
সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়ন-এর মহিষকুড় এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৮টি ঘর গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভূমিহীন বা বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মাঝে হস্তান্তর করা হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, নানা সমস্যার কারণে নির্মিত ওই ঘরগুলো আজও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।
তবে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রকৃত অসহায় ও ভূমিহীনদের মাঝে ওই ঘর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশাশুনি-ঘোলা সড়কের মহিষকুড় এলাকায় সরকারের ক্রয়সূত্রে প্রাপ্ত মহিষকুড় মৌজার ৫৫ শতক জমির ওপর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে নির্মাণ করা হয় ১৮টি ঘর। তিন কক্ষ ও একটি পায়খানাঘরসহ প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা।
ওই হিসাব অনুযায়ী ১৮টি ঘরের নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৪৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও ঘরগুলো ভূমিহীনদের মাঝে হস্তান্তর করা হয়নি।
মহিষকুড় গ্রামের বাসিন্দা ও ভূমিহীন নারী সামছুন্নাহার (৫৫) জানান, আড়াই শতক খাস জমির ওপর কোনোরকম বসবাস করেন। ১০ বছর আগে তার স্বামী মোহাম্মাদ আলী মারা যান। তিনটি মেয়ে ছাড়া তার কোনো ছেলে সন্তান নেই। অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে তার। প্রকৃত ভূমিহীন হওয়ার পরও তাকে ঘর দেওয়া হয়নি বা ঘরের তালিকায় তার নাম রাখা হয়নি।
একই ধরনের বর্ণনা দেন ওই গ্রামের হতদরিদ্র গৃহবধূ হালিমা খাতুন ও আছমা খাতুন। তারা বলেন, গ্রামের সবচেয়ে নিঃস্ব ও অসহায় হয়েও আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোনো ঘর এখনও পাননি। ঘর দেওয়ার জন্য পূর্বে যে তালিকা করা হয়েছে, তাতেও তাদের নাম রাখা হয়নি। কাদের জন্য ওই ঘর নির্মাণ করা হয়েছে, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে বলে জানান তারা।
স্থানীয় শ্রীউলা ইউনিয়ন পরিষদ-এর চেয়ারম্যান প্রভাষক দীপংকর বাছাড় জানান, মহিষকুড় গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ১৮টি ঘর নির্মাণ করা হলেও সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় পায়খানাঘরের স্ল্যাবগুলো ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ঘরগুলোর তিন পাশে নোনা মৎস্যঘেরের পানি থৈ থৈ করছে।
এছাড়া শুরুতে ঘর বরাদ্দের যে তালিকা করা হয়েছে, তাতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত ভূমিহীন বা বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য এই ঘর বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও প্রথম পর্যায়ে প্রণীত তালিকায় স্বচ্ছল বা সম্পদশালী পরিবারের নামও রয়েছে। ফলে এসব অনিয়ম ও সমস্যার কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় আজও ওই ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।
এ সময় তিনি দ্রুত প্রকৃত ভূমিহীনদের তালিকা করে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান।
শ্যামানন্দ কুণ্ড, আশাশুনি উপজেলা প্রশাসন-এর নির্বাহী কর্মকর্তা, জানান—পূর্বের তালিকা বাদ দিয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশক্রমে নতুন তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রকৃত নিঃস্ব ও গৃহহীন পরিবারগুলোর মাঝে ওই ঘরগুলো বিতরণ করা হবে। তবে পূর্বে কারা কীভাবে অনিয়মের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করেছিল, সে বিষয়ে তার জানা নেই বলেও তিনি জানান।
মিজ কাউসার আজিজ, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন-এর জেলা প্রশাসক, জানান—দ্রুত প্রকৃত অসহায় ও ভূমিহীনদের মাঝে ওই ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু আশাশুনির মহিষকুড় নয়, জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত ঘর বরাদ্দ বা কোনো সমস্যা থাকলে তা দ্রুত সমাধান করা হবে।
তিনি আরও জানান, সরকারের নির্মিত এসব ঘর জেলার প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝেই বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া মহিষকুড়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থাও করা হবে।