
রংপুরে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সফলতায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী হার বাড়ছে এবং ঝরে পড়ার হার কমছে। এরই অংশ হিসেবে রংপুর সদর উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিদিন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কলা, বনরুটি এবং সিদ্ধ ডিমের আকর্ষণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। এই কর্মসূচির ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিহীনতা রোধেও এটি বিশেষ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
এই কর্মসূচির সফলতা সরেজমিনে দেখতে গত রোববার রংপুরের জাফরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিদর্শন করেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্শিদা শারমিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন একই বিভাগের উপসচিব সরওয়ার কামাল এবং সিনিয়র সহকারী সচিব ইমতিয়াজ মোরশেদ।
এ সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা ও রংপুরের বিশেষ টিমের সদস্যরা ছাড়াও ইএসডিওর সদর উপজেলার কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ খাদেমুল ইসলামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, এই কর্মসূচির আওতায় রংপুর সদর উপজেলার মোট ২২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৩ হাজার ৬১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিদ্যালয় চলাকালীন নিয়মিত সিদ্ধ ডিম, বনরুটি ও কলা বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়তা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা “ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)”।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুর্শিদা শারমিনকে সদর উপজেলার জাফরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা আক্তার জানায়, সে এখন নিয়মিত স্কুলে আসে এবং স্কুল শুরু হওয়ার আগেই পৌঁছায়। সে বিভিন্ন দিনে বনরুটি, সিদ্ধ ডিম ও কলা পেয়ে থাকে। একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হেলেনা আক্তার জানায়, স্কুলে খাবার দেওয়ার পর থেকে তার অনেক ভালো লাগে। আগে স্কুলে আসতে অনীহা ছিল, এখন সেটি নেই। সারাদিন থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না, কারণ দুপুরে খাবার পেয়ে শরীরের ক্ষুধা ও ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
অভিভাবক মৌসুমী আক্তার বলেন, এখন ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, তার সন্তান বাড়িতে আর থাকতে চায় না, ছাতা নিয়ে হলেও বিদ্যালয়ে যায়। পড়াশোনায় মনোযোগ বেড়েছে। আগে স্কুলে পাঠাতে নানা সমস্যা হতো।
জাফরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তহমিনা খাতুন জানান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি শতকরা ৯০ ভাগের বেশি বেড়েছে। বিদ্যালয়ে যেমন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ও আগ্রহ বেড়েছে। এছাড়াও সরকারের এই কর্মসূচি পুষ্টিহীনতা রোধে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) হেড অব প্রোগ্রাম ও স্কুল ফিডিং কর্মসূচির ফোকাল পার্সন যামিনী কুমার রায় জানান, এই প্রকল্পের ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন খুশি, তেমনি শিক্ষা ক্ষেত্রে দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে ইএসডিও খাবারের মান ও পরিমাপের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সময়মতো নিয়মিত খাবার পৌঁছে দিতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচির প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আইয়ুব হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোতে তারা খাবার পৌঁছে দিয়ে থাকেন। গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখতে টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করেন। কখনও কোনো অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম জানান, এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এক নতুন আমেজের পরিবেশ এসেছে। উপস্থিতির হার বেড়ে বিদ্যালয়ের পরিবেশ বদলে দিয়েছে। এই কর্মসূচির ফলে ঝরে পড়া রোধ হয়েছে এবং শিক্ষাঙ্গনগুলো আনন্দমুখর হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, এই উপজেলায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে এবং এর সুফল সবাই ভোগ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শুধু এই উপজেলা নয়, গোটা জেলায় এই কর্মসূচি চালু হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও স্কুলে আসার আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।