
সরকারি তথ্যভান্ডারে ভুলবশত ‘মৃত’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ফরিদপুরের এক রিকশাচালক টানা ১২ বছর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগ করেছেন। বছরের পর বছর নিজের জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও সমাধান না পেয়ে সম্প্রতি বিষয়টি মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে।
এরপর জেলা নির্বাচন অফিস তার তথ্য সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। তবে ভুক্তভোগীর দাবি, সংশোধনের বিষয়ে তাকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
ভুক্তভোগী বাদশা শেখ (৫২) ফরিদপুর পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর সাদীপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি মৃত গেন্দু শেখের ছেলে। দুই সন্তানের জনক বাদশা শেখ রিকশা চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন।
বাদশা শেখ জানান, ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ভোটার তালিকায় তার নাম নেই। পরে খোঁজ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে তাকে ‘মৃত’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে বলে জানতে পারেন। এরপর থেকে তার এনআইডি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে তিনি ভোট দিতে পারেননি।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেবা, মোবাইল ফোনের সিম নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণেও তাঁকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।
আক্ষেপ প্রকাশ করে বাদশা শেখ বলেন, “আমি জীবিত, অথচ সরকারি কাগজে-কলমে মৃত। নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বছরের পর বছর বিভিন্ন অফিসে ঘুরেছি। জীবিত মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?”
সমাধানের আশায় সম্প্রতি তিনি ফরিদপুর জেলা নির্বাচন অফিসে যান। সেখানে কর্মকর্তারা তাকে ফরিদপুর পৌরসভার প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে বলেন। পরে গত ২৩ জুন পৌরসভা থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে তিনি জেলা নির্বাচন অফিসে জমা দেন।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে থাকার পরও নিজেদের ভুলের দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন মানসিকতা নিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ফরিদপুর পৌরসভার ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ আলাউল হোসেন বলেন, “বাদশা শেখ আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত তথ্য সংশোধন করে একজন জীবিত নাগরিককে তার সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদ বলেন, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে বাদশা শেখের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে তাকে আর মৃত হিসেবে দেখানো হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “বিষয়টি না বুঝেই হয়তো এখনো অভিযোগ করা হচ্ছে। এ ধরনের ভুল শুধু এখানে নয়, সারা দেশেই রয়েছে। নতুন ভোটার ও মৃত ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহের সময় মাঠপর্যায়ে এ ধরনের ভুল হয়ে থাকে।”
তবে বাদশা শেখের দাবি, তথ্য সংশোধনের বিষয়ে নির্বাচন অফিস থেকে তাকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে তার এনআইডি পুরোপুরি সচল হয়েছে কি না কিংবা ভোটার তালিকায় তার নাম ফিরেছে কি না, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন।
এদিকে, ঘটনাটি মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসার পর জেলা নির্বাচন অফিসের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেন, অফিসটিতে সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অকারণে সেবা দিতে বিলম্ব, ঘুষ গ্রহণ এবং দালাল ছাড়া কাজ না হওয়ার মতো অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আহমেদ বলেন, “আমি এই অফিসে দুই বছর চার মাস ধরে কর্মরত। আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারলে আমি যেকোনো শাস্তি মেনে নেব। অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
বাদশা শেখের ঘটনা সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সামান্য ভুল কীভাবে একজন সাধারণ নাগরিককে দীর্ঘদিন মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত করতে পারে, তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে নাগরিকসেবায় তথ্য যাচাই, জবাবদিহি এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।
১২ বছর পর তথ্য সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এনআইডি পুরোপুরি সচল হওয়া এবং ভোটার তালিকায় নিজের নাম ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বাদশা শেখ। তার একটাই প্রত্যাশা, “আমি বেঁচে আছি—এটা সরকারি খাতায় লিখে দিন। আমাকে আমার ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিন।”