
প্রকৃতিতে এখন চলছে বর্ষাকাল। বর্ষার আগমনে কদম, রজনীগন্ধা, দোপাটি, গন্ধরাজ, বেলি, জুঁই এবং কামিনীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটতে শুরু করে চালতা ফুল। এ ফুল সাদা রঙের। সুরভিত এই ফুলের ব্যাস ১৫ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার। ফুলে পাঁচটি মোটা পাপড়ি থাকে; বৃতিগুলো পাপড়িকে ঘিরে রাখে। পাপড়ির শুভ্রতা, হলুদ পরাগ ও তারকাবৃত্তির গর্ভদণ্ড চালতা ফুলের মোহনীয় রূপ প্রকৃতিজুড়ে ঝিলিক তুলেছে। এতে মুগ্ধ সৌন্দর্যপিপাসুরাও। কদমের পর বর্ষাকে চেনা যায় চালতা ফুলে।
চালতা ফুল খুবই ক্ষণস্থায়ী। ভোরবেলায় ফোটা ফুলের পাপড়ি সন্ধ্যায় ঝরে পড়ে। তাই চালতা ফুলের প্রকৃত রূপ দেখতে হলে দুপুর হওয়ার আগেই দেখতে হবে। ফলে হঠাৎ এ ফুলের দেখা পাওয়া অনেকটা আবিষ্কারের মতোই।
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলা-এর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন গ্রামীণ পথ, বাড়ির আঙিনা, অফিস-আদালত এলাকা এবং পুকুর-জলাশয়ের আশপাশে থাকা চালতা গাছগুলো এখন ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে। চালতা গাছের ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে এই ফুল। আর তার অপরূপ দৃশ্য মুগ্ধ করছে সবাইকে। চালতা ফুলের এই সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে শিশুরা তাদের খেলার অনুষঙ্গ হিসেবেও বেছে নিয়েছে এই ফুলকে।
চালতা ফুলের সৌন্দর্য বাংলা সাহিত্যের কবিদেরও মুগ্ধ করেছে। জীবনানন্দ দাশ তার ‘সেই দিন এই মাঠ’ কবিতায় লিখেছিলেন— ‘আমি চ’লে যাব ব’লে/ চালতা ফুল কি আর ফুটিবে না শিশিরের জ্বলে নরম গন্ধের ঢেউয়ে?’। একইভাবে বিষ্ণু দে লিখেছিলেন— ‘আকাশ নীলের তারাখোচা পথে বৃষ্টি পড়ে/ চালতা ফুলে ফলের বাগান মোদির করে...’।
জানা গেছে, মূলত বর্ষা ঋতুতেই প্রকৃতি রাঙিয়ে ফোটে চালতা ফুল। চালতা ফুল সাধারণত আষাঢ় মাসে দেখা যায়।
চালতার বৈজ্ঞানিক নাম Dillenia indica। শ্রীলঙ্কা, চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া-সহ বেশ কয়েকটি দেশে চালতা জন্মে। ইংরেজিতে এটি Dillenia indica নামে পরিচিত। বিশেষত এটি ভারতবর্ষীয় উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত।
সোমা শীল এবং সরলা বিশ্বাস নামে দুই নববধূ বলেন, চালতা ফুল জানিয়ে দেয় বর্ষাকালের আগমনী বার্তা। আমরা এই ফুল দিয়ে চুলের খোঁপায় সাজি। তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে এই বৃক্ষ লাগানো প্রয়োজন। তা না হলে আগামী প্রজন্ম এ বৃক্ষের অপরূপ দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
তুরান মোল্লা নামে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, চালতা শুধু টক স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টি ও ভেষজ গুণেও ভরপুর। চালতার আচার, চাটনি ও টক ডাল অনেকেরই প্রিয় খাবার। এছাড়া চালতার ফল পিষে লবণ-মরিচ দিয়ে মাখালে তা বেশ লোভনীয় খাবারে পরিণত হয়। চালতা মাঝারি আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ বা ফলজাতীয় উদ্ভিদ।
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলা-এর ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, মূলত বর্ষাকালে প্রকৃতিতে চালতা ফুল ফোটে। এই ফুলের সঙ্গে গ্রামবাংলার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন অসময়েও চালতা ফুল ফুটতে দেখা যায়।