ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বন্ধ শ্যামপুর চিনিকলে প্রতি মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা, চালুর উদ্যোগ নেই

বন্ধ শ্যামপুর চিনিকলে প্রতি মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা, চালুর উদ্যোগ নেই

উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং আধুনিকায়নের অভাবের মুখে মিলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এটি চালুর ব্যাপারে গত কয়েক বছরে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষি ও মিলের কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী।

বর্তমানে মিলের যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে। মিলের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালু ও লাভজনকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে টাস্কফোর্স গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি।

টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকলে ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে আখ মাড়াই শুরু করতে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকেই এ সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়।

বিএসএফআইসির নথিপত্র বলছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্যামপুর চিনিকলের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির জবাবে গত বছরের ৩০ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় বিএসএফআইসিকে জানায়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে বিগত দুই দশকে ‘পরিচালন ঋণ’ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়েছে। বিএসএফআইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ভর্তুকি হ্রাসের উদ্যোগ হিসেবে চিনিকলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। তাই নতুন করে অর্থ বরাদ্দে অসম্মতি জানায় অর্থ বিভাগ।

শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে মিলটিকে লোকসানি দেখানো হয়েছে। এটি আধুনিকায়ন করা হলে পুনরায় লাভজনক করা সম্ভব।

চিনিকল অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান জাগো নিউজকে বলেন, “শ্যামপুর চিনিকল ঘিরে এ এলাকার শ্রমিক ও চাষিসহ কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হতো। মিল বন্ধের পর স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হলেও অধিকাংশ অস্থায়ী কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্যামপুর চিনিকল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন এ এলাকার মানুষ। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এটি চালুর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের হতাশা বাড়ছে।”

আসন্ন বাজেটে মিল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “শ্যামপুর চিনিকল এ এলাকার মানুষের প্রাণের স্পন্দন ছিল। এটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। আমরা চাই সরকার দ্রুত আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মিলটি সচল করুক।”

সূত্রমতে, টানা লোকসানের মুখে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় রংপুরের একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকলের। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ঘেরা এ মিলে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা। দাপ্তরিক কাজকর্ম চললেও নেই কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিক-চাষিদের আগের মতো হাঁকডাকও নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর বন্দরে ১৯৬৪ সালে নির্মিত হয় শ্যামপুর সুগার মিল। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত এ মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মাড়াই শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা রাখা হয় এক হাজার ১৬ টন এবং বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ধরা হয় ১০ হাজার ১৬১ টন। বছরে মিলের মেশিন চালু থাকত তিন মাস।

চালুর পর কয়েক বছর লাভের মুখ দেখলেও ২০০০ সালের পর থেকে টানা লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। ব্যাংক ঋণ, ঋণের সুদ এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাতে দায় বেড়ে শেষ পর্যন্ত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় কয়েকশ কোটি টাকায়।

চালুর উদ্যোগ নেই,২৪ লাখ টাকা,শ্যামপুর চিনিকল
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত