
ভেড়ার চেয়ে আকারে বড় ও মাংসের পরিমাণ বেশি। তবে দেখতে ভেড়ার মতোই। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছেন ‘গাড়ল’। সারা দেশে ব্যাপকভাবে গাড়ল পালন ছড়িয়ে পড়ছে। ভেড়া পালনের জায়গা এখন গাড়লের দখলে। গাড়ল পালনে খরচ কম, লাভ বেশি হওয়ায় এবং এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনাজপুরের খামারিদের আগ্রহ বেড়েছে।
দিনাজপুর সদরের আউলিয়াপুর ইউনিয়নের উলিপুর গ্রামের মো. রেজাউল ইসলাম ২০১৮ সালের শেষের দিকে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের পরামর্শে মাত্র ৪৫টি গাড়লের বাচ্চা দিয়ে খামার শুরু করেছিলেন। দুই বছরের মাথায় লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন তিনি। এখন তার গাড়লের খামারে ২৩০টি গাড়ল রয়েছে। দুই জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
রেজাউল ইসলামের বাড়ির পাশে বিশাল টিকলির সরকারি চারণভূমিতে ছেড়ে দিয়েই খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয়। বাড়তি কোনো খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। বছরে দুই বার ২ থেকে ৩টি করে বাচ্চা দিয়ে থাকে গাড়ল। মাচার ওপর গাড়ল থাকতে পছন্দ করে। এতে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পছন্দ করে না। মাচার ওপর থাকায় গাড়লের বিষ্ঠা নিচে পড়ে যায়। নিচে পড়া বিষ্ঠা জৈব সার হিসেবে বিক্রি করা যায়।
ভেড়ার একটি উন্নত প্রজাতি গাড়ল। এগুলো দেখতে প্রায় ভেড়ার মতো। দেশি ভেড়ার চেয়ে এটি আকারে বড়, মাংসও বেশি হয়। গাড়লের লেজ লম্বা হয়। মাংসের চাহিদা মেটাতে দেশেই এখন দিনাজপুরে বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে গাড়লের খামার। গাড়লের খামারে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। অনেকে সফলতাও পেয়েছেন। আবার গাড়ল পালন করে ভাগ্য বদলে স্বাবলম্বী হয়েছেন এলাকার অনেক বেকার যুবক।
তবে সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে নিজ উদ্যোগে গড়ে উঠবে আরও অনেক গাড়লের খামার এবং মাংসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখবে বলেও মনে করেন এসব খামারিরা।
বেকারত্বের হাতছানি থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ ঋণ নিয়ে পাঁচ বছর আগে অল্প পরিসরে গাড়ল পালন শুরু করেন রেজাউল ইসলাম। বর্তমানে তার খামারে ২ শত গাড়ল আছে।
গাড়ল পালনকারী রেজাউল ইসলাম জানান, ২০১৮ সালে মাত্র ৫০ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে ৪৫টি গাড়লের বাচ্চা কিনে পালন শুরু করি। এরপর থেকে আর পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক সময় সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এখন বার্ষিক ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। দুই বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে দুম্বা পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
রেজাউল ইসলাম আরও জানান, গাড়লের মাংস গন্ধমুক্ত ও সুস্বাদু। পুষ্টিগুণেও ভালো। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এ মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি কেজি মাংস ৭ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
অন্য এক গাড়ল খামারি নাজমুল ইসলাম জানান, দিনাজপুর সদর উপজেলায় ৭-৮ জন খামারি প্রায় ১ হাজার গাড়ল প্রজাতির ভেড়া পালন করছেন। তুলনামূলক গৃহপালিত অন্য প্রাণীর চেয়ে গাড়লের রোগবালাই কম হয় এবং দ্রুত মাংস বৃদ্ধি হয়। গাড়লের মাংসে চর্বি কম থাকে। তিন বছর আগে এক শিক্ষিত বেকার যুবক কোনো কিছু করার উপায় না পেয়ে গাড়ল পালনে উদ্বুদ্ধ হন।
দিনাজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রহিম বলেন, দিনাজপুর জেলায় বেশ কয়েকটি গাড়ল খামার গড়ে উঠেছে। অনেকেই স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে এই গাড়ল পালনে আগ্রহী হচ্ছেন। গাড়ল পালনে তেমন বাড়তি খরচ হয় না। গাড়ল তৃণভোজী প্রাণী। সবুজ ঘাস খেতে পছন্দ করে। চারণভূমি থাকলে গাড়লের জন্য বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। তেমন রোগবালাইও হয় না।