
দেশি-বিদেশি প্রায় ৪০ জাতের আম চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের চাষি আনছার আলী। মাত্র দুটি আমগাছ দিয়ে শুরু করে এখন তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল বাণিজ্যিক আমবাগান। তার বাগানের উৎপাদিত আম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিশ্ববাজারে। এর মাধ্যমে সফল এই চাষি ঘুরিয়েছেন নিজের ভাগ্যের চাকা।
জানা যায়, ২০২০ সালে আনছার আলী থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা ব্যানানা ম্যাংগো কিনতে গিয়ে দেখেন, এক কেজি আমের দাম ৭৫০ টাকা। এমন দাম দেখে তিনি পরীক্ষামূলকভাবে নিজ বাড়িতে দুটি গাছ লাগান। ভালো ফলন হলে নিজেই এর বাগান করার চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই শুরু হয় তার পথচলা।
২০২১ সালে গাছে প্রথম আম আসে। স্বাদ ও মিষ্টতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি বাণিজ্যিকভাবে চাষের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২২ সালে তিনি তার বাগানে ৬৫০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ রোপণ করেন। ২০২৩ সালে শুরু হয় আমের বাণিজ্যিক উৎপাদন। ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো তার বাগানের উৎপাদিত আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়। সেই যে শুরু, এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
সফল আমচাষি আনছার আলীর বাগানে এখন ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, চিয়াংমাই, কিং অব চাকাপাত, আর টু ইটু, ক্যাচু ইউ, সূর্যের ডিম, থ্রি টেস্ট, বারি-৪, বারি-৮, বারি-১৩, পালমার, উষা ও নিমসহ প্রায় ৪০ জাতের উচ্চফলনশীল ও সুস্বাদু আম রয়েছে। তার বাগানের প্রতিটি গাছে প্রচুর আম ধরে ঝুলে আছে। অনেক গাছ আমের ভারে নুয়ে পড়েছে।
তার এই আধুনিক বাগানের বিশেষ আকর্ষণ হলো ব্যাগিং পদ্ধতি। গাছ থেকে আম সংগ্রহের আগেই নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী প্রতিটি আম ব্যাগে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমার পাশাপাশি আমের গুণগত মানও ভালো থাকে। নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে এ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আনছার আলীর গড়ে তোলা আধুনিক আমবাগানটি এখন এলাকার কৃষি উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি পরামর্শে গড়ে ওঠা এ বাগান শুধু আনছার আলীর সাফল্যের গল্প নয়, বরং নতুন উদ্যোক্তা ও কৃষকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
বাগান দেখতে আসা পথচারীরা বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায় আমগুলো ব্যাগের মধ্যে ঝুলছে। বিষয়টি আমাদের কাছে বেশ ব্যতিক্রম মনে হয়। কৌতূহল থেকে বাগানে ঢুকে আমগুলো দেখে খুব ভালো লেগেছে। আমারও একটি জমি আছে, সেখানে আমবাগান করার ইচ্ছা রয়েছে।”
আমচাষি আনছার আলী বলেন, “বিদেশে রপ্তানির উপযোগী আম উৎপাদনের জন্য গ্যাপ প্রটোকল অনুসরণ করে চাষাবাদ করছি। রাসায়নিক বালাইনাশক ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পেয়েছি। বাগানে কর্মরত শ্রমিকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশা করছি, এ বছরও আমার বাগানের আম দেশের বাইরে রপ্তানি হবে।”
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (উদ্যান) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চলতি বছর দিনাজপুর জেলায় ৫ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি আম উৎপাদনের আশা করছি। এখনো বিভিন্ন বাগানে আম রয়েছে। চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব পরে পাওয়া যাবে। এ বছর দিনাজপুর থেকে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে আম রপ্তানি হয়েছে। এতে আমচাষিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।”