
সুমিষ্ট ও রসালো লিচুর অঞ্চল হিসেবে সারাদেশে অনেকটাই পরিচিত পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা। তবে চলতি মৌসুমে অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপদাহে লিচুর গুটির আকৃতি বাড়ছে না। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে লিচুর গুটির একাংশ শুকিয়ে লিচুর গুটি ঝরে পড়ছে।
ঈশ্বরদীতে গত ১৩ দিন জুড়ে তাপমাত্রার ওঠা-নামা করছে ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র তাপদাহ ও খরায় একদিকে যেমন অতিষ্ঠ জনজীবন, অপরদিকে দেশের অন্যতম লিচুর এলাকা হিসেবে পরিচিত লিচুর ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লিচুর বাগান মালিক ও বাগানের ক্রেতা-ব্যবসায়ীরা। তীব্র খরায় অতিরিক্ত লিচুর গুটি ঝরে পড়ায় লোকসানের আশঙ্কায় এখন তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
কৃষি কর্মকর্তা ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের পরামর্শ অনুযায়ী বাগানগুলোতে স্প্রে ও সেচ দিয়ে গুটি ঝরে পড়া রোধের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বাগান মালিক ও মুকুল অবস্থায় বাগান ক্রয় করা ব্যবসায়ীরা। তবে পরিচর্যা করেও গুটি ঝরে পড়া ঠেকানো যাচ্ছে না। মৃদু বাতাসেও গুটি ঝরে পড়ছে বলে জানান তারা। এমনিতেই সঠিক সময়ে ঠিক মতো তেল না পাওয়ার কারণে চাহিদামতো গাছে পানি দিতে পারছেন না অনেকেই।
শনিবার ও রোববার (২৫ ও ২৬ এপ্রিল) সরেজমিন উপজেলার মিরকামারী, জয়নগর, মানিকনগর, বক্তারপুর, জগন্নাথপুর, বাঘইল, চরসাহাপুর, সাহাপুর, আওতাপাড়া ও বাঁশেরবাদা এলাকায় ঘুরে বাগান মালিক, মুকুল অবস্থায় কেনা ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগের সাথে কথা বলে এবং সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এ বছর ঈশ্বরদীতে ৩ হাজার ১০০ হেক্টরেরও বেশি জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। উপজেলায় মোট লিচু গাছ রয়েছে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫টি। ছোট-বড় বাগান মিলিয়ে প্রায় ১১ হাজার ২৭০টি বাগান রয়েছে। বিঘা প্রতি ১৫ থেকে ২০টি গাছ, অর্থাৎ এক একর জমিতে প্রায় ৪২টি এবং এক হেক্টর জমিতে প্রায় ৯০টি গাছ রয়েছে। উপজেলায় লিচু চাষির সংখ্যা নয় হাজার ৬২০ জন। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে এবং বসতবাড়ির আঙিনায় চাষ হচ্ছে ৬০০ হেক্টরে। ফলন্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৫০ হেক্টর এবং মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। এই তাপমাত্রা অব্যাহত থাকলে লিচূর আকার ছোট হয়ে যেতে পারে এবং উৎপাদন কমে যেতে পারে ৩০ শতাংশের বেশি। এতে লিচুর বাগান মালিক এবং মুকুল দেখে আগাম বাগান ক্রেতা ব্যবসায়ীরা ব্যাপক আকারে লোকসান ও ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়নের জয়নগর কারিগর পাড়ার লিচুর বাগান মালিক শামসুল আলম জানান, এবার গত বছরের চেয়ে বেশি পরিমাণে মুকুল আশায় ভালো ফলন ও লাভের আশা করছিলেন তিনি। তার প্রায় শতাধিক লিচু গাছের মধ্য থেকে মুকুল থাকা অবস্থায় ৬০টি লিচু গাছ সাড়ে তিন লক্ষ টাকায় বিক্রি করেছেন। কিন্তু এভাবে টানা দীর্ঘদিন উচ্চ তাপমাত্রা থাকলে লাভ তো দূরে থাক ব্যাপক লোকসান হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের মানিকনগর গ্রামের লিচু চাষি রহমত আলী বলেন, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বাগানগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি লিচুর মুকুল এসেছিল। ভেবেছিলাম বিগত বছরের লোকসান কাটিয়ে ওঠা যাবে। তবে তীব্র খরায় লিচুর গুটি ঝরে যাওয়ায় নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল ওরফে ‘লিচু কিতাব’ জানান, একদিকে যেমন তীব্র খরায় লিচুর গুটি ঝরে যাচ্ছে। গাছে সেচ দেওয়ার জন্য সময়মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা যথাযথ পরিচর্যা করতেও পারছেন না। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন জানান, ঈশ্বরদীতে শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস বিকেল ৩টায় ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করে। এর আগের দিন গতকাল শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) তাপমাত্রা রেকর্ড করে ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
তিনি আরো জানান, গত ১২ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল (শনিবার) পর্যন্ত ১৩ দিন ধরে ঈশ্বরদীর তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরেই আটকে আছে।
চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম জানিয়ে তিনি বলেন, চলতি বছর মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিপাত হয়েছে গত ১১ মার্চ। ওই দিন মাত্র ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর সর্বশেষ গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তাই তাপপ্রবাহ দীর্ঘমেয়াদী রূপ নিয়েছে। তবে এপ্রিলেই সাধারণত তীব্র তাপপ্রবাহের মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। তাই বৃষ্টি না হলে এই তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
ঈশ্বরদী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার কৃষিবিদ মো. ধীমান তানভীর স্বাক্ষর বলেন, তীব্র তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিলে ফসলের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা থাকে। বিশেষ করে বেশি থাকলে বিভিন্ন ফসলে কারেন্ট পোকা-সহ বিভিন্ন রকমের পোকার বৃদ্ধি পাই ও রোগের সৃষ্টি হতে পারে। এতে লিচুর আকারে ছোট এবং সহজে ঝরে পড়ে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, প্রথমদিকে গাছে গাছে ভালো মুকুল থাকায় এ বছর প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু অনাবৃষ্টি ও তীব্র তাপদাহ দীর্ঘমেয়াদি হলে গুটি ঝরে পড়লে সেই লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বাগানগুলোতে নিয়মিত স্প্রে ও সেচ দেওয়ার বিষয়ে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।