
সাতক্ষীরার কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া গ্রামে প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো শ্যামসুন্দর মন্দির আজও দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও স্থাপত্যের সাক্ষী হয়ে। টেরাকোটা ফলকের সূক্ষ্ম কারুকাজে সমৃদ্ধ ৬০ ফুট উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটা নষ্ট হচ্ছে। অবকাঠামোগত সুবিধারও রয়েছে নানা সংকট।
সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার এবং কলারোয়া থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে সোনাবাড়িয়া গ্রামে মন্দিরটির অবস্থান।
অপূর্ব শিল্পসৌন্দর্য ধারণ করে তিনতলা এই মন্দিরটি আজও টিকে আছে। মন্দিরটির নাম ‘শ্যামসুন্দর মন্দির’। প্রাচীন এ স্থাপনাটি ‘সোনাবাড়িয়া মঠ’ নামেও পরিচিত।
৬০ ফুট উচ্চতার মন্দিরটির আয়তন ৩৩ ফুট বাই ৩৩ ফুট। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। প্রতিদিন এখানে দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীরা আসেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, একসময় রামকৃষ্ণ পরমহংস এই শ্যামসুন্দর মন্দিরে প্রায় দুই মাস অবস্থান করেন। এ কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে মন্দিরটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেও মানুষ শ্যামসুন্দর মন্দির দেখতে আসেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, এক রাতে জিন-ভূতেরা এই মন্দির তৈরি করেছিল। মূলত, এটি নয়টি চূড়াবিশিষ্ট একটি নবরত্ন মন্দির, যা বর্তমানে অনেকটা মঠের মতো দেখায়। মন্দিরের গায়ে রয়েছে চমৎকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকচিত্র। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব টেরাকোটার অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ত্রিতল নবরত্ন মন্দিরটির সঙ্গে রয়েছে দুর্গা মন্দির ও শিবমন্দির। পিরামিড আকৃতির মন্দিরটির নিচের তলার ভেতরের অংশ চার ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশের চারপাশে ঘূর্ণায়মান টানা অলিন্দ রয়েছে। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে একটি মণ্ডপ। তৃতীয় অংশে কোঠা ও প্রকোষ্ঠ দেখতে পাওয়া যায়। পূর্বদিকে একটি অলিন্দ থেকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে।
মন্দিরের ছাদের ওপর ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী গম্বুজের মাঝখানে রয়েছে বড় একটি রত্ন। এ কারণেই মন্দিরটি নবরত্ন মন্দির হিসেবে পরিচিত।
বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘুরতে আসা শহিদুল ইসলাম, আমিনুর রহমান, মল্লিকা বিশ্বাস ও কোয়েল বিশ্বাসসহ অনেকে বলেন, স্থানীয়দের কাছে এটি সোনাবাড়িয়া মঠ ও শ্যামসুন্দর মন্দির—দুই নামেই পরিচিত। তবে মন্দিরের দেয়ালের শিলালিপিতে ‘শ্যামসুন্দর নবরত্ন মন্দির’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই দর্শনার্থীরা জানান, স্থানীয় লোকজন ও দর্শনার্থীরা এর সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে সেবাইত হিসেবে সুপ্রসাদ চৌধুরী ও দেব প্রসাদ চৌধুরী মন্দিরটির ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত মন্দিরের বিভিন্ন ইতিকথা তুলে ধরে বলেন, “এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রথমে দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষায় প্রাচীর দেওয়া জরুরি। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা একবার শুধু এসে দেখে গিয়েছিলেন। পুরাকীর্তির নিদর্শনটির ছবি তুলেছিলেন। এরপর আর তাদের পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি। ভারতের উপহাইকমিশনার এসেছিলেন। কথা দিয়েছিলেন, এখানে একটি গেস্টহাউস করবেন। বলেছিলেন, কলকাতার কালী মন্দিরের চেয়েও বড় ও প্রাচীন, ৮-৯ শ বছর আগে নির্মিত এ মন্দির।”
বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রকাশনা-বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিব মন্দিরের গায়ে থাকা ইটের ফলকের উল্লেখ করে বলেন, “এটি নির্মিত হয়েছিল ১৭৬৭ সালে।”
হাবিবুল ইসলাম আরও বলেন, “প্রতিদিনই এ মন্দিরে দর্শনার্থী আসেন। কিন্তু এখানে কোনো খাবারের দোকান নেই। নেই থাকার জায়গা।” পুরাকীর্তির এক অনন্য নিদর্শন টেরাকোটা শ্যামসুন্দর মন্দির সংস্কারে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন জেলা পরিষদ প্রশাসক।
ইতিহাস থেকেও জানা যায়, ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হরিরাম দাস মতান্তরে দুর্গাপ্রিয় দাস এই সোনাবাড়িয়া শ্যামসুন্দর মন্দির নির্মাণ করেন। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই শ্যামসুন্দর মন্দির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে।
ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্থাপত্যশৈলীর অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সোনাবাড়িয়ার এই শ্যামসুন্দর মন্দির শুধু একটি পুরাকীর্তি নয়, এলাকার দীর্ঘ ইতিহাসেরও সাক্ষ্য বহন করছে। তবে যথাযথ সংরক্ষণ ও দর্শনার্থীবান্ধব সুযোগ-সুবিধার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এর সৌন্দর্য।
এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঐতিহ্যের এই নিদর্শন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।