ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রংপুরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কেডি ক্যানেল রক্ষার দাবি

রংপুরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কেডি ক্যানেল রক্ষার দাবি

রংপুর নগরীর ইতিহাস, পরিবেশ ও জলপ্রবাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কেডি ক্যানেল। একসময় নগরীর পানি নিষ্কাশন, কৃষিকাজ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই ক্যানেল আজ অস্তিত্ব সংকটে।

বছরের পর বছর অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং দূষণের কারণে কেডি ক্যানেল তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাতে বসেছে। ফলে নগরবাসীর জন্য এটি এখন পরিবেশগত ও নাগরিক সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও কেডি ক্যানেলের পানি ছিল স্বচ্ছ। বর্ষা মৌসুমে ক্যানেল দিয়ে দ্রুত পানি প্রবাহিত হতো এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে থাকত। ক্যানেলের দুই পাড়ে ছিল সবুজ পরিবেশ। স্থানীয় মানুষ মাছ ধরতেন, শিশুরা খেলাধুলা করত এবং অনেক পরিবার দৈনন্দিন কাজে এই জলধারার ওপর নির্ভরশীল ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যানেলটির চিত্র পাল্টে যেতে থাকে। নগরায়নের বিস্তার এবং তদারকির অভাবে বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা গড়ে ওঠে। কোথাও কোথাও ক্যানেলের অংশ ভরাট করে দখল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে ক্যানেলের প্রস্থ কমে গেছে এবং পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্যানেলের তীরবর্তী অনেক এলাকা এখন কার্যত আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত হয়েছে। গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং বিভিন্ন ধরনের কঠিন বর্জ্য নিয়মিতভাবে ক্যানেলে ফেলা হচ্ছে। এতে শুধু পানি দূষিত হচ্ছে না, বরং ক্যানেলের তলদেশ ভরাট হয়ে পানিধারণ ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেডি ক্যানেলের সবচেয়ে বড় সংকট এখন দখল এবং দূষণ। ক্যানেলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে পানি জমে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে।

পরিবেশবিদদের মতে, একটি শহরের খাল বা ক্যানেল শুধু পানি বহনের পথ নয়; এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। জলাশয় সংকুচিত হলে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যায়, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নগরীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়। কেডি ক্যানেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, রংপুরের ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনায় কেডি ক্যানেলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ এই ক্যানেল নগরীর প্রধান ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে। সঠিকভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে জলাবদ্ধতা সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান সম্ভব।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রথমেই ক্যানেলের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্যানেলের সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত খনন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ক্যানেলটি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণভাবে তার অস্তিত্ব হারাতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অতীতেও কেডি ক্যানেল সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে অনেক ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে গতি হারিয়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। নগরবাসী এখন দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখতে চায়।

শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন পরিবেশকর্মীরা। তাদের মতে, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি নিজেরাই ক্যানেলে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ না করে, তাহলে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রমও দীর্ঘমেয়াদে সুফল দিতে পারবে না।

এদিকে ক্যানেলের বিভিন্ন অংশে দুর্গন্ধ এবং দূষণের কারণে আশপাশের বাসিন্দারাও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। মশার উপদ্রব বৃদ্ধি, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি এবং পরিবেশগত অবনতি স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ক্যানেলটি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

রংপুর নগরীর টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য কেডি ক্যানেলের গুরুত্ব অপরিসীম। দখল ও দূষণের কবল থেকে এই জলধারাকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ।

একসময় যে কেডি ক্যানেল রংপুরের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ সেটি বাঁচানোর দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। নগরীর পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কেডি ক্যানেল হয়তো একদিন শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। আর সেই ক্ষতির দায় বহন করতে হবে পুরো রংপুরবাসীকেই।

কেডি ক্যানেল,জলাবদ্ধতা নিরসন,রংপুর
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত