
যৌথ বাহিনীর সহায়তায় গেল বছর অবৈধ ইটভাটাগুলো ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হলে এবছর আবারো ৩৪টি অবৈধ ইটভাটা চালু হয়েছে চাঁদপুর জেলায়। গত ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে অবৈধ ইটভাটাগুলো চালু করে মালিকপক্ষ। যদিও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবৈধ ভাটার মালিকদের আগাম ফোন করে ভাটা বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিতে বলা হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনাও বাস্তবায়ন হয়নি। তাদের হালনাগাদ তথ্যেও গড়মিল পাওয়া যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ দেয়া তথ্যে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে ৯৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে ৫১টি। নিবন্ধন ছাড়া ইটভাটা ৪২টি। এর মধ্যে এ বছর বন্ধ রয়েছে ৮টি। আর ছাড়পত্র ছাড়াই চালু হয়েছে ৩৪টি। এসব ইটভাটাগুলো ইতোমধ্যে নতুন ইট তৈরি করে বাজারজাত শুরু করেছে।
সরেজমিন চাঁদপুর সদর, মতলব দক্ষিণ, মতলব উত্তর, ফরিদগঞ্জ ও হাজীগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বৈধ ও অবৈধ ইটভাটার মধ্যে অনেক ইটভাটাই পরিবেশ আইন মানতে নারাজ। বসতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খুব নিকটে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। কিছু ইটভাটাতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ এবং ব্যবহার হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি।
চাঁদপুর সদরের পাঁচটি ইটভাটা অবৈধ। তবে সরেজমিন এবিএম, আর এন্ড এস, এসকে, বিআরএস ও এএমএস ব্রিক নামে অবৈধ ইটভাটাগুলো চলমান দেখা গেছে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার কামতা বাজার ব্রিকস অবৈধ হলেও সরেজমিন এটি চলমান পাওয়া যায়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এটি বন্ধ দেখানো হয়েছে। একই উপজেলার মেসার্স মাহবুব চেয়ারম্যান ব্রিক এটিও অবৈধ এবং একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন। এটিও এক মাস পূর্বে চালু হয়। এই ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহার হয় কাঠ।
পাশের গাজীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক বলেন, আমাদের এখানে শুধুমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি সিনিয়র মাদ্রাসা রয়েছে। ইটভাটার কারণে সকল শিক্ষার্থীর সমস্যা হয়। সরকারিভাবে এই ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আমাদের কিছু করার থাকে না। আমরা উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা অফিসে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
পাশেই রয়েছে গাজীপুর নির্মাণ ব্রিকস। এই গ্রামের শত শত বসতির মাঝখানে ফসলি জমিতে এই ইটভাটার অবস্থান। এখানকার বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ইটভাটা চালু হলে ধুলা-বালির কারণে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার কিভাবে এগুলো অনুমোদন দেয়।
ওই ইটভাটার পূর্ব পাশে বসবাসকারী এবং গাজীপুর ওসমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন বলেন, ইটভাটার বিকট শব্দে রাতে পড়াশোনা করা সম্ভব হয় না। রাতে ঘুমাতে পারি না এবং ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে গাছের পাতাগুলো ঝলসে যায়।
মতলব দক্ষিণ উপজেলায় চারটি ইটভাটা রয়েছে। সবগুলোই অবৈধ। কিন্তু সরেজমিন মতলব ব্রিকস, শাহ পরান ও সিএস ব্রিকস চলমান পাওয়া যায়। একইভাবে মতলব উত্তর, হাজীগঞ্জ, শাহরাস্তি, হাইমচর, কচুয়া উপজেলার অবৈধ ইটভাটাগুলোও চলমান রয়েছে।
চাঁদপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অবৈধ ইটভাটার মালিকরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। ওই রিটের বিষয়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে। তবে তিনি নিজেই রায় আসার পূর্বে নিজের অবৈধ ইটভাটা দুই বছর বন্ধ রেখে এবার চালু করেছেন।
অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও আপনি কীভাবে ইটভাটা চালু করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবাই যেভাবে চালায় আমিও সেভাবে চালাই।
সমিতির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, আমার ইটভাটা বন্ধ। আমি সমিতির সভাপতি হলেও গত তিন বছর ধরে সমিতির কোনো সভা হয় না। সমিতির নেতাদের বলেছি আমাকে পদ থেকে বাদ দিতে। অবৈধ কিংবা বৈধ কোনো ইটভাটা সম্পর্কে আমি জানি না। এসব বিষয়ে কোনো খোঁজও রাখি না।
পরিবেশ অধিদপ্তর চাঁদপুর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, চাঁদপুরে ৯৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি ইটভাটার কোনো ছাড়পত্র নেই এবং অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে এসব ইটভাটা আইনি ব্যবস্থা হিসেবে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়।
পাশাপাশি ইটভাটা মালিকদের ডেকে ভাটা না চালানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। এখনো যেসব ইটভাটা চলমান রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই বিষয়ে বক্তব্যের জন্য চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নাজমুল ইসলাম সরকারকে ফোন দেয়া হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলে তিনি বার্তাটি দেখলেও কোনো জবাব দেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।