logo
প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, রবিবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮
বাকিতে বিক্রি : ফজিলত ও নির্দেশনা
মাওলানা শিব্বীর আহমদ

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাকিতে বিক্রি। ধর্মীয় ও মানবিকÑ উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে চলার পথে যে-কোনো পদক্ষেপে একজন মানুষ যেমন ঋণ গ্রহণে বাধ্য হয়ে পড়ে, তেমনি আকস্মিক সংকটের মুখে কিংবা অনন্যোপায় হয়ে বাকিতে কোনো কিছু কিনতেও পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে। বাকিতে বিক্রি তো একপ্রকার ঋণই। পবিত্র কোরআনে বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় এভাবে আলোচিত হয়েছেÑ ‘হে মোমিনরা! যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকিতে লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রেখো।’ (সূরা বাকারা : ১৮২)।
এ আয়াতে অবশ্য বাকিতে লেনদেনের জন্য একটি বিশেষ পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের লেনদেন যেখানে হয়, সেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে সাধারণত কোনো ধরনের পূর্ব পরিচিতি থাকে। সেই পরিচয়ের সূত্রেই একজন বিক্রেতা নগদ টাকা না পেয়েও ক্রেতার হাতে পণ্য তুলে দেন। কথামতো মূল্য পরিশোধ করে দেওয়া তাই বিবেক ও মানবিকতার দাবি। কিন্তু মানবিকতার একটি দুর্বল দিক হলো কখনও ক্রেতা ভুলে যেতে পারেন তার দেনার কথা, ভুলে যেতে পারে তার দেনার পরিমাণের কথা। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তখন আগের ঘনিষ্ঠতা ও পরিচিতি তিক্ততায় পর্যবসিত হয়। মানবিক এ দুর্বলতা থেকে রেহাই পেতে তাই শুরুতেই তা লিখে রাখার বিকল্প নেই। কোরআন আমাদের সেদিকেই পথনির্দেশ করছে।
বাকিতে ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে বর্তমান উন্নত সময়ে আমরা দুই ধরনের প্রান্তিকতা দেখতে পাই। ১. আধুনিক অনেক শপিংমল, যেখানে নগদ লেনদেনের বাইরে ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো সুযোগই নেই। ২. বিলাসবহুল কিছু পণ্যের বাকিতে ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে নামে কিংবা বেনামে সুদের লেনদেন হচ্ছে। অথচ ইসলাম এ উভয় ধরনের প্রান্তিকতা থেকে সরে এসে আমাদের এক মধ্যম পন্থায় চলতে শেখায়। বাকিতে কোনো কিছু কেনার প্রয়োজন হতে পারে যে কারও। প্রয়োজনগ্রস্ত সেসব ব্যক্তির জন্য সাময়িক বাকিতে কেনার সুযোগ রাখা যেমন মানবিকতার দাবি, তেমনি বাকিতে লেনদেনের চোরাই পথে এসে অভিশপ্ত সুদ যেন আমাদের ঈমান-আমলকে ধ্বংস করে না দেয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখাও মোমিন হিসেবে এক অপরিহার্য কর্তব্য। 
প্রসঙ্গত বলে নিই, কোন পণ্য কত দামে বিক্রি হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে লেনদেন চুক্তিটি চূড়ান্ত করার আগেই। নগদ বিক্রি আর বাকিতে বিক্রির ক্ষেত্রে মূল্য কমবেশি হতে পারে, এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাকি-নগদ যাই হোক, পণ্যের দাম কতÑ তা আগেই নির্ধারণ করে নিতে হবে। কম মেয়াদে বাকি আর বেশি মেয়াদে বাকি লেনদেনের মাঝেও মূল্য কমবেশি হতে পারে। সেটাও আগেই ঠিক করে নিতে হবেÑ কত দিনের মেয়াদে কত টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। তিন মাসে পরিশোধ করলে অত টাকা আর ছয় মাসে পরিশোধ করলে অত টাকাÑ মূল্য নির্ধারণ না করে এভাবে ঝুলিয়ে রেখে কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি ছয় মাস মেয়াদে বাকিতে কোনো কিছু কেনার পর যদি কেউ দুই মাস পর মূল্য পরিশোধ করে দেয়, তাহলে তাকে নির্ধারিত মূল্যের পুরোটাই আদায় করতে হবে। নির্ধারিত মেয়াদের আগে পরিশোধ করেছে বিধায় কিছু টাকা কম পরিশোধ করার সুযোগ তার নেই। আবার যদি নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে মূল্য পরিশোধ করতে না পারে, তাহলে মেয়াদের পরও সে নির্ধারিত মূল্যই পরিশোধ করবে। বিক্রেতা তার কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো টাকা দাবি করতে পারবে না। 
বাকিতে লেনদেন করলে ইসলামের শিক্ষা হলো, তা লিখে রাখা। এটা মুস্তাহাব। ব্যাপকভাবে না হলেও বড় বড় কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে এ লিখে রাখার প্রচলন আমাদের মাঝে এখনও আছে। চুক্তিপত্র লিখে রাখা মূলত ক্রেতার দায়িত্ব। ক্রেতা যদি নিজে লিখতে না পারে, তাহলে সে অন্য কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নেবে। চুক্তিপত্র যে লিখে দেবে তার জন্যও রয়েছে ইসলামের নির্দেশনাÑ সে যেন যথাযথভাবে লিখে দেয়, কারও পক্ষপাতিত্ব না করে এবং কেউ তাকে লিখে দেওয়ার কথা বললে সে যেন অস্বীকৃতি না জানায়। কোরআনের ভাষায়Ñ ‘কোনো লেখক যেন ন্যায়সংগতভাবে তা লিখে দেয়; আর কোনো লেখক যেন তা লিখতে অস্বীকৃতি না জানায়, যেভাবে আল্লাহ তাকে শিখিয়েছেন, বরং সে যেন লিখে দেয়; যার ওপর অধিকার রয়েছে সে যেন লিখিয়ে নেয় এবং সে যেন তার প্রভুকে ভয় করে আর তা থেকে কোনো কিছু কমিয়ে না দেয়। যার ওপর অধিকার সে যদি নির্বোধ কিংবা দুর্বল হয় অথবা সে যদি লেখাতে না পারে, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সংগতভাবে তা লিখিয়ে নেয়।’ (সূরা বাকারা : ১৮২)।
বাকিতে লেনদেনের সময় ইসলামের আরেক শিক্ষাÑ সাক্ষী রাখা। এটাও মুস্তাহাব। করতে পারলে ভালো। দুজন পুরুষ কিংবা একজন পুরুষ ও দুজন নারীকে সাক্ষী রাখা। পরবর্তী সময় যেন কোনো রকম ঝামেলায় ঝড়াতে না হয়, সেজন্যেই ইসলামের এ নির্দেশনা। বড় লেনদেনের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখার প্রচলনও আমাদের সমাজে রয়েছে। সাক্ষী রাখার নির্দেশনা তো ক্রেতা-বিক্রেতার জন্য। আর যারা সাক্ষী, তাদের জন্য নির্দেশনা হলো, তাদের যখন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হবে, তখন তারা যেন অস্বীকৃতি না জানায়। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অনেক সময় অনেক ন্যায্য অধিকারীও তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই সাক্ষী হিসেবে যখন কাউকে ডাকা হয়, তখন সে যেন সাক্ষ্য দেয়। পারস্পরিক ঝগড়া মিটিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এ এক সামাজিক পদক্ষেপ, সামাজিক সেবা। ব্যক্তিগত একটু কষ্ট সয়ে নিয়ে হলেও এ সেবা করা উচিত। কোরআনের ভাষায়Ñ ‘যে সাক্ষীদের তোমরা পছন্দ করো তাদের থেকে দুজন পুরুষকে সাক্ষী রেখো, যদি দুজন পুরুষ না হয় তাহলে এক পুরুষ ও দুই নারী ...। আর সাক্ষীদের যখন ডাকা হয় তারা যেন অস্বীকৃতি না জানায়।’                 (সূরা বাকারা : ১৮২)।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]