিনুল ইসলাম খান আরও বলেন, যথার্থ ডিজাইন না হলে সেপটিক ট্যাংকে গ্যাস জমে। সেপটিক ট্যাংকের পাশে কিচেন, গ্যাসের রাইজার। ভবন নির্মাণের সময় সিডিএ নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কিন্তু ভবন মালিকরা নকশা মানে না বলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। 
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) দক্ষিণের ডিসি মেহেদি হাসান বলেন, ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে এক ব্যক্তি আমাদের পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনাটি জানান। এ ঘটনায় ১৭ জন দগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) আনা হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক সাতজনকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যরা সেখানেই চিকিৎসাধীন। কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মহসীন বলেন, পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনে গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরণে ভবনের একাংশ ভেঙে যায়। এতে সাতজন মারা যান এবং দগ্ধ হন অন্তত ছয়জন। দগ্ধদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে ভবনে গ্যাসের লাইন বিস্ফোরণে মৃত সাতজনের মধ্যে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এ্যানি বড়–য়া (৩৮), রং মিস্ত্রি নূরুল ইসলাম (৩০), ফারজানা বেগম (৩২) ও শিশু আতিকের (১০) লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।